বন্ধ হচ্ছে টু-জি, অচল হতে পারে পুরোনো বাটন ফোন
রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ৮:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে টু-জি প্রযুক্তি বন্ধের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি সমর্থিত ফোনে প্রচলিত মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে না। তবে ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থিত বাটন ফোন সচল থাকবে। বিটিআরসির হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৬ কোটি ১৩ লাখ টু-জি ফোন ব্যবহার হচ্ছে।
দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে টু-জি প্রযুক্তি বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে এ সেবা বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি প্রযুক্তি সমর্থিত বাটন ফোনে প্রচলিত মোবাইল নম্বরে কল করা সম্ভব হবে না। ফলে এসব ফোন ব্যবহারকারীদের নতুন হ্যান্ডসেট কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
বিটিআরসির হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৬ কোটি ১৩ লাখ টু-জি ফোন ব্যবহার করছেন গ্রাহকেরা। এসব ফোনের বেশির ভাগেই ভোল্টি প্রযুক্তি নেই। তাই টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে বিকল্প ফোনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে কম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেট নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
টু-জি বন্ধের রোডম্যাপ
গত অক্টোবরে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের একটি রোডম্যাপ তৈরি করে বিটিআরসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা বন্ধ করা হবে।
রোডম্যাপে কয়েকটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন না দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর টু-জি ফোন উৎপাদন এবং একই বছরের ৩০ জুনের পর এসব ফোন বাজারজাতকরণ বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এরপর ধাপে ধাপে টু-জি প্রযুক্তিনির্ভর হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধ করে গ্রাহকদের আধুনিক নেটওয়ার্কে স্থানান্তর করা হবে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন।
ভোল্টি থাকলে বাটন ফোনেও কথা বলা যাবে
টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও সব বাটন ফোন অচল হয়ে যাবে না। যেসব বাটন ফোনে ভোল্টি প্রযুক্তি রয়েছে, সেগুলোতে ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে। তবে শুধু টু-জি সমর্থিত ফোনে এ সুবিধা পাওয়া যাবে না।
ভোল্টি হলো ‘ভয়েস ওভার লং টার্ম ইভোলিউশন’। এ প্রযুক্তিতে প্রচলিত ভয়েস কলের জন্য টু-জি বা থ্রি-জি নেটওয়ার্কের পরিবর্তে ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়। ফলে আলাদা কোনো ইন্টারনেটভিত্তিক কলিং অ্যাপ ছাড়াই সরাসরি মোবাইল নম্বরে কথা বলা যায়।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, গ্রাহকেরা এখন নিজেরাই হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ওটিটি অ্যাপ ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি ভোল্টি প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।
তিনি বলেন, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও মোবাইলে কথা বলার সুযোগ থাকবে। তখন কল করা যাবে ওটিটি অ্যাপ অথবা ভোল্টি প্রযুক্তির মাধ্যমে। বাটন ফোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজারে এখনো কিছু ফোরজি ফোন পাওয়া যায়, যেগুলোতে শুধু ভোল্টি সুবিধা রয়েছে।
শুধু টু-জি ফোনই অচল হওয়ার শঙ্কা
টেলিযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, যেসব বাটন ফোন শুধু টু-জি নেটওয়ার্ক সমর্থন করে, সেগুলোই অচল হয়ে পড়বে। কারণ, এসব ফোনে ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সক্ষমতা নেই।
রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, শুধু টু-জি সমর্থিত এবং তিন থেকে চার বছর মেয়াদি হ্যান্ডসেটের উৎপাদন বন্ধে বিটিআরসি নির্মাতাদের নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী বছর থেকে নতুন করে টু-জি হ্যান্ডসেট তৈরি না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষের হাতে এ ধরনের ফোন আর থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তখন ভোল্টি প্রযুক্তি অথবা বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কল করা যাবে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশটিতে এখন আর টু-জি নেটওয়ার্ক নেই। সেখানে ভোল্টি বা অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল কল করা হয়।
সাহেদ আলমের ভাষ্য, ডেটা ব্যবহার করে কল করলে প্রচলিত ভয়েস কলের তুলনায় খরচ কয়েক গুণ কম হতে পারে। এ কারণে হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে অ্যাপের মাধ্যমে কল ও ভোল্টি প্রযুক্তিতে কল এক বিষয় নয়। ভোল্টিতে সরাসরি মোবাইল নম্বরে ফোন করা যায়। অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপে কথা বলতে হলে উভয় পক্ষের ওই অ্যাপ, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হয়।
সাশ্রয়ী ফোন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
টু-জি ফোন ব্যবহারকারীদের বিকল্প হ্যান্ডসেটের দাম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে বাটন ফোন পাওয়া যায়। এসব ফোনে কল করার পাশাপাশি টর্চ লাইট, মেমোরি কার্ড থেকে গান শোনা ও এফএম রেডিওর মতো সুবিধা থাকে। কোনো কোনো ফোনে সীমিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। অন্যদিকে স্মার্টফোনের দাম তুলনামূলক বেশি।
দেশীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিম্ফনির স্বত্বাধিকারী এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা যুক্ত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেওয়া গেলে গ্রাহকদের ফোরজি ফোন ব্যবহারে আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগও রাখা যেতে পারে।
তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ টু-জি থেকে ফোরজি প্রযুক্তিতে গ্রাহকদের স্থানান্তর সহজ করবে। এ জন্য মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায় স্মার্টফোন তৈরির উদ্যোগ
সরকারও কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছে। গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভুঁঞা বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের সংযোগ নিশ্চিত করতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের পাশাপাশি স্মার্টফোনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তিনি জানান, দেশে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে কম দামে স্মার্টফোন বাজারে এলেই সব গ্রাহকের পক্ষে টু-জি থেকে ফোরজিতে যাওয়া সহজ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা শুধু কথা বলা, রেডিও শোনা কিংবা টর্চ ব্যবহারের জন্য বাটন ফোন কেনেন, তাঁদের কাছে বাড়তি সুবিধার চেয়ে ফোনের দামই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত অনেক মানুষ স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাঁদের কাছে বাটন ফোন সহজ ও পরিচিত। ফলে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু কম আয়ের মানুষই নন, প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত গ্রাহকদের একটি অংশও সমস্যায় পড়তে পারেন।
১৩২ বার পড়া হয়েছে