সর্বশেষ

সাহিত্য

'সাম্যবাদী' কাব্যে মানবের অনিঃশেষ আরতি

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:৪২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ শুধু কবিতার সংকলন নয়, বরং মানবতা, সাম্য, শ্রমের মর্যাদা, নারীর অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক অনন্য দর্শন। ধর্ম, জাতপাত ও শ্রেণিবৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার যে আহ্বান নজরুল জানিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতার দ্রোহী উচ্চারণ মানবমুক্তির পথ দেখায়। গাউসুর রহমানের এই প্রবন্ধে উঠে এসেছে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের মানবিক দর্শন, সাহিত্যিক তাৎপর্য ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা।
গাউসুর রহমান

বিশ শতকের বিশের দশক। বাংলার আকাশ তখন মেঘে ঢাকা, গুমোট এক গুমরানো যন্ত্রণা থমকে আছে চারধারে। একদিকে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলের ঝনঝনানি, অন্যদিকে ধর্মের নামে ভেদাভেদ আর আভিজাত্যের মিথ্যে অহমিকা। ঠিক সেই সময়ে ধূমকেতুর মতো একজনের আবির্ভাব ঘটেছিল, যার হাতের কলম শুধু কালি ছড়ায়নি, ছড়িয়েছিল বারুদ আর বুকের রক্ত। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২৫ সালে যখন তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থটি আলোর মুখ দেখল, তখন তা কেবল একগুচ্ছ কবিতা হিসেবে আসেনি, এসেছিল মানুষের জয়গান গাইতে থাকা এক অবিনাশী মন্ত্র হয়ে। নজরুল যখন এই পঙক্তিমালা রচনা করছেন, তখন একদিকে রুশ বিপ্লবের লাল আভা বিশ্বের চিন্তাশীল মহলে নাড়া দিচ্ছে, অন্যদিকে এদেশের সাধারণ মানুষ জাতপাতের শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। নজরুলের সাম্যবাদ কোনো বিদেশি তত্ত্বের ধার করা অনুবাদ নয়, বরং এদেশের পলিমাটি আর মানুষের ঘামের গন্ধে জারিত এক সহজাত আধ্যাত্মিক আরতি।

নজরুলের কবিসত্তাকে অনুধাবন করতে গেলে দেখা যায়, তিনি মানুষের হৃদয়ের অন্দরে এমন এক মণিপ্রদীপের সন্ধান পেয়েছিলেন, যার আলোয় জগতের সব কৃত্রিম বিভেদ ম্লান হয়ে যায়। 'সাম্যবাদী' কাব্যের পরতে পরতে যে সত্যটি সবচেয়ে বেশি স্পন্দিত হয়েছে, তা হলো মানুষের চেয়ে বড় কিছু আর নেই। নিবিড়ভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের মূলে রয়েছে এক অদ্ভুত সমন্বিত চেতনা। তিনি একদিকে যেমন লালন বা চণ্ডীদাসের সেই মরমী ঐতিহ্যের উত্তরসূরি, অন্যদিকে তিনি আধুনিক যুগের সেই প্রবক্তা যিনি শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকারের কথা দৃপ্তকণ্ঠে বলতে পারেন।

'কুলি-মজুর' কবিতায় তিনি যে চিত্রকল্প এঁকেছেন, তা যে কোনো সংবেদনশীল পাঠককে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয়। যে শ্রমিক তার হাড় দিয়ে বাষ্পীয় শকট চালায়, যার ঘামে ধন্য হয় অট্টালিকার ভিত্তি, তাকে যখন সমাজ 'কুলি' বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, তখন কবির কলম হয়ে ওঠে অগ্নীবর্ষণকারী। তিনি প্রশ্ন তোলেন বেতন দিয়েছ কি? এই প্রশ্নটি কেবল অর্থের হিসাব নয়, এ হলো মানবিকতার এক চূড়ান্ত কৈফিয়ত। একসময় পৌরাণিক দধীচি নিজের হাড় দিয়েছিলেন অসুর বিনাশের জন্য, আর আধুনিক যুগে এই নামগোত্রহীন শ্রমিকরাই তো সেই দধীচি, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে গড়ে দিচ্ছে সভ্যতার পথ। অথচ তাদের প্রাপ্য জোটে কেবল অবজ্ঞা। নজরুল এই অমানবিকতার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতার মাধ্যমে নয়, বরং এক পরম বেদনা আর মমত্বের ভাষায়।

কবি সজোরে ঘোষণা করেন, “তুুমি জান নাকো, কিন্তু পথের প্রতি ধূলিকণা জানে, / ওই পথ, ওই জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!” এই যে শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, এটাই নজরুলের সাম্যবাদের প্রাণ। আজ যখন আমরা বড় বড় মেট্রো রেল বা আধুনিক কলকারখানা দেখি, তখন নজরুলের সেই ‘শুভদিন’-এর কথা মনে পড়ে যায়। দেনা শোধ করার সময় কি সত্যিই এসেছে? নাকি আজও শোষকের চাবুক রূপ বদলে প্রযুক্তির মোড়কে শ্রমিকের ঘাড়েই নামছে?

