সুখিয়া পাহাড়ে মাতামুহুরীর মায়া
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পাহাড়, অরণ্য আর নদীর অপূর্ব মেলবন্ধনের নাম লামা। বান্দরবানের এই পাহাড়ি জনপদে সুখিয়া পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, জুমঘর, সবুজ অরণ্য আর মাতামুহুরী নদীর নান্দনিক দৃশ্য যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে মুগ্ধ করতে পারে। ট্র্যাকিং, নির্জন পাহাড়ে রাতযাপন কিংবা নদীর পাড়ে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে লামা হতে পারে ভিন্নধর্মী ভ্রমণের একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
লামা’ নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা এক শান্ত জনপদের ছবি। এখানে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জুমঘর, দূরে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদী, পাখির ডাক আর ঝিঁঝির শব্দ মিলে তৈরি করে আলাদা এক পরিবেশ। মে মাসের শেষ দিকে লামায় গিয়ে এমনই এক প্রকৃতিনির্ভর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
লামার সুখিয়া পাহাড়ে ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা অন্য রকম। পাকা সড়কের বদলে এখানে রয়েছে মেঠোপথ। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সেই পথ কখনো অরণ্যের ভেতর ঢুকে যায়, আবার কখনো উন্মুক্ত হয়ে সামনে তুলে ধরে পাহাড় ও নদীর দৃশ্য। পথে দেখা মেলে জুমঘর ও কটেজের। স্থানীয়ভাবে এসব জায়গায় পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়।
সুখিয়া ও দুখিয়া—এই দুই পাহাড়কে ঘিরে লামার পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি। পাহাড়ের বিভিন্ন ভাঁজ ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এখানকার জনপদ। আর এই পুরো অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে মাতামুহুরী নদী। নদীকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাও লামার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লামায় শুধু সুখিয়া পাহাড় নয়, রয়েছে আরও নানা আকর্ষণ। মিরিঞ্জা, মারাইংছা হিল, সুখিয়া ভ্যালি, রিভার হিল, বিলছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নুনারঝিরি, আইম্যারা ঝিরি ও নকশাঝিরির মতো জায়গা প্রকৃতিপ্রেমীদের টানে। রয়েছে অসংখ্য ঝরনা, পাহাড়ি পথ, মাতামুহুরী নদী ও লামা খালে নৌভ্রমণের সুযোগ। দুখিয়া-সুখিয়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ে ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতাও আলাদা।
লামার পথে
গত ২০ মে ঢাকা থেকে লামার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে শ্যামলী ও হানিফ পরিবহনের বাসে সরাসরি আলীকদম হয়ে লামা যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কক্সবাজারগামী বাসে গিয়ে চকোরিয়ায় নেমেছিলাম।
ভোরে চকোরিয়া থেকে স্থানীয় বাসে লামার পথে রওনা দিই। পাহাড়ের সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখার জন্য ধীরগতির লোকাল বাসকেই বেছে নেওয়া হয়। লামা পর্যন্ত ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। মাতামুহুরী বাস সার্ভিসের বাসটি পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। দুই পাশে পাহাড়ের খাঁজে সবুজের সমারোহ। কখনো রাস্তার এক পাশে গভীর খাদ, আবার কখনো পাহাড়ের ঢাল—সব মিলিয়ে যাত্রাপথেও ছিল রোমাঞ্চ।
প্রায় এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে লামা বাস টার্মিনালে পৌঁছাই। কিছু সময় লামা শহরে ঘোরাঘুরি করে যাই মাতামুহুরী নদীর খেয়াঘাটে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী আর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু পাহাড়ের দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয়। শহর পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই ব্রিজ। সেখান থেকে দুই দিকে নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ এবং চারপাশের পাহাড়-অরণ্য চোখে পড়ে। এর পরেই শুরু হয় সুখিয়া পাহাড়ের পথ।
পাহাড়ের পথে ট্র্যাকিং
পাহাড়ে একা ট্র্যাকিং করার অভিজ্ঞতা সবার জন্য স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। দলবদ্ধভাবে গেলে যেমন নিরাপত্তার দিকটি সহজ হয়, তেমনি জুমঘর বা কটেজে থাকা-খাওয়ার খরচও ভাগ করে নেওয়া যায়।
সুখিয়া ভ্যালির দিকে যেতে পথে পড়বে একাধিক জুমঘর, কটেজ ও পাহাড়ি উপত্যকা। পাহাড়ের অনেক বাঁক থেকেই দেখা যায় মাতামুহুরী নদী। কখনো নদীটি দূরে সরু ফিতার মতো, আবার কখনো পাহাড়ের নিচে প্রশস্ত হয়ে চোখে পড়ে। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা রঙিন জুমঘরগুলোও দৃশ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
