সর্বশেষ

সাহিত্য

মৃত্তিকার ঘাম ও নক্ষত্রের আগুন: নজরুল-দর্শনের মানবিক পাঠ

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ ৭:৫৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি নন, তিনি মানবমুক্তি, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার এক চিরন্তন দার্শনিক কণ্ঠস্বর। সমকালীন বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রবাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও প্রযুক্তিনির্ভর বিচ্ছিন্নতার সংকটের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য ও দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর কবিতা, গান ও চিন্তায় নিহিত মানবিক মূল্যবোধ আজও একটি ন্যায়ভিত্তিক, মুক্ত ও সাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রেরণা জোগায়।

গাউসুর রহমান

নজরুল কেবল সাহিত্যের অলংকার নন; বর্তমানের এই বহুমাত্রিক সংকটের কালে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ বা ‘সাম্যবাদী’ সত্তা হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অপরিহার্য দস্তাবেজ। তাঁর দর্শন কোনো কাচের ঘরে বন্দী তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং তা রৌদ্রদগ্ধ দুপুরের ঘাম, বর্ষার প্রথম কদম ফুল আর শিকল ভাঙার উন্মত্ত শব্দের এক অপূর্ব মিশেল।

নজরুলের কবিসত্তার একেবারে গভীরে কান পাতলে এক দুর্জেয় ‘আমি’-র স্পন্দন শোনা যায়। এই ‘আমি’ কোনো আত্মকেন্দ্রিক, অহংকারী মানুষের আস্ফালন নয়। ইউরোপীয় দর্শনে ফ্রেডরিখ নিৎসে যখন তাঁর ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানবের কথা বলেছিলেন, সেখানে ক্ষমতার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। অতিমানব যেন এক নিঃসঙ্গ পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বরফশীতল সত্তা। কিন্তু নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ঠিক এর উল্টো। সে অতিমানব হয়েও মাটির কাছাকাছি; তার পায়ে ধুলো, চোখে জল, আর কণ্ঠে সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠার এক মরীয়া আর্তি। যখন ধ্বনিত হয় "আমি চির-উন্নত শির!", তখন তা কেবল কোনো ঔপনিবেশিক রাজদণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের চিরন্তন মর্যাদাবোধের এক মহাজাগতিক ঘোষণা।
ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বলতেন, মানুষের অস্তিত্ব আগে, তারপর তার পরিচয়। মানুষ নিজেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। নজরুল ঠিক এই পরিচয়ের কারিগর হিসেবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর বিদ্রোহ ছিল যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তা সে আধ্যাত্মিক হোক, রাজনৈতিক হোক, কিংবা হোক নিজের ভেতরের কাপুরুষতার বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহে কোনো কাঠিন্য নেই, আছে এক বুক ভালোবাসা। কারণ, যে ভালোবাসতে জানে না, সে তো বিদ্রোহও করতে পারে না।

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জাতপাত আর বিভেদের রাজনীতি মানুষের মনকে কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। মানুষে মানুষে আজ অলঙ্ঘনীয় দেয়াল। ঠিক এখানেই নজরুল একজন নিখাদ ‘কসমোপলিটান’ বা বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠেন। তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি যে অমোঘ, অথচ সহজ সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন "গাহি সাম্যের গান / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান" তা আজ নিছক পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠায় বন্দি থাকার বিষয় নয়। এটি হতে পারত এক রুগ্ন পৃথিবীর মহৌষধ।


অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা উঠলে একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা বড় বেশি নিষ্ঠুর মনে হয়। একদিকে পুঁজিপতিদের সীমাহীন লোভ, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের ক্রমাগত প্রান্তিক হয়ে যাওয়া। চকচকে বহুতল ভবনের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে ঘর্মাক্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এমন সময়ে নজরুলের ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের পাতা উল্টালে মনে হয়, প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন এক একটি জ্বলন্ত অঙ্গার। কার্ল মার্ক্সের ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ তত্ত্ব নজরুলের কবিতায় এসে কোনো শুষ্ক একাডেমিক বুলি হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে রক্ত-মাংসে গড়া এক জীবন্ত, স্পন্দিত লড়াই।

