এক জেলা এক অগ্রাধিকার: সীমিত সম্পদে টেকসই উন্নয়নের কার্যকর পথ
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সীমিত সম্পদ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে একটি দেশের পক্ষে সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে করা বাস্তবসম্মত নয়। একবারে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি, পরিবেশ, যোগাযোগ, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, ভূমি ও প্রযুক্তি—সব খাতে বড় বড় প্রকল্প শুরু হলে অর্থ ও জনবল ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়লেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে না। তাই সরকারের উচিত হতে পারে—একেকটি জেলাকে একেকটি জরুরি খাতের পূর্ণাঙ্গ পাইলট মডেল হিসেবে গড়ে তোলা।
ইথিওপিয়ায় কয়েকটি অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে কমিউনিটি-ভিত্তিক হেলথ এক্সটেনশন প্রোগ্রাম চালুর পর তা ধাপে ধাপে দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়; ব্রাজিলে স্থানীয় কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী উদ্যোগ থেকে গড়ে ওঠা ফ্যামিলি হেলথ স্ট্র্যাটেজি পরে জাতীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় কাঠামোতে পরিণত হয়; ভারতে পর্যায়ক্রমে চালু হওয়া ই-কোর্টস প্রকল্প মামলা ব্যবস্থাপনা, ই-ফাইলিং, কজলিস্ট ও আদালত-তথ্য ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে; আর রুয়ান্ডায় জেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট উন্নয়ন লক্ষ্য ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের ইমিহিগো পদ্ধতি স্থানীয় সরকারের জবাবদিহি ও সেবা উন্নয়নে প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, সীমিত পরিসরে একটি কার্যকর মডেল দাঁড় করিয়ে ফল যাচাই করার পর ধাপে ধাপে তা অন্য অঞ্চল ও জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
একটি জেলাকে স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, চিকিৎসকের উপস্থিতি, ওষুধ সরবরাহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অ্যাম্বুলেন্স এবং রোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তি এক ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। লক্ষ্য হবে—কোনো রোগী যেন দালালের কাছে যেতে বাধ্য না হন, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব না থাকে, চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে সেবা ব্যাহত না হয় এবং জরুরি রোগী দ্রুত চিকিৎসা পান।
অন্য একটি জেলাকে শিক্ষা সংস্কারের আদর্শ মডেল করা যেতে পারে। শিক্ষক উপস্থিতি, বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া, পাঠদানের মান, কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল ক্লাসরুম, অভিভাবকের অংশগ্রহণ ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনফল—সব বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। আবার একটি জেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। নামজারি, খতিয়ান, ভূমি কর, দলিল, রেজিস্ট্রি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির সব ধাপ ডিজিটাল ও সময়বদ্ধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ এখন এমন একটি জরুরি ক্ষেত্র, যাকে পৃথকভাবে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। বায়ুদূষণ, নদী ও জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, অব্যবস্থাপিত পৌর বর্জ্য, ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও দখল—সব মিলিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ পরিবেশ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, দুর্বল স্যানিটেশন ও সিসা-দূষণ বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং ৫.২ বিলিয়ন অসুস্থতার দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত; ২০১৯ সালে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল জিডিপির প্রায় ১৭.৬ শতাংশের সমান।
তাই একটি শিল্পঘন বা নদীকেন্দ্রিক জেলাকে “পরিবেশ পুনরুদ্ধার জেলা” হিসেবে নির্বাচন করা যেতে পারে। সেখানে শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন, নদী ও খাল দখলমুক্ত করা, প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পৃথকীকরণ, আধুনিক ডাম্পিং ও রিসাইক্লিং, দূষণকারী ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, ধুলা কমানো এবং গাছ লাগানোকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। শুধু অভিযান নয়, নিয়মিত দূষণ পর্যবেক্ষণ, জরিমানা, জনঅংশগ্রহণ ও পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে হবে।
যোগাযোগ উন্নয়নও আলাদা একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একটি জেলাকে সড়ক, নৌপথ, রেলসংযোগ, বাজারে কৃষিপণ্য পরিবহন, বাস টার্মিনাল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ যোগাযোগের সমন্বিত মডেল করা যেতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কৃষক দ্রুত বাজারে পণ্য পাঠাতে পারবেন, শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন সহজ হবে, শিক্ষার্থী ও রোগী দ্রুত সেবা পাবেন এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে। বাংলাদেশের পরিবহন অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বাজার-সংযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিচারব্যবস্থাও এমন একটি খাত যেখানে বিশেষ পাইলট সংস্কার প্রয়োজন। মামলাজট, বারবার তারিখ, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, নথি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিম্ন আদালতে জনবল সংকট—এসব কারণে সাধারণ মানুষ সময়মতো ন্যায়বিচার পান না। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল; এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চাপ নিম্ন আদালতগুলোতে।
একটি জেলাকে “দ্রুত ও ডিজিটাল বিচারসেবা জেলা” হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে ই-ফাইলিং, ডিজিটাল কজলিস্ট, সময়বদ্ধ তদন্ত, মামলা বাছাই, মধ্যস্থতা, পারিবারিক ও ক্ষুদ্র দেওয়ানি বিরোধের বিকল্প নিষ্পত্তি এবং সাক্ষী ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া দরকার। এতে মামলাজট কমবে, মানুষের খরচ কমবে এবং ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা বাড়বে।
একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি বিপণন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানকেও পৃথক জেলার অগ্রাধিকার খাত করা যায়। মূল কথা হলো—একসঙ্গে অসংখ্য কার্ড, ভাতা ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্পে না গিয়ে একটি নির্দিষ্ট খাতকে একটি জেলায় সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করা।
এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রতিটি জেলায় নির্দিষ্ট খাতে সরকারের সম্পদ ও নজরদারি কেন্দ্রীভূত থাকবে। ফলে কোন কাজ হচ্ছে, কোথায় বাধা, কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কোন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষ কতটুকু সেবা পাচ্ছেন—তা সহজে পরিমাপ করা সম্ভব হবে। ছোট পরিসরে সফলতা অর্জনের পর সেই জেলার অভিজ্ঞতা, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যয়ের হিসাব অন্য জেলায় প্রয়োগ করা যাবে।
সীমিত সম্পদে উন্নয়নের বাস্তব সূত্র হতে পারে—এক জেলায় এক খাতের পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তন, সফল মডেলের স্বচ্ছ মূল্যায়ন, তারপর সেই অভিজ্ঞতার জেলা থেকে জেলায় বিস্তার। এভাবেই উন্নয়নের গতি বাড়বে, অপচয় কমবে এবং নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের সেবার ফল দৃশ্যমান হবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২৪ বার পড়া হয়েছে