রিভারভিউ রিসোর্টের কাছাকাছি এসে মাতামুহুরী নদীর একটি বিশেষ দৃশ্য চোখে পড়ে। ওপর থেকে তাকালে নদীর গতিপথ অনেকটা ‘ইউ’ আকৃতির মনে হয়। রিসোর্টের চারপাশের পাহাড়, নদী ও সবুজ অরণ্য মিলে তৈরি করে দারুণ একটি দৃশ্যপট। আরও ওপরে সুখিয়া ভ্যালির দিক থেকে এই দৃশ্য আরও বিস্তৃতভাবে দেখা যায়।
পাহাড়ে বৃষ্টির অভিজ্ঞতা
পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মাঝপথে একটি চায়ের দোকানে কিছুক্ষণ বসি। চারপাশে বেশির ভাগই সেগুনগাছ। অরণ্যের ভেতর পাখি ও পোকামাকড়ের শব্দ নীরবতাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছিল। আশপাশে কয়েকটি কটেজ ও জুমঘরও রয়েছে।
এরই মধ্যে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। হালকা ঝড়ের পর শুরু হয় বৃষ্টি। পাহাড়ের অরণ্যে বসে বৃষ্টি দেখার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সামনে তাকালে দেখা যায় সবুজ পাহাড়, দূরে মাতামুহুরী নদী আর চারপাশে বৃষ্টিভেজা অরণ্য।
মে মাসের গরমের মধ্যেও পাহাড়ি পরিবেশে তখন বেশ আরামদায়ক আবহাওয়া ছিল। পর্যটকের ভিড়ও ছিল কম। সরকারি ছুটির দিন না হওয়া এবং দুর্গম পথের কারণে পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল বলে মনে হয়েছে।
বৃষ্টির পর পাহাড়ি মাটির পথ আরও পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। ফলে ট্র্যাকিংয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার শুরু হয় পাহাড়ের ওপরের দিকে যাত্রা। উঁচু-নিচু ও ভঙ্গুর পথ, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে জুমঘর আর ঘন অরণ্য পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে হয়।
সুখিয়া ভ্যালিতে
পাহাড়ের পথ ধরে এগোতে এগোতে দেখা মেলে ছোট ছোট জুমঘরের। নির্জন পথ পেরিয়ে একটি চায়ের দোকানে আবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয়। এরপর সামনে আসে রিভারভিউ রিসোর্ট। এখান থেকে মাতামুহুরী নদীর দৃশ্য বিশেষভাবে মনকাড়া। রিসোর্টে রয়েছে কয়েকটি কটেজ ও বসার ব্যবস্থা। কটেজের বারান্দা থেকেও পাহাড়, নদী, সবুজ আর আকাশ একসঙ্গে দেখা যায়।
আরও কিছুটা পথ ট্র্যাকিং করার পর পৌঁছানো যায় সুখিয়া ভ্যালিতে। পাহাড়ের ওপরের এই জায়গাটি চারপাশের প্রকৃতিকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ দেয়। নির্জন পরিবেশ, সবুজ পাহাড় এবং দূরে বয়ে চলা নদী মিলিয়ে এখানে কিছুটা সময় কাটানোই হয়ে ওঠে ভ্রমণের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।
পাহাড়ের বিভিন্ন ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা জুমঘরগুলোও সুখিয়া পাহাড়ের সৌন্দর্যের বড় অংশ। কোনো কোনো জুমঘরের বারান্দা থেকে সরাসরি দেখা যায় নদী ও পাহাড়। কোলাহল থেকে দূরে এমন পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।
জুমঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড় ও নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, ব্যস্ত জীবনের বাইরে প্রকৃতির কাছে কিছু সময় থেমে থাকা দরকার। চারপাশের নীরবতা, অরণ্যের শব্দ আর পাহাড়ি বাতাস ভ্রমণকে অন্য রকম অনুভূতি দেয়।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে চকোরিয়া নেমে স্থানীয় বাসে লামা যাওয়া যায়। লামা পর্যন্ত বাসভাড়া ৭০ টাকা এবং আলীকদম যেতে ভাড়া ১০০ টাকা। জিপেও যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা থেকে শ্যামলী ও হানিফ পরিবহনের বাসে আলীকদম হয়ে লামা যাওয়া যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা।
লামা পার্বত্য এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট রয়েছে। এসব চেকপোস্ট বা আবাসিক হোটেলে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি প্রয়োজন হতে পারে। ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা ভালো।
থাকা ও খাওয়া
লামা ও চকোরিয়ায় আবাসিক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ের ভেতরে জুমঘর ও কটেজেও থাকার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে দুর্গম পাহাড়ে রাতযাপনের ক্ষেত্রে আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা ও স্থানীয় গাইডের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া নিরাপদ।
লামায় আবাসিক হোটেলে সাধারণত ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। খাবারের জন্য লামা বাজারে বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত খাবারের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্ট, নিউ মেহমান, আরামবাগ, পানবাজার গলির হোটেল আমিরাবাদ, নদীর ঘাটের হোটেল আল-বারাকা এবং বাস টার্মিনালের ভাতঘর।
পাহাড়, অরণ্য আর নদীর সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে লামার সুখিয়া পাহাড় হতে পারে ভিন্নধর্মী একটি গন্তব্য। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, পথের অবস্থা, স্থানীয় নির্দেশনা এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
১২৯ বার পড়া হয়েছে