কবি নিজের চোখে দেখেছেন, কীভাবে কুলি-মজুরের বুকের হাড় দিয়ে তৈরি বাষ্পশকট ছুটে চলে, অথচ সেই শ্রমিকের কপালেই জোটে চরম অবজ্ঞা আর লাথি। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন গ্লোবাল নর্থ আর গ্লোবাল সাউথের মধ্যকার সম্পদের পাহাড়প্রমাণ বৈষম্যের দিকে চোখ পড়ে, তখন নজরুলের সেই আর্তি "রাজার প্রাসাদ কড়ি দিয়ে গাঁথা, মোদের হাড়ের গুঁড়ো" বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা আর ক্ষোভের জন্ম দেয়। আধুনিক কারখানার রোবোটিক বাহুর নিচে আজও যে মানুষটা নিঃশব্দে ঘাম ঝরাচ্ছে, নজরুল যেন তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। নজরুলের অর্থনীতি কোনো গালভরা ‘ইজম’ বা মতবাদের দাস ছিল না; তা ছিল ন্যায়ের, সমবায়ের আর নিরেট মানবতার। আন্তোনিও গ্রামশির ‘হেজেমনি’ বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বে নজরুলকে হয়তো একজন ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বলা যায়, যিনি সমাজের একেবারে নিচুতলার মানুষের চাপা কান্নাকে সাহিত্যের মূল রাজপথে সগৌরবে নিয়ে এসেছিলেন।

নারীর অধিকার আর লিঙ্গ সমতার প্রশ্নে নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকালে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তিনি এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলেছিলেন, যখন সমাজ নারীকে কেবল চার দেয়ালের মাঝে মানিয়ে নেওয়ার তালিম দিত। অথচ নজরুল অবলীলায় গাইলেন "বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।" এই কথাটি কেবল নারীর ক্ষমতায়নের কোনো সস্তা স্লোগান নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর দার্শনিক সত্য, যা লিঙ্গীয় দ্বৈততাকে (Gender Binary) অস্বীকার করে এক অখণ্ড, পূর্ণাঙ্গ মানবতার কথা বলে।

সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে বলেছিলেন, "মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং নারী হয়ে ওঠে।" সমাজ কীভাবে নারীকে নির্মাণ করে, বোভোয়ার সেই কথাটিই বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তার বহু আগেই নজরুল সমাজের এই শিকল ভাঙার ডাক দিয়েছিলেন। আজকের পৃথিবীতে নারীবাদী আন্দোলনের যে নানান ঢেউ আর বাঁক দেখা যায়, তার একটি বড় অংশের বীজ নজরুলের চিন্তায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে ছিল। তিনি নারীর মাতৃত্বকে, তার স্নেহশীল রূপটিকে যেমন পরম শ্রদ্ধায় ভালোবেসেছেন, তেমনি তার ভেতরের লড়াকু, রুদ্র সত্তাকেও সমানভাবে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কবির চোখে নারী কেবল সেবিকা বা দেবী নয়; সে রক্তমাংসের মানুষ, সে ‘রণরঙ্গিণী’। আজকের দিনের সূক্ষ্ম পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার শেকড় উৎপাটন করতে হলে নজরুল-পাঠ যেন এক অপরিহার্য সাংস্কৃতিক চিকিৎসা।

ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তীর ‘ক্লাইমেট অফ হিস্ট্রি’র আলোকে যদি নজরুলের প্রকৃতিকে দেখা যায়, তবে বোঝা যায় নজরুল কখনোই প্রকৃতিকে মানুষের ভোগের বস্তু বা ‘রিসোর্স’ হিসেবে দেখেননি। প্রকৃতি তাঁর কাছে ছিল আত্মারই একটি সম্প্রসারিত অংশ। যান্ত্রিকতার প্রতি তাঁর যে ক্ষোভ, তার মূলে ছিল এই বোধ যে যন্ত্র মানুষকে প্রকৃতির কোল থেকে, মাটির গন্ধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আজকের এই তীব্র ডিজিটাল আসক্তির যুগে, যেখানে মানুষ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জীবনের অর্ধেক সময় পার করে দিচ্ছে, সেখানে নজরুলের সাহিত্য এক শীতল মাটির স্পর্শের মতো। তা শেখায় কীভাবে ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটতে হয়, কীভাবে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা রোদকে বুকের ভেতর টেনে নিতে হয়। মানুষের সাথে প্রকৃতির এই যে আদিম, মায়াময় সম্পর্ক, নজরুল তা ভুলতে দেননি।

