মৃত্তিকা ও মরুভূমির আলিঙ্গন
নজরুলের কাব্যে ইসলামি ঐতিহ্যের মানবিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পুনর্নির্মাণ
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলা কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যকে সাম্য, স্বাধীনতা, মানবতা ও প্রেমের অনন্য শিল্পরূপ দিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। আরব-পারস্যের ইতিহাস, সুফি দর্শন ও কারবালার আত্মত্যাগকে বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন এক অসাধারণ সাহিত্যিক জগৎ, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে শোষণমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মর্যাদার বাণী।
নজরুল যখন বাংলা কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যকে মিশিয়ে দিলেন, তখন তা নিছক কোনো ধর্মীয় প্রচার ছিল না। এর আগে বাংলার মাটিতে ধর্মের কথা কাব্যে এসেছে ঠিকই, কিন্তু নজরুলের হাতে পড়ে সেই পুরোনো আরব্য-পারস্যের ইতিহাস যেন হঠাৎ বাংলার ধুলোকাদায় জীবন্ত হয়ে উঠল। ধর্মগ্রন্থের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে সেইসব চরিত্র, সেইসব দর্শন যেন সোজা এসে দাঁড়াল বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের পাশে। এক অদ্ভুত সংশ্লেষ। একদিকে মরুভূমির রুক্ষ, তপ্ত হাওয়া, অন্যদিকে বাংলার সুজলা-সুফলা স্নিগ্ধতা এই দুয়ের এমন নিবিড় আলিঙ্গন বাংলা সাহিত্য আগে কখনো দেখেনি।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে ‘সঞ্চিতা’র পাতা উল্টালে প্রথমেই চোখে পড়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। কী এক আশ্চর্য স্পর্ধায় সেখানে লেখা হয়েছে
"আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দণ্ড..."
আবার কিছুক্ষণ পরেই বলা হচ্ছে
"ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’!"
খুব গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, এখানে ইসলামি অনুষঙ্গগুলো কোনো আচারের গণ্ডিতে আটকে নেই। এগুলো তাঁর কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠার একেকটা রূপক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট একটা সমাজকে যখন তিনি জাগাতে চাইছেন, তখন তাঁর দরকার ছিল প্রচণ্ড শক্তির। সেই শক্তি তিনি ধার করেছেন ইসলামের আদি শৌর্য-বীর্য থেকে।
এডওয়ার্ড সাঈদের কথা অনেকেই বলেন, যিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে প্রাচ্যকে বিকৃত করে দেখেছে পশ্চিমারা। কিন্তু নজরুল কোনো তাত্ত্বিক বিতর্কে যাননি। তিনি সোজা পথে হেঁটেছেন। তিনি প্রাচ্যের, বিশেষ করে ইসলামি ইতিহাসের সেইসব ভুলে যাওয়া বীরদের তারিক, মুসা, খালিদ, ওমর ফারুক বাংলার মাটিতে নতুন করে জন্ম দিলেন। পরাধীন বাঙালি মুসলিম সমাজ, যারা প্রায় ভুলতে বসেছিল মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কথা, তাদের কাছে এই কবিতাগুলো ছিল হারানো আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার মন্ত্র। ‘কামাল পাশা’ বা ‘আনোয়ার’ পড়ার সময় পাঠকের মনে হয় না যে তারা দূরের কোনো দেশের গল্প পড়ছে। মনে হয়, এই তো আমাদেরই আপন কেউ, বুকের রক্ত দিয়ে স্বাধীন হতে ডাক দিচ্ছে।
ইসলামের সাম্যবাদী রূপটি নজরুলের চেয়ে গভীরভাবে খুব কম মানুষই বুঝেছেন। আধুনিক রাজনীতিতে যাকে আমরা সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ বলি, নজরুল তার শিকড় খুঁজে পেয়েছিলেন ইসলামের আদি খেলাফতে। খলিফা ওমরের জীবনকে তিনি যেভাবে এঁকেছেন, তা তো শুধু একজন শাসকের প্রশস্তি নয়। সেখানে শাসকের কাঠিন্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক পরম মানবিক হৃদয়ের স্পন্দন শোনা যায়। সাধারণ মানুষের প্রতি শাসকের যে দায়বদ্ধতা, তা নজরুলের কলমে হয়ে উঠেছে আধুনিক গণতান্ত্রিক স্বপ্নের এক আদিম রূপ।
মাঝে মাঝে মনে হয়, নজরুলের এই যে এত ক্ষোভ, এত দ্রোহ এর গভীরে হয়তো লুকিয়ে ছিল চরম এক অভিমানী প্রেমিক। আধ্যাত্মিকতা ও মরমী দর্শন তাঁর অস্থিমজ্জায় মিশে ছিল। বাংলা সাহিত্যে নাতে-রাসুল বা ইসলামি সংগীতের যে শূন্যতা ছিল, তা তিনি এমনভাবে পূরণ করলেন যা আজও বিস্ময় জাগায়।
তাঁর হামদ বা নাতগুলো কেবল আক্ষরিক ধর্মাচরণ নয়। তার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক গভীর ব্যাকুলতা। হাফিজ, রুমি বা সাদি-র যে আধ্যাত্মিক উন্মাদনা, তা যেন ভর করেছিল এই খ্যাপাটে কবির ওপর। স্রষ্টাকে ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো মানবপ্রেম হতে পারে না এই বিশ্বাস তাঁর ভেতর এমনভাবে গাঁথা ছিল যে, তাঁর কাব্যে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল ইতিহাসের কোনো মহামানব হয়ে থাকেননি। তিনি হয়ে উঠেছেন ‘মদিনার বুলবুল’, ‘মরুর দুলাল’।
"রসুল নামের ফুল ফুটেছে এই জগতের গুলশানে..."
