ধর্মীয় কর্তৃত্বের আড়ালে যৌন নির্যাতন: শিশুদের নিরাপত্তা ও শাস্তির হিসাব কোথায়?
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:০২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ধর্মীয় শিক্ষা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে শিশুদের ধর্ষণ, বলাৎকার, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত সংবাদ অনুসন্ধানে বিভিন্ন জেলার ঘটনা সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, জবাবদিহি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
নৈতিকতা ও পাপ-পুণ্যের প্রচারকদের একাংশের বিরুদ্ধেই উঠছে শিশু বলাৎকার, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রশ্ন তুলছে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে। সব অভিযোগ ধর্ষণের নয়; অনুচিত যৌন স্পর্শ ও নিপীড়নচেষ্টাও রয়েছে—যেগুলোকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত সংবাদ অনুসন্ধানের মধ্যে কুষ্টিয়াতেই ২০২৬ সালে চারটি পৃথক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভেড়ামারায় দশ বছরের মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের পর ১৬–১৭ মার্চের সংবাদে শিশুটির সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে থাকার কথা আসে। কুমারখালীতে দশ বছরের ছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানকে ২১ জুলাই আটক করা হয়।
দৌলতপুরের খলিশাকুন্ডিতে ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক আশিকুল্লাহকে ৮ অক্টোবর আটক করা হয়; অন্য সংবাদে একাধিক ছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। পাকুড়িয়ায় নয় বছরের ছাত্রীকে ১৪ অক্টোবর যৌন নিপীড়নচেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক সাঈদ হোসেন ওরফে নান্নুকে গ্রেপ্তারের পর ২১ অক্টোবর কারাগারে পাঠানো হয়।
ত্রিশালে ২০২৬ সালের ২০ ও ২২ জুন পৃথক শিশুধর্ষণের অভিযোগে দুই ইমাম আটক হন; ৩ জুলাই আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে অন্য ইমামের বিরুদ্ধে। গোপালগঞ্জে ২১ অক্টোবর স্কুলছাত্রকে নিজের থাকার স্থানে ডেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক ইমামকে পুলিশে দেওয়া হয়। সংবাদ প্রকাশের সময় লিখিত অভিযোগ হয়নি; পুলিশের ভাষ্যে, অভিযুক্ত অনৈতিক স্পর্শের কথা স্বীকার করলেও বলাৎকারচেষ্টা অস্বীকার করেন।
কুষ্টিয়ার খোকসায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা জামায়াত কর্মীর বিরুদ্ধে দলীয় সালিশে জুতাপেটা করে মীমাংসার অভিযোগ ২০ অক্টোবর ২০২৫ সমকালে প্রকাশিত হয়। মির্জাগঞ্জে তাবিজ দেওয়ার কথা বলে নারীকে ডেকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মাহাবুব ১৭ জুলাই ২০২৬ গ্রেপ্তার হন।
বদলগাছীতে নিজের কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে আক্কেলপুর উপজেলা জামায়াতের আমির শফিউল হাসানের বিরুদ্ধে; সংবাদ প্রকাশিত হয় ৪ আগস্ট ২০২৬। দলীয় পক্ষ উসকানি ও চাঁদাবাজির পাল্টা অভিযোগ তোলে। বেগমগঞ্জে ঝাড়ফুঁকের কথা বলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৯ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন আলমগীর হোসেন ফরাজী; স্থানীয় জামায়াত তাঁকে সাবেক দায়িত্বশীল বলেছে।
অনুসন্ধানের কার্যতালিকায় জামায়াতের বর্তমান বা সাবেক পরিচয় পাওয়া নয়জনের বিরুদ্ধে নয়টি পৃথক যৌন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে—এটি জাতীয় মোট নয়। নান্দাইলের অভিযোগ সংবাদে ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নচেষ্টা—দুইভাবে এসেছে। পঞ্চগড়ের অন্য অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় জামায়াত অস্বীকার করায় তাঁকে এই হিসাবে রাখা হয়নি।
পৃথকভাবে আলোচনায় রয়েছে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনা। জুলাইয়ের শেষ দিকে ঘনিষ্ঠ ভিডিও ছড়ানোর পর তিনি তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বলে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন, ১৭ জুন বিয়ে হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছরের মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। তাঁর বাবার আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড শেষে নজরুলকে ২৮ সেপ্টেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়; ১১ অক্টোবর জামিনও নাকচ হয়। এটি ধর্ষণের অভিযোগ নয়, তাই আগের নয়টির সঙ্গে যোগ করা হয়নি; মৃত্যুকে হত্যা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত বলা যাচ্ছে না।
অভিযোগগুলোতে কর্তৃত্বের অপব্যবহারের প্রশ্ন স্পষ্ট: শিক্ষাদান, আবাসিক তত্ত্বাবধান বা ধর্মীয় সেবার সুযোগে কাছে পৌঁছানো; পরে ভয়, সালিশ কিংবা ধামাচাপার অভিযোগ। গাজীপুরে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষকের পাশাপাশি ঘটনা চাপা দেওয়ার অভিযোগে পরিচালকও গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রতিষ্ঠান শিশুকে রক্ষা করছে, নাকি অভিযুক্তকে—প্রশ্নটি সেখানেই।
সাজার উদাহরণ হিসেবে নড়াইলে দশ বছরের ছাত্রকে বলাৎকারের দায়ে শিক্ষক মেরাজ আলীকে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মোট অভিযোগ, মামলা ও দণ্ডের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব উদ্ধার হয়নি। উন্নত দেশে অভিযোগ থেকে সাজার তথ্য মিলিয়ে দেখার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে; বাংলাদেশে পুলিশের কেন্দ্রীয় রেকর্ড থাকলেও সমমানের সহজলভ্য সমন্বিত হিসাব পাওয়া যায়নি। নৈতিকতার প্রচার কাউকে তদন্তের ঊর্ধ্বে রাখে না; শিশুর সুরক্ষা ও অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিই হতে হবে মাপকাঠি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
১২৪ বার পড়া হয়েছে