তারুণ্য আর যৌবন নজরুলের সাহিত্যের আরেক বিরাট ক্যানভাস। তিনি নিজেই ছিলেন এক চিরতরুণ সত্তা, বয়সের ফ্রেমে যাকে বাঁধা যায় না। বর্তমান প্রজন্মের দিকে তাকালে কখনো কখনো বড় অদ্ভুত এক ক্লান্তি চোখে পড়ে। চারদিকে এত এত তথ্য, এত যোগাযোগ, তবু কোথায় যেন এক গভীর হতাশা, লক্ষ্যহীনতা আর বিচ্ছিন্নতা তরুণ মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। মাদকাসক্তি আর ভার্চুয়াল জগতের মেকি আনন্দে হারিয়ে যাচ্ছে একটি আস্ত প্রজন্ম। ঠিক এই জায়গায় নজরুলের ‘যৌবনের গান’ হতে পারে এক অমোঘ সঞ্জীবনী।

কবি তো তরুণদের কাছেই বারবার ফিরে গেছেন। তিনি বলেছেন "বার্ধক্যকে বিদায় দাও, যৌবনকে বরণ করো।" নজরুলের এই ‘যৌবন’ কেবল চামড়ার টানটান ভাব বা বয়সের অংক নয়। এ হলো মনের সজীবতা, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস আর ভেঙে নতুন করে গড়ার উন্মাদনা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে যাকে ‘রেজিলিয়েন্স’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বলা হয়, নজরুলের প্রতিটি শব্দ যেন সেই ক্ষমতায় টইটম্বুর। তিনি এমন এক নির্ভীক প্রজন্মের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যারা অন্যায়ের সামনে মাথানত করবে না, যারা চোখের দিকে তাকিয়ে সত্য বলতে শিখবে।

বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় নজরুলের অবস্থান নিয়ে কখনো কখনো একধরনের আক্ষেপ তৈরি হয়। কেন তাঁকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ তকমা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও ভাষাগত গণ্ডিতে আটকে রাখা হলো? এই প্রশ্নটি আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের ‘দ্য টাস্ক অফ দ্য ট্রান্সলেটর’ প্রবন্ধের কথা যদি মনে রাখা যায়, তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে অনুবাদের অভাবে একটি বিশ্বমানের দর্শন কীভাবে কেবল একটি অঞ্চলের সম্পদ হয়েই রয়ে গেছে।

নজরুলের দর্শন কেবল বাঙালির নয়। আফ্রিকার খনিতে কাজ করা শ্রমিক, লাতিন আমেরিকার অধিকারবঞ্চিত মানুষ কিংবা প্যালেস্টাইনের উদ্বাস্তু শিবিরের কোনো শিশু সবার জন্যই নজরুলের কথাগুলো সমান সত্যি। ফ্রান্তজ ফানো তাঁর ‘দ্য রেচেড অফ দি আর্থ’ গ্রন্থে দুনিয়ার যে লাঞ্ছিত মানুষের কথা বলেছেন, নজরুল তো তাঁর কবিতায় সেই মানুষদেরই কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। অথচ আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিয়াতে নজরুলের ওপর গবেষণার বড্ড অভাব। উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক হোমি ভাবার ‘হাইব্রিডিটি’ বা সংকর তত্ত্বের লেন্স দিয়ে দেখলে অবাক হতে হয় কী অবলীলায় নজরুল ফারসি, আরবি, সংস্কৃত আর দেশজ শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা ভাষাকে এক অভাবনীয় শক্তি আর ঐশ্বর্য দান করেছিলেন! এই শব্দগুলো তো কেবল শব্দ নয়, এগুলো একেকটি সংস্কৃতির মেলবন্ধন। এই মেলবন্ধনের বার্তা আজ সারা পৃথিবীর জানা প্রয়োজন।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর নব্য-সাম্রাজ্যবাদের এই যুগে নিজস্ব পরিচয় টিকিয়ে রাখা এক বড় সংগ্রাম। আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রবাহে আর গ্লোবালাইজেশনের ধাক্কায় মানুষ যখন নিজের শেকড় ভুলতে বসেছে, তখন নজরুলের দেশপ্রেম এক শক্ত নোঙরের মতো কাজ করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি যেমন কলমকে তরবারির মতো ব্যবহার করেছিলেন, ঠিক একইভাবে আজকের দিনেও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা তাঁর ভেতরেই লুকিয়ে আছে।