নজরুল এখানে এক ‘প্রফেটিক’ বা ভবিষ্যদ্বাণীসুলভ সুর তুলেছেন। তিনি জানতেন, যাদের আজ ‘দুবর্ল’ বলে মার দেওয়া হচ্ছে, তাদের ব্যথিত বুকেই নব উত্থানের পদধ্বনি শোনা যাবে। মানুষের অপমান আসলে সমগ্র মানবজাতির লজ্জা এই বোধই নজরুলকে মহত্ত্ব দান করেছে।

সমাজে নারীর অবস্থান নিয়েও নজরুলের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আকাশচুম্বী। আজ যখন আমরা জেন্ডার ইকুয়ালিটি বা নারীর অধিকার নিয়ে বড় বড় সেমিনার করি, নজরুল তার বহু আগেই এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর 'নারী' কবিতাটি কেবল একটি কবিতা নয়, এটি একটি সভ্যতার ইশতেহার। তিনি যখন বলেন, "বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর," তখন তিনি ইতিহাসের সেই অন্ধকার খতিয়ানকে সামনে নিয়ে আসেন যেখানে নারীর অবদানকে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মানুষের ইতিহাসে পুরুষ হয়তো তার বীরত্বের কাহিনি লিখেছে রক্ত দিয়ে, কিন্তু সেই রক্তের পেছনে নারীর যে প্রেরণা, তার যে আত্মত্যাগ ছিল, তার হিসাব কজন রেখেছে? নজরুলের কাছে পুরুষ আর নারী কোনো প্রতিযোগী নয়, বরং তারা একই প্রাণের দুটি ডানা। একটিকে ছাড়া অন্যটির উড্ডয়ন যেমন অসম্ভব, তেমনি নারীকে অবদমিত রেখে কোনো সমাজের প্রকৃত মুক্তিও সুদূরপরাহত। যে সমাজ নারীকে দাসী করে রাখে, সেই সমাজ আসলে নিজের পায়েই শিকল পরায়। কারণ নজরুলের দর্শনে, পীড়ন করলে সেই পীড়ন ফিরে আসবে নিজের ওপরেই এটাই হলো প্রকৃতির অমোঘ বিধান।সিমোন দ্য বোভোয়ার যখন ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ লিখছেন, তার কয়েক দশক আগেই নজরুল বলে গেছেন “অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!”

এই যে নারীর মুক্তি, এটি নজরুলের কাছে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল না। এটি ছিল সৃষ্টির এক শাশ্বত নিয়মের পুনরুদ্ধার। পুরুষ ও নারী যেন একটি মুদ্রার দুই পিঠ একটি ছাড়া অন্যটি অচল। এই যে ‘কমপ্লিমেন্টারি’ বা পরিপূরক সত্তার ধারণা, এটাই নজরুলকে সমকালীন ও আধুনিক করে তুলেছে।

নজরুলের সমাজ পর্যবেক্ষণের একটা বড় দিক হলো সমাজের ভণ্ডামিকে তুলে ধরা। ‘চোর-ডাকাত’ কবিতায় তিনি খুব সহজ একটা প্রশ্ন করেছেন: "কে তোমায় বলে ডাকাত বন্ধু, কে তোমায় চোর বলে?" সমাজ ছোট ছোট চোরদের শাস্তি দেয়, আর যারা বড় চোর, যারা কলকারখানা বসিয়ে হাজার হাজার মানুষের রক্ত চুষে খাচ্ছে, তাদের দেয় সম্মান। "ছোটদের সব চুরি করে আজ বড়োরা হয়েছ বড়ো! / যারা যত বড়ো ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ / তারা তত বড়ো সম্মানী গুণী জাতি-সংঘেতে আজ।" আজকের বৈশ্বিক রাজনীতির দিকে তাকালে এই কথাটার চেয়ে বড় সত্য আর কী হতে পারে? যারা অস্ত্র ব্যবসা করে, যারা প্রকৃতির সম্পদ লুট করে, তারাই তো আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত জায়গায় বসে আছে। আর সাধারণ মানুষ, যারা দুবেলা ভাতের জন্য লড়াই করছে, তাদের কপালে জুটছে অপবাদ। এই যে প্রাতিষ্ঠানিক শোষণ, এর বিরুদ্ধে নজরুলের কলম ছিল একেবারে খাপখোলা তলোয়ার।