যখন এই লাইনগুলো পড়া হয়, তখন কি কেবল ধর্মীয় অনুভূতিই জাগে? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা অপার্থিব সৌন্দর্যের বোধ মনকে শান্ত করে দেয়? নজরুল ইসলামি ঐতিহ্যকে ব্যবহার করেছেন তাঁর নিজের যন্ত্রণার রঙে রাঙিয়ে। পুরোনো ঐতিহ্য তাঁর হাতে পড়ে নতুন এক সৃজনশীল রূপ পেল। অতীতের গণ্ডি পেরিয়ে তা হয়ে উঠল বর্তমানের এক জীবন্ত শক্তি।
ভাষার জগতে নজরুলের মতো সাহসী হয়তো আর কেউ ছিলেন না। ‘খুন’, ‘শহীদ’, ‘গাজি’, ‘তউহিদ’, ‘আমানত’ আরবি ও ফারসি ভাষার এই শব্দগুলো এর আগেও অনেকে বাংলা কবিতায় আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেগুলো ছিল বড্ড কাঠখোট্টা, জোর করে চাপানো। আর নজরুলের হাতে? এই শব্দগুলো যেন বাংলার নিজস্ব জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা বৃক্ষের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
তৎসম শব্দের কঠিন খোলস ভেঙে তিনি যখন এই ভিনদেশি শব্দগুলোকে বাংলা পয়ার আর মাত্রাবৃত্তের ছন্দে বসালেন, তখন বাংলা কবিতার ব্যাকরণটাই গেল পাল্টে। এটা কেবল একটা সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল না; এটা ছিল গণমানুষের ভাষাকে সাহিত্যের দরবারে তুলে আনার একটা সচেতন চেষ্টা। যে মানুষগুলো মাঠে কাজ করে, যারা নদীতে নৌকা বায়, তাদের মুখের ভাষাকে তিনি কবিতার সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর কলমে ‘খুন’ শব্দটা শুধু রক্ত বোঝায় না, তার মধ্যে মিশে থাকে বঞ্চনার ক্ষোভ আর প্রতিবাদের আগুন।
‘মহররম’ বা ‘কুরবানি’ নজরুলের কাছে এগুলো শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ কেটে রাখা কোনো উৎসব ছিল না। এগুলো ছিল সংগ্রামের প্রতীক। কারবালার ময়দানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেনের যে আত্মত্যাগ, নজরুল তাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামের সাথে।
‘সঞ্চিতা’র পাতা হাতড়ালে এমন বহু পঙ্ক্তি পাওয়া যায়, যেখানে ত্যাগের মহিমাকে তিনি মানুষের ভেতরের পশুত্ব বিসর্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। ‘কোরবানী’ কবিতায় যখন তিনি বলেন:
"ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন!"
