জাতিসংঘ দিবস: বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, প্রশ্নের মুখে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্বজুড়ে একের পর এক সংঘাত, প্রাণহানি ও মানবিক সংকটের মধ্যে আজ ২৪ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতিসংঘ দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছিল জাতিসংঘ। তবে প্রতিষ্ঠার আট দশকের বেশি সময় পেরিয়েও ইরানকে ঘিরে সংঘাত, গাজায় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ, ইউক্রেনের যুদ্ধ, ইয়েমেনের অস্থিরতা ও সুদানের মানবিক বিপর্যয় সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা, ভবিষ্যতে বড় ধরনের যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বিরোধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। এসব সংকট সমাধানে জাতিসংঘ কূটনৈতিক তৎপরতা, মানবিক সহায়তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চালিয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সাতটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার হুমকিও দিয়েছে ইরান।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অঞ্চলটিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো জাতিসংঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তবে কূটনৈতিক আহ্বান সত্ত্বেও সংঘাতের পক্ষগুলো সমঝোতায় না এলে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের কারণে গাজায় দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে। বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
জাতিসংঘ বারবার যুদ্ধবিরতি, ত্রাণ প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির বিভিন্ন শাখা যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করছে।
তবে এসব উদ্যোগের পরও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কমানো যাচ্ছে না। যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান থাকায় গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো অনিশ্চিত।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও সংঘাত থামেনি। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিয়েভে হতাহত ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার দিকে শত শত ড্রোন পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও যুদ্ধের অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া নিজেই এই যুদ্ধের একটি পক্ষ। ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের বিদ্যমান কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও আঞ্চলিক শান্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সৌদি আরব সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে।
১৫ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের এডেন শহরে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ এলাকায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও সৌদি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে।
এরপর ২১ অক্টোবর হুতিরা সৌদি আরবের মদিনার দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করে। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ওই অঞ্চলে ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল।
ইয়েমেনের সংকট শুধু স্থানীয় সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের বিষয়ও জড়িত। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ফলে সীমান্তপারের হামলা অনেকাংশে কমেছিল। সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেই অগ্রগতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘাত চলছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
২১ অক্টোবর জাতিসংঘ জানায়, সুদানের যুদ্ধ বন্ধ এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় জেনেভায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। তবে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো সীমিত।
সুদানে জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও ত্রাণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সংঘাতের পক্ষগুলো সমঝোতায় না এলে এবং বাইরে থেকে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত মোকাবিলায় জাতিসংঘের অন্যতম বড় বাধা নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা। পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
কোনো স্থায়ী সদস্য ভেটো প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে না। ফলে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে নিরাপত্তা পরিষদ অনেক সময় ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়। যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগও তখন রাজনৈতিক বিরোধে আটকে যায়।
তবে সব সংকটের দায় শুধু জাতিসংঘের ওপর চাপানো যায় না। সংস্থাটির কার্যক্রম অনেকাংশে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধরত পক্ষগুলো আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানালে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করলে কিংবা প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ বন্ধে সব সময় সফল না হলেও আন্তর্জাতিক কূটনীতি, শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতকবলিত অঞ্চলে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় পৌঁছে দেওয়া এবং শরণার্থীদের সহায়তা করার ক্ষেত্রেও সংস্থাটির বিভিন্ন শাখা কাজ করে যাচ্ছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় শুধু বিবৃতি ও আহ্বাপ যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা বাড়ানো, ভেটো ব্যবস্থার সংস্কারে অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা এবং সংঘাতের পক্ষগুলোর সমঝোতার সদিচ্ছাও জরুরি।
জাতিসংঘ দিবসে তাই বিশ্ববাসীর সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলো কতটা আন্তরিক। বিশ্বশান্তি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত অঙ্গীকার ও দায়িত্বের বিষয়। সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ না পেলে যুদ্ধের অবসান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন কঠিনই থেকে যাবে।
১০৯ বার পড়া হয়েছে