সমাজের এই ভণ্ডামির চরম রূপ দেখা যায় যখন সমাজ কাউকে ‘পাপী’ বা ‘পতিতা’ বলে দাগিয়ে দেয়। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় নজরুল যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। তিনি পতিতা নারীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেছেন। "কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে? / হয়তো তোমায় স-ন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।" সমাজ একজন নারীকে পতিতা বানায়, তারপর তাকেই ঘৃণা করে। অথচ সেই একই সমাজে পুরুষরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নজরুল এই পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পাপ করলেই কেউ অধিকার হারায় না। "শোনো মানুষের বাণী, / জন্মের পর মানব জাতির থাকে না ক’ কোনো গ্লানি!" এই যে মানুষকে তার জন্মের কারণে, তার পরিস্থিতির কারণে ছোট না করে, তার ভেতরের আত্মাকে সম্মান করা এটাই তো সবচেয়ে বড় ধর্ম। নজরুলের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে 'র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম' বা আমূল মানবতাবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা চারপাশের মিথ্যাচার আর প্রতারণা দেখি, তখন নজরুলের ‘মিথ্যাবাদী’ কবিতাটি বড্ড আপন মনে হয়। সত্য আসলে কী? "সত্যবাক সে বড়ো কিছু নয়, কজন সত্যবান? / সত্যবাদীরা কজন দিয়াছে সত্যের তরে প্রাণ?" অনেক সময় আমরা দেখি, তথাকথিত সৎ মানুষেরা খুব ভীতু হয়, তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। অথচ যারা হয়তো জীবনে অনেক মিথ্যা বলেছে, কিন্তু বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, জীবন দিয়েছে তারাই তো আসল বীর। "অন্তরে যারা যত বেশি ভীরু যত বেশি দুর্বল, / নীতিবিদ তারা তত বেশি করে সত্য-কথন ছল।" সত্যকে কেবল কেতাবি সংজ্ঞায় না মেপে, তাকে জীবনের কষ্টিপাথরে বিচার করতে চেয়েছেন নজরুল।

‘রাজা-প্রজা’ কবিতায় নজরুল রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক। "এক ধরণির সন্তান, কেন কেউ রাজা, কেউ প্রজা?" রাজারা কি নিজেদের চেষ্টায় রাজা হয়? না। প্রজাদের ঘাম আর শ্রমের ওপর ভর করেই তারা রাজত্ব করে। "প্রজারা সৃজন করেছে রাজায়, রাজা তো সৃজেনি প্রজা, / কৃতজ্ঞ রাজা তাই কি প্রজায় ধরে করে দিল খোঁজা?" এই যে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ, এটা আসলে সাধারণ মানুষের মনের কথা। রাষ্ট্র সব সময়ই সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখতে চায়। গ্রামসির ভাষায় যাকে ‘হেজেমনি’ বা আধিপত্যবাদ বলা হয়। নজরুল তাঁর কবিতার মাধ্যমে এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।

নজরুলের ভাষার কারুকার্যও এই কাব্যে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে তৎসম শব্দের পাশে আরবী-ফারসি শব্দ বসিয়ে দিয়েছেন। এই ভাষাগত সমন্বয় কেবল ব্যাকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল না, বরং তা ছিল হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সেই মিলনের সুর যা বাংলার মাটির চিরায়ত পরিচয়। নজরুলের ছন্দ যেন এক অশান্ত ঝর্ণার মতো, যা সব বাধা পেরিয়ে আপন গতিতে এগিয়ে যায়। তাঁর উপমাগুলো সরাসরি প্রকৃতি আর দৈনন্দিন জীবন থেকে নেওয়া। তিনি যখন আকাশের চাঁদকে রুটির সঙ্গে তুলনা করেন (পরবর্তীকালে অন্য কবিরা যা করেছেন), কিংবা শ্রমিকের হাড়কে দধীচির ত্যাগের সঙ্গে মেলাতেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে কবিতার অর্থ আর দুর্বোধ্য থাকে না। নজরুলের কবিতা পড়ার সময় মনে হয় না যে কোনো বৌদ্ধিক আলোচনা করা হচ্ছে; বরং মনে হয় এক জনমদুখী ভাই বা বন্ধু পাশে বসে নিজের বুকের রক্ত দিয়ে লেখা কোনো দস্তাবেজ পড়ে শোনাচ্ছেন। নজরুলের এই নন্দনতত্ত্ব ছিল মানুষের জন্য। তিনি কেবল আর্ট ফর আর্ট’স সেক (Art for Art’s sake) বা শিল্পের জন্য শিল্পে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর কাছে শিল্প ছিল মানুষের মুক্তির হাতিয়ার। তাই তাঁর চিত্রকল্পে উঠে আসে রাজপথের ধুলো, কুলির ঘাম, বারাঙ্গনার চোখের জল আর কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি।