তখন তিনি আসলে ধর্মের সেই আসল রূপটাকেই চেনাতে চাইছেন। ইসলাম মানে শুধু নীরবে তসবিহ জপ করা নয়, বরং সত্যের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য প্রয়োজনে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া। ফরাসি দার্শনিক সার্ত্রের ‘দায়বদ্ধতার সাহিত্য’-এর কথা যদি ভাবি, তবে নজরুল ছিলেন সেই মাপের একজন দায়বদ্ধ কবি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল শোষিতের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
নজরুলের ইসলামি ঐতিহ্যের চর্চা কখনো তাঁকে সাম্প্রদায়িক বা সংকীর্ণ করেনি; উল্টো তাঁকে নিয়ে গেছে এক চরম মানবতাবাদের শিখরে। ‘সঞ্চিতা’র অন্তর্গত ‘সাম্যবাদী’ কবিতার পাতাটা খুললেই চোখে পড়ে সেই অমোঘ উচ্চারণ:
"গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম-ক্রীশ্চান।"
তিনি বিশ্বাস করতেন, স্রষ্টাকে খোঁজার সবচেয়ে সহজ পথ হলো মানুষের সেবা করা। এই ইসলামি মানবতাবাদই নজরুলকে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এতটা আপন করে তুলেছে। তিনি যখন ইসলামের কথা বলেছেন, তখন তা কেবল মুসলমানদের সম্পত্তি হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সমস্ত বঞ্চিত, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের সাধারণ সম্পদ।
নজরুল যখন প্রেমের কথা বলেন, তখনো সেখানে ইসলামি ঐতিহ্যের এক সূক্ষ্ম, মায়াবী ছোঁয়া এসে পড়ে। গজল যা মূলত পারস্যের সম্পদ, তাকে তিনি বাঙালির প্রাণের সুরে বাঁধলেন। ‘সঞ্চিতা’র শেষে গানের যে অংশটি রয়েছে, সেখানে তাকালে দেখা যায় বিরহের কী এক আশ্চর্য জগৎ তিনি তৈরি করেছেন।
"বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল..."
এই গানগুলোর ভেতরে যে রোমান্টিকতা, তার গভীরে সুফি দর্শনের একটা হালকা রেশ আছে। ঐশ্বরিক প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, যাকে ‘ইশকে-হকিকি’ বলা হয়, তা যেন মানবীয় প্রেমের রূপ ধরে ধরা দেয়। আরব্য উপন্যাসের মায়াবী রাত, শিরাজির পেয়ালা, আঙুরলতা আর বুলবুলির গান এসব অনুষঙ্গ ব্যবহার করে তিনি বাংলা কবিতাকে এক নতুন অপার্থিব সৌন্দর্যের স্বাদ দিয়েছিলেন।
কখনো কখনো মনে হয়, এত কোলাহল, এত বিদ্রোহ, এত প্রেমের গানের ভিড়ে নজরুল হয়তো ভীষণ একা ছিলেন। ‘সঞ্চিতা’র পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে একটা ঠিকানা না-পাওয়া পাখির হাহাকার। তিনি অবিরাম খুঁজে ফিরেছেন এমন এক আশ্রয়, যেখানে কোনো বিভেদ নেই, বঞ্চনা নেই।
ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব দিয়ে অনেকে হয়তো বলবেন, তাঁর শৈশবের অনাথ জীবন, অভাব, আর যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো যৌবন তাঁকে একটা আশ্রয়ের সন্ধানে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আর সেই পরম আশ্রয় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মরমী বিশ্বাসে। ইসলামি ঐতিহ্য তাঁর কাছে কেবল একটা ধর্ম ছিল না, ছিল সেই মহীরুহ যার ছায়ায় বসে এই শ্রান্ত পথিক খানিক জিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
আবার ল্যাকানের মনস্তত্ত্বের কথা যদি ভাবি, তবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে নিজেকে, নিজের আত্মপরিচয়কে দাঁড় করানোর জন্য তাঁর একটা শক্তিশালী ‘আদার’ বা বিপরীত সত্তার দরকার ছিল। ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস তাঁকে সেই পরিচয় নির্মাণের কাঁচামাল জুগিয়েছিল।
আধুনিক বাংলা কবিতায় নজরুলের পরে অনেকেই এসেছেন। ফররুখ আহমদের মতো কবিরা খুব সফলভাবেই ইসলামি ঐতিহ্যকে কাব্যে রূপ দিয়েছেন। কিন্তু নজরুলের সেই সর্বজনীনতা, সেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে বুকে টেনে নেওয়ার বিশালত্ব সেটা যেন আর কারো মাঝে সেভাবে ফিরে আসেনি। নজরুল ঐতিহ্যকে অস্বীকার করেননি, আবার ঐতিহ্যের পায়ে শেকলও পরেননি। তিনি অতীতকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটেছেন ভবিষ্যতের দিকে। কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটা আস্ত সময়, একটা ঝড়। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল সাম্য, স্বাধীনতা আর পরম প্রেমের এক বিপ্লব।
আজকের এই অস্থির, অসহিষ্ণু পৃথিবীতে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা হয়তো আরও অনেক বেশি। তিনি শিখিয়ে গেছেন, কীভাবে নিজের শিকড়ে পা রেখেও গোটা আকাশের দিকে হাত বাড়ানো যায়। কীভাবে নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেও অন্যকে সম্মান করতে হয়।
১১৯ বার পড়া হয়েছে