সর্বশেষ

সাহিত্য

নজরুলের কবিতার মেটামরফোসিস : নজরুল-মানসের এক চিরন্তন অভিসার

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:০১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলা সাহিত্যের আকাশে কোনো এক ধূমকেতুর মতো তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল—সে কথা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই ধূমকেতুটি যখন শান্ত হয়ে এক নিস্তরঙ্গ মহাসাগরে গিয়ে মিশল, সেই রূপান্তরের খবরটি কি আমরা ঠিকঠাক অনুধাবন করতে পেরেছি? কাজী নজরুল ইসলাম কেবল এক অস্থির যৌবনের নাম নয়, তিনি আসলে এক সুগভীর আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক যাত্রার পথিক, যা শুরু হয়েছিল রণতুর্যের হুঙ্কারে আর শেষ হয়েছিল এক অব্যক্ত মৌনতায়। তাঁর এই জীবন-ভ্রমণকে নিছক কাব্য-বিবর্তন বললে হয়তো ভুল হবে; এটি ছিল একটি আত্মার ক্রমাগত নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার এক আশ্চর্য ইতিহাস।
গাউসুর রহমান

নজরুলের শৈশবের কথা ভাবলে চোখে ভেসে ওঠে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের সেই লাল ধুলোর রাস্তা। যে মাটির গন্ধে মিশে আছে অভাব আর অদম্য প্রাণশক্তি। সেই ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন বাঁধনহারা। জীবন তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে, অথচ তিনি জীবনকেই আলিঙ্গন করেছিলেন এক অদ্ভুত সখ্যতায়। তাঁর এই আদি-পর্বটি ছিল লোকজ সুরের পাঠশালা। লেটো দলের সেই চটুল গান, পালাগানের আসর—যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম আর সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত, সেখানেই নজরুলের কবিসত্তার প্রথম ভ্রূণটি অঙ্কুরিত হয়েছিল।

সেই কিশোর বয়সে তিনি কি জানতেন, তাঁর কলম একদিন আগ্নেয়গিরির লাভা উদগিরণ করবে? হয়তো জানতেন না। কিন্তু লেটো দলের সেই গ্রামীণ মঞ্চ তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের চোখের ভাষা পড়তে। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল কেবল মাটির টান। তাঁর পরবর্তী জীবনের যে ‘শব্দ-সাহস’, যেখানে তিনি অতি সাধারণ লোকজ শব্দকে আভিজাত্যের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল এই ধুলোবালির মধ্যেই। তাঁর সৃজনশীলতা ছিল প্রথাগত শিক্ষিত সমাজের ড্রয়িংরুম থেকে বহু দূরে, একেবারে সাধারণের উঠোনে। মাটির মানুষের সেই প্রাণখোলা হাসি আর কান্নার সুরই তাঁকে পরবর্তীকালের ‘জনগণের কবি’ হিসেবে গড়ে তুলেছিল।


তারপর এল সেই সময়, যখন পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধের দামামা। তরুণ নজরুল পা রাখলেন করাচির সেনানিবাসে। বাঙালি পল্টনের সেই সৈনিক জীবন তাঁর ভেতরে থাকা রোমান্টিক কবিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, যুদ্ধের বিভীষিকা তাঁকে কুঁকড়ে দেয়নি, বরং তাঁর ভেতরের বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। করাচির তপ্ত বালু আর সৈনিকের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মাঝে বসেই তিনি যেন ভারতবর্ষের পরাধীনতার শেকলটাকে আরও স্পষ্ট করে অনুভব করলেন।

১৯২২ সালের সেই অগ্নিবীণা—এ যেন কেবল এক কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং বাঙালির শতবর্ষের জমাটবদ্ধ কান্নার এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই পঙ্‌ক্তিগুলো যখন পাঠক প্রথম পড়ল, তারা কি শিউরে ওঠেনি?
"আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার, / নি:ক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!"