প্রশ্ন জাগতে পারে, নজরুলের এই সাম্যবাদ কি কেবল অর্থনৈতিক? উত্তরটি না-বোধক হওয়াই স্বাভাবিক। মার্ক্সীয় সাম্যবাদ মূলত বস্তুনির্ভর ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নজরুলের সাম্যবাদ হলো হৃদয়ের ঐশ্বর্যের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি কেবল পেটের ক্ষুধা মেটানোর কথা বলেননি, তিনি মানুষের মনের দৈন্য দূর করার কথা বলেছেন। তাঁর সাম্যবাদে রুটি যেমন দরকার, তেমনি দরকার বাঁশির সুরও। তিনি জানতেন, মানুষ কেবল অন্নে বাঁচে না, তার আত্মার মুক্তির জন্য প্রয়োজন অবারিত আকাশ। তাই তাঁর কবিতায় আমরা দেখি একদিকে যেমন শোষকের বিরুদ্ধে দ্রোহ, অন্যদিকে স্রষ্টার প্রতি এক নিবিড় সমর্পণ। এই দ্বান্দ্বিকতাই নজরুলকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি একাধারে বিদ্রোহী এবং মরমী সাধক। তাঁর বিদ্রোহটি আসলে প্রেমেরই এক রুদ্র রূপ।

'পাপ' কবিতায় নজরুল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ করেছেন। মানুষ অন্যের পাপ গুনতে খুব ভালোবাসে, কিন্তু নিজের ভেতরে যে অন্ধকার জমে আছে, তার খবর কজন রাখে? নজরুল স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমরা সবাই কমবেশি পাপী। তাই অন্যকে বিচার করার আগে নিজের মনের আয়নায় একবার তাকানো জরুরি। তিনি মনে করতেন, ঘৃণা দিয়ে ঘৃণা জয় করা যায় না; বরং ভালোবাসা আর সহমর্মিতাই পারে মানুষের ভুলগুলোকে শুধরে দিতে।

আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে, যেখানে প্রযুক্তির দাপটে মানুষ যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে, সেখানে নজরুলের 'সাম্যবাদী' কাব্যের প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং আজ যখন ধর্মের নামে হানাহানি বাড়ছে, যখন পুঁজির পাহাড় গুটিকতক মানুষের হাতে বন্দী হচ্ছে, তখন নজরুলের সেই হুঙ্কার "গাহি সাম্যের গান / যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান" আরও বেশি দরকারি হয়ে উঠেছে। আমরা অনেক সময় তর্কে মেতে উঠি, কিন্তু ভুলে যাই যে ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ। নজরুল আমাদের সেই সহজ সত্যটিই মনে করিয়ে দেন। তিনি কোনো তত্ত্বের জটিলতায় যাননি, তিনি গিয়েছেন মানুষের কাছে। তাঁর কবিতা তাই ড্রয়িংরুমের শৌখিন বিলাসিতা নয়, এ হলো মিছিলে হাঁটা মানুষের প্রাণের স্পন্দন।

নজরুলের কবিসত্তার ভেতর এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততাও ছিল। তিনি জানতেন, তাঁর এই ডাক হয়তো সবাই শুনবে না, হয়তো সমাজপতিরা তাঁকে একঘরে করে রাখবে। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসত না। তিনি ছিলেন সেই উদাসীন বাউল, যিনি একহাতে বাঁশি আর অন্যহাতে রণতূর্য নিয়ে বিশ্বচরাচরে আপন খেয়ালে ঘুরে বেড়ান। তাঁর 'সাম্যবাদী' কাব্যের প্রতিটি অক্ষর যেন এক একটি জ্যান্ত মানুষ। তারা কথা বলে, তারা কাঁদে, তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। এই প্রাণপ্রাচুর্যই নজরুলকে অমর করে রেখেছে। বাংলা সাহিত্যে অনেক বড় বড় কবি এসেছেন, যাঁদের শব্দচয়ন হয়তো নজরুলের চেয়ে অনেক বেশি মার্জিত বা বিদগ্ধ ছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন বোঝার ক্ষমতা নজরুলের মতো আর কারও ছিল না।