তাঁর দেশপ্রেমের মধ্যে কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল না। দেশ তাঁর কাছে কেবল একটি মানচিত্র বা ভৌগোলিক রেখা নয়; দেশ তাঁর কাছে পরম মমতাময়ী ‘মা’। বঙ্কিমচন্দ্রের দেশমাতার ধারণার চেয়ে নজরুলের ভাবনা কিছুটা ভিন্ন। নজরুল এর দেশমাতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের নয়, বরং সকল ধর্মের, সকল বর্ণের মানুষের এক নিরাপদ, স্নেহময় আশ্রয়। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মানুষের মনের, চিন্তার আর সংস্কৃতির স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। আজ যখন পৃথিবীর সবকিছুই প্রায় এক ছাঁচে ঢেলে ফেলার চেষ্টা চলছে, তখন নজরুলের লোকজ সুর আর ধ্রুপদী রাগিণীর মিশ্রণ মনে করিয়ে দেয় নিজের মাটির গন্ধ গায়ে মেখেই বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।

নজরুলকে নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁর ভেতরের এক গভীর আধ্যাত্মিক, মরমী সত্তার কথা না বললেই নয়। একদিকে তিনি যেমন সমাজতন্ত্রের সমতা আর বিদ্রোহের আগুনে পুড়ছেন, অন্যদিকে তাঁর ভেতরেই বয়ে চলেছে সুফিবাদ আর বৈষ্ণব দর্শনের এক শান্ত, গভীর ফল্গুধারা। এই যে বিপরীত দুই মেরুর একত্রাবস্থান, এটাই নজরুলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

রুশ চিন্তাবিদ মিখাইল বাখতিনের ‘ডায়ালজিক’ বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির কথা ধার করে বলা যায়, নজরুলের ভেতরের ‘আমি’ প্রতিনিয়ত পরম করুণাময়ের সাথে এক নিবিড় সংলাপে লিপ্ত ছিল। তাঁর মরমী গানগুলো শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। সেখানে যে সমর্পণ আর হাহাকার ফুটে উঠেছে, তা তো আসলে মানুষের চিরন্তন আধ্যাত্মিক তৃষ্ণারই রূপ। তাঁর এই আধ্যাত্মিকতায় কোনো গোঁড়ামি ছিল না, ছিল না কোনো শুষ্ক আচার-সর্বস্বতা। তা ছিল মানুষের ভেতরেই ঈশ্বরের সন্ধান। "নিজেরে চিনলে খোদা চেনা যায়" এই সহজ অথচ অসীম গভীর দর্শনে তিনি বিশ্বাস করতেন। আজকের এই চূড়ান্ত বস্তুবাদী পৃথিবীতে, যেখানে সবকিছুই কেনাবেচা যায়, কিন্তু মনের শান্তি কোথাও মেলে না সেখানে নজরুলের এই আধ্যাত্মিক দর্শন হতে পারে এক ছায়াসুনিবিড় বটবৃক্ষ।

বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি আর প্রযুক্তির চরম শিখরে বসে আজ একটা কথা খুব মনে পড়ে। প্রযুক্তির নিজস্ব কোনো নীতিবোধ নেই; তা নির্ভর করে মানুষের ওপর। নজরুল ঠিক এই নীতিবোধের জায়গাটিতেই বারবার আঘাত করেছেন। তিনি যন্ত্রকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু যন্ত্রের চেয়ে যন্ত্রীকে, অর্থাৎ মানুষকে বেশি ভালোবেসেছেন।