এখানে যে নজরুলকে আমরা দেখি, তিনি যেন মহাকালের এক রুদ্র অবতার। নিটশের ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানবের যে কল্পনা আমরা দর্শনের পাতায় পাই, নজরুল যেন নিজের রক্তমাংস দিয়ে সেই চরিত্রটিকেই জীবন্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু এই ধ্বংসের আহ্বান কি কেবল খুনের নেশায়? না, তা ছিল এক ‘সৃজনশীল ধ্বংস’। পুরনো জরাজীর্ণ সমাজকে ভেঙে গুঁড়িয়ে না দিলে নতুন শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করা সম্ভব নয়—এই ছিল তাঁর সেই সময়ের দর্শন। নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তা আসলে এক একক ব্যক্তিত্বের উত্থান, যা সমস্ত প্রথা, সংস্কার আর ভয়ের শাসনকে অস্বীকার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছিল।


বিদ্রোহের সেই অগ্নিকুণ্ড থেকে নজরুলের কাব্যযাত্রা যখন পরবর্তী ধাপে মোড় নিল, তখন আমরা পেলাম এক ভিন্ন নজরুলকে। ১৯২৫ সালের আশপাশে তাঁর চিন্তায় এক গভীর সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। তবে তাঁর এই সাম্যবাদ কোনো যান্ত্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না।

নজরুলের এই রাজনৈতিক মেটামরফোসিস আসলে তাঁর মানবিকতাবোধের এক চূড়ান্ত উত্তরণ। এই পর্যায়ে এসে তাঁর কাব্য হয়ে উঠল এক বিশাল মানবিক ইশতেহার, যা আজও অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে আছে।


কিন্তু যিনি তলোয়ার চালান, তিনি কি কেবলই কঠিন? নজরুলের ভেতরের সেই কোমল প্রাণটি কি হারিয়ে গিয়েছিল? না, বরং আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের পাশেই কখন যে এক সুরভি মাখা ঝরনাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল, তা পাঠক টেরই পায়নি। নজরুল যখন বাঁশরি হাতে নিলেন, তখন বাংলা সাহিত্য পেল এক অনন্য গীতিধর্মিতা। ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’ বা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর দিনগুলোতে কবি এক বিরহী প্রেমিকের বেশে আবির্ভূত হলেন।

অনেকে অবাক হয়ে ভাবেন, যে হাত দিয়ে তিনি ধ্বংসের গান লিখেছেন, সেই হাতেই আবার এমন করুণ গজল বা প্রেমের গান কীভাবে সম্ভব? আসলে এটি কোনো বিরোধ নয়, এটিই ছিল নজরুলের পূর্ণতা। প্রেম এবং বিদ্রোহ—এই দুটি ছিল তাঁর একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তাঁর প্রেমে ছিল পারস্যের সুবাস আর বাংলার নদীমাতৃক স্নিগ্ধতা। জীবনের অভাব আর ব্যক্তিগত বিষাদ তাঁকে এক গভীর নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যু তাঁর ভেতরের সেই অগ্নিগিরিকে কান্নায় ভিজিয়ে দিয়েছিল।

নজরুল নিজেই এক জায়গায় বলেছিলেন, তাঁর এক হাতে বাঁশি আর অন্য হাতে রণতূর্য। এই বৈপরীত্যই ছিল তাঁর জীবনের মূল সুর। তিনি যখন লিখছেন—
"মোর হাতে যদি থাকে বাঁশি, তোমার হাতে কেন কৃপাণ? / মোর মনে যদি থাকে প্রেম, তোমার মনে কেন পাষাণ?"