কাব্যগ্রন্থের শেষের দিকে নজরুলের আর্তি আরও বেশি করুণ ও গম্ভীর হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, সাম্য প্রতিষ্ঠা করা কেবল বাইরের যুদ্ধের বিষয় নয়, এটি এক পরম আত্মোপলব্ধির পথ। নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা আর ক্ষুদ্রতাকে জয় করতে না পারলে বাইরের জগতকে বদলানো সম্ভব নয়। তাই 'সাম্যবাদী' কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি একটি সাধনা। এই সাধনায় কোনো সন্ন্যাস নেই, বরং আছে জীবনের পূর্ণ আস্বাদ। নজরুল আমাদের শেখান যে, ধূলামাটির এই পৃথিবীতেই স্বর্গ গড়া সম্ভব যদি আমরা মানুষের চোখের জল মোছাতে শিখি।

নজরুলের সাম্যবাদ কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা মতাদর্শের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক চিরকালীন মানবিক আকুতি। এই কাব্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এক মহাজাগতিক একাত্মতার সুর। যখন তিনি বলেন, "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান," তখন সেখানে কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না, থাকে না কোনো জাতিগত ভেদাভেদ। এটি যেন এক বিশ্বজনীন প্রার্থনা। নজরুলের এই ভাবনায় আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই 'বিশ্বরূপ'-এর ছোঁয়া পাই, যেখানে ক্ষুদ্র আমিত্ব বিলীন হয়ে যায় এক বৃহত্তর সত্যের মাঝে। তবে নজরুলের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি এই দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন শোষিত মানুষের ঘাম আর রক্তের তেজ। তাঁর সাম্যবাদ আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো জ্যোতিষ্ক নয়, বরং মাটি খুঁড়ে বের হওয়া এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।

কাজী নজরুল ইসলামের 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থটি কেবল ইতিহাসের এক পাতায় আটকে থাকা পাণ্ডুলিপি নয়। এটি একটি চলমান চেতনা। যতদিন পৃথিবীতে একজন মানুষও ক্ষুধার্ত থাকবে, যতদিন কোনো নারী অপমানিত হবে, যতদিন ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করা হবে ততদিন নজরুলের এই পঙক্তিমালা আমাদের বিবেককে দংশন করবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, মানুষের হৃদয়ই হলো সব তীর্থের সেরা তীর্থ। সেই হৃদয়ের কন্দরে যদি একবার সাম্যের দীপ জ্বালানো যায়, তবে বাইরের অন্ধকার এমনিতেই ঘুচে যাবে। নজরুলের এই অজেয় স্বপ্নই আজ আমাদের পাথেয়। তাঁর কবিতা পাঠ করা মানে কেবল ছন্দ বা অলংকার উপভোগ করা নয়, বরং নিজের ভেতরের সেই প্রকৃত 'মানুষ'টিকে আবিষ্কার করা, যে সব সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বলতে পারে "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।"

লেখকের সেই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর অসীম মৈত্রী আজও যেন আমাদের কানের কাছে বাতাসের মতো ফিসফিস করে বলে যায় শুভ দিন আসছে। সেই শুভ দিনটি কোনো দৈব আশীর্বাদ নয়, বরং তা মানুষেরই সম্মিলিত চেষ্টার ফল। নজরুল সেই দিনের আগাম বারতা দিয়ে গেছেন তাঁর এই অমর কাব্যে। মৃত্তিকাস্নাত সেই সাম্যের গান আমাদের ধমনিতে রক্তপ্রবাহের মতো মিশে থাক, যাতে আমরা অন্তত একবার হলেও নির্ভয়ে বলতে পারি আমরা মানুষ, আমরা সবাই এক। হয়তো এই পরম সত্যটি অনুধাবন করতে পারার মধ্যেই নিহিত রয়েছে নজরুলের 'সাম্যবাদী'র প্রকৃত সার্থকতা। একটি খোলা চিন্তার ছায়া রেখে যায় এই কাব্য আমরা কি আসলেই মানুষের মতো মানুষ হতে পেরেছি? উত্তরটি হয়তো মহাকালের গর্ভে লুকানো, কিন্তু নজরুল যে প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছেন, তার শিখা কোনোদিন নিভবে না। এই প্রদীপই হোক আমাদের আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। নজরুল তাঁর এই আধ্যাত্মিক আর মানবিক দর্শনের মধ্য দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন যে, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য খুঁজে পাওয়াই জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য। তাই সাম্যবাদী কাব্য কেবল পাঠ নয়, এটি এক পরম আত্মোপলব্ধি। 

১২৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০