সর্বশেষ

সারাদেশ

বেতাগীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার চাঁদা নেয়ার ভিডিও ভাইরাল

জয়দেব রায়, বরগুনা
জয়দেব রায়, বরগুনা

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বরগুনার বেতাগীতে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অবৈধ টোল আদায়, সরকারি জমি দখল, হুমকি-ধমকি ও দলীয় পদ ব্যবহার করে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে তাঁর চাঁদা দাবির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার ধারণ করা ভিডিওটি রোববার রাতে ভাইরাল হয় বলে জানা গেছে।

৫ আগস্টের পর থেকে নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী, বিএনপির নেতা-কর্মী ও বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, তিনি দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে টোল আদায়, সরকারি জমি দখল করে ঘর নির্মাণ, হুমকি-ধমকি এবং মামলা ও কমিটি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

সর্বশেষ অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে নেছার উদ্দিন খানের বক্তব্যের একটি অংশে ‘আজকে যা পারো দিয়ে দেও’—এমন কথা শোনা যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর জবাবে একজনকে ‘টাকা নাই, টাকা নাই’ বলতে শোনা যায়। তবে ভিডিওটির পুরো বক্তব্য স্পষ্ট নয়। বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভিডিওটি তাঁর নজরে আসেনি এবং এ বিষয়ে এখনো কেউ অভিযোগ করেননি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।

এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বেতাগী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মানববন্ধন করা হয়। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ইজারাদারদের আয়োজনে ওই কর্মসূচিতে তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় পদ ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়।

মামলার সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ মার্চ বেতাগী পৌর টেম্পুস্ট্যান্ডের তালিকাভুক্ত ইজারাদার ও বাসস্ট্যান্ডের তৌহিদ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলাদারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেছার উদ্দিন খান তাঁর লোকজন নিয়ে গিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়। চাঁদা না দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৪ এপ্রিল বেতাগী বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন সড়কে ইজারাদারের নামে তৈরি করা রসিদ ব্যবহার করে যানবাহন থেকে অবৈধভাবে টোল আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ইজারাদার খোকন হাওলাদার বেতাগী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। পরে টোল আদায় বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা অব্যাহত রাখার অভিযোগে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করা হয়। মামলায় নেছার উদ্দিন খানকে প্রধান আসামি করা হয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই মামলায় নেছার উদ্দিন খানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলায় নেছার উদ্দিন খানকে প্রধান আসামি করা হয় এবং অন্য আসামিদের মধ্যে পৌর যুবদল ও বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম ছিল। মামলাটি দ্রুত বিচার আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় করা হয়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল সচেতন নাগরিকদের ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। এতে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন বিশ্বাস, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আলম স্বপন, উপজেলা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইউনূস সিকদার এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সোবাহান উপস্থিত ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. বজলুর রহমান নেছার উদ্দিন খানের দখলদারিত্ব ও হুমকির অভিযোগে থানায় ১০টি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে দাবি করেছেন।

দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন—তা জানতে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বরগুনা জেলা কার্যালয়ে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে বলা হলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে পৌরসভাসহ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা অভিযোগ করেছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি দেওয়ার নামে নেছার উদ্দিন খান অর্থ নিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক দাবি করেন, কমিটি আনার জন্য তাঁকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামেও জোর করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক ইউনিয়নের নেতারা।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এলাকার কিছু বিত্তশালী হিন্দু পরিবারকে লক্ষ্য করে নেছার উদ্দিন খান বিভিন্ন কৌশলে চাঁদা দাবি করতেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের হয়রানি করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য যাচাই করা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, নেছার উদ্দিন খান নিয়মিত চাঁদা দাবি করেন বলে তাঁর অভিযোগ। চাঁদা না দিলে ব্যবসা পরিচালনায় নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ড আড়াল করতে নেছার উদ্দিন খান ‘বেতাগী উপজেলা প্রেসক্লাব’সহ কয়েকটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এসব সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

বেতাগী পৌর টেম্পুস্ট্যান্ডের তালিকাভুক্ত ইজারাদার ও তৌহিদ স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. খোকন হাওলাদার বলেন, ৫ আগস্টের পর নেছার উদ্দিন খান বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করছেন বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর দাবি, নেছার উদ্দিন খানের ভয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করতে পারছেন না।

বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতার অভিযোগ, দলের নাম ব্যবহার করে নেছার উদ্দিন খান চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তাঁরা দলের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র শাহজাহান কবির বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তার দায়ভার দল নেবে না। দলীয় পরিপন্থী কোনো কাজ হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে নেছার উদ্দিন খান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। ২০২৫ সালের চাঁদাবাজির মামলার সময়ও তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি বৈধ ইজারার অংশীদার এবং নিয়ম মেনে টোল আদায় করেছেন।

বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুন অর বশিদ হাওলাদার বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় নেছার উদ্দিন খানের চাঁদা দাবির ভিডিও ভাইরালের বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি। এ বিষয়ে এখনো কেউ অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন বলেন, নেছার উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির বিষয়ে তাঁর কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে মৌখিকভাবে অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির ভিডিও ভাইরালের বিষয়টিও তাঁর নজরে আসেনি বলে জানান তিনি।

১৯৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০