তাঁর ভাবনায় বিজ্ঞান আর মানবিকতার এক আশ্চর্য ভারসাম্য ছিল। তিনি জানতেন, কেবল উড়োজাহাজ আবিষ্কার বা গতির উন্নতি মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারবে না, যদি না মানুষের ভেতরের হিংসা আর অন্ধকারের অবসান হয়। তাই একদিকে তিনি যেমন মানুষের বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন, তেমনি ধুঁকতে থাকা শ্রমিকের বেদনায় তাঁর চোখ ভিজেছে। এই যে মানুষের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা, এটাই তো একজন সাধারণ মানুষকে মহামানবে পরিণত করে।

নজরুলকে নিয়ে কেবল বছরের নির্দিষ্ট দিনে কিছু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা করলেই কি তাঁর প্রতি দায় মেটে? হয়তো না। তাঁর প্রতি আসল সম্মান হলো তাঁর আদর্শকে প্রাত্যহিক জীবনের ধুলোবালির মধ্যে নামিয়ে আনা। একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা তো আজও অধরা। তাঁর ‘অভিশাপ’ কবিতাটি পড়লে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ক্ষমতার দম্ভে যারা মত্ত, তাদের জন্য নজরুলের শব্দগুলো এক অমোঘ সতর্কবার্তা। আবার যারা অন্ধকারে পড়ে আছে, যারা দিনের পর দিন বঞ্চিত, তাদের জন্য নজরুলের নামই যেন এক পরম সান্ত্বনা আর সাহসের সমার্থক।

নজরুলের সাহিত্যের আরেকটি বড় জাদুকরী দিক হলো এর ধ্বনি বা ‘সাউন্ডস্কেপ’। তাঁর প্রতিটি লেখায়, প্রতিটি গানে এক অদ্ভুত ছন্দময় গতিশীলতা আছে, যা কাউকে স্থির হয়ে বসে থাকতে দেয় না। এই গতিশীলতা তো আসলে জীবনেরই ধর্ম। জার্মান দার্শনিক থিওডর অ্যাডর্নো শিল্পের যে প্রতিরোধমূলক ভূমিকার কথা বলতেন, নজরুলের শিল্প ঠিক সেটাই। তিনি তো কেবল শিল্পের জন্য শিল্প করেননি; তাঁর কলম ছিল গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার। আজও যখন কোথাও ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’ বেজে ওঠে, তখন বুকের ভেতর রক্তের যে স্পন্দন তৈরি হয়, তা পৃথিবীর খুব কম সাহিত্যেই দেখা যায়। শব্দের ভেতরে কীভাবে প্রাণ ভোমরা লুকিয়ে রাখতে হয়, নজরুল তা খুব ভালো করেই জানতেন।

নজরুল ইসলাম তাই কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো স্থির নাম নন। তিনি এক প্রবাহমান নদী, এক চিরন্তন দ্রোহ আর মানুষের মুক্তির এক অনন্ত সুর। তাঁর জীবন শেখায় কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে হয়, কীভাবে মানুষকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসতে হয়। তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা, তাঁর সাম্যবাদ আর তাঁর প্রেম সবই যেন আজকের এই খণ্ডিত পৃথিবীর জন্য এক জোরালো ইশতেহার।

কখনো কি মনে হয় না, সবকিছু বদলে যাওয়ার পরও মানুষের মৌলিক কান্না আর হাসির কোনো পরিবর্তন হয়নি? শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যায়, সভ্যতা রূপ বদলায়, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের শূন্যতা আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ঠিক একই রয়ে যায়। নজরুল সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষারই ভাষা। তাঁর সেই ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব কেবল সেকালের অন্ধকার কাটানোর জন্যই ছিল না; বরং তা ছিল অনাগত ভবিষ্যতের জন্য জ্বালিয়ে যাওয়া এক মশাল।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০