তখন মনে হয়, এই প্রশ্নটি তিনি যেন নিয়তির কাছেই রাখছেন। তাঁর রোমান্টিকতা ছিল কেবল রূপের উপাসনা নয়, বরং তা ছিল এক আধ্যাত্মিক হাহাকার। কিটসের মতো সৌন্দর্যকে তিনি ধ্রুব মেনেছিলেন, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনিঃশেষ বেদনা।

নজরুলের কাব্য-বিবর্তনের আলোচনায় তাঁর ভাষার বিবর্তনকে বাদ দিলে অনেকখানি অপূর্ণতা থেকে যায়। তিনি বাংলা কবিতাকে আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন ব্যাকরণ দিয়েছিলেন। তৎসম শব্দের সেই গাম্ভীর্যের ভেতরে তিনি যখন সাবলীলভাবে আরবি, ফার্সি আর তুর্কি শব্দ বসিয়ে দিলেন, তখন এক নতুন ‘নজরুলী’ ঘরানার জন্ম হলো। এটি কোনো সস্তা পরীক্ষা ছিল না, বরং তা ছিল এক বিশাল সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।

উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বোঝা যায়, নজরুল ভাষার সেই শৃঙ্খলটিকেও ভাঙতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, কবিতা কেবল অভিজাতদের সম্পত্তি নয়; এটি সেই মানুষেরও ভাষা, যারা ‘খুন’, ‘বদল’, ‘আজাদ’ শব্দগুলো প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহার করে। তাঁর ছন্দ ছিল যুদ্ধের বাদ্যের মতো—যা শুনলে রক্ত গরম হয়ে ওঠে। আবার তাঁর গজলগুলোতে সেই ছন্দই হয়ে উঠল মলয় বাতাসের মতো স্নিগ্ধ। এই ভাষিক বিবর্তন আসলে তাঁর চেতনারই এক প্রতিফলন—যেখানে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য, আর্য আর অনার্য এক মোহনায় এসে মিলেছে।

নজরুলের এই বিশাল বিবর্তনের পেছনে যে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি কাজ করেছে, তা ভাবলে আজও আমরা ব্যথিত হই। তাঁর জীবন ছিল আসলে এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। দারিদ্র্য তাঁর ছায়ার মতো সঙ্গী ছিল। বারবার কারাবরণ, আপনজনদের মৃত্যু এবং সবশেষে নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলা—এসবই কি তাঁকে এক গভীর অবসাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল? নাকি এই কষ্টের আগুনে পুড়েই তিনি খাঁটি সোনা হয়ে উঠেছিলেন?

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাটি ছিল তাঁর অবদমিত দুঃখের এক বহিঃপ্রকাশ। আর তাঁর শেষ জীবনের আধ্যাত্মিকতা ছিল সেই দুঃখ থেকে চিরমুক্তির এক পথ। তিনি এক আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে জ্বলতে শেষ পর্যন্ত এক অতলান্ত মহাসাগরে শীতল হতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই ট্র্যাজেডিই তাঁকে সাধারণ কোনো কবির ঊর্ধ্বে এক ‘মহাপ্রাণ’ মানুষে পরিণত করেছিল।

আজকের এই যান্ত্রিক সময়ে দাঁড়িয়ে নজরুলের এই মহাযাত্রা আমাদের কী শেখায়? তিনি কি কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি এক চরিত্র? মোটেও না। নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ মানুষের মুক্তি আজও সম্পূর্ণ হয়নি। যখনই কোনো সমাজে অন্যায় বা সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনই নজরুলের সেই অগ্নিবীণা বেজে ওঠে আমাদের চেতনায়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতেও নজরুল ছিলেন প্রধান প্রেরণা। তাঁর কবিতা ও গান কেবল শিল্প নয়, তা ছিল একটি জাতির বেঁচে থাকার রসদ। তাঁর বিবর্তিত সত্তাটি আসলে আমাদের জাতীয় সত্তারই এক প্রতিচ্ছবি।

কাজী নজরুল ইসলামের এই দীর্ঘ কাব্য-পরিক্রমা আমাদের এক শাশ্বত সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। জীবন স্থির কোনো পাথর নয়, জীবন হলো এক প্রবাহমান নদী। নজরুল সেই নদীর মতোই আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে কখনো রুদ্র রূপে পাহাড় ভেঙেছেন, আবার কখনো শান্ত হয়ে পলি জমিয়েছেন উর্বর সমতলে।

বিদ্রোহ থেকে সাম্যবাদ, সাম্যবাদ থেকে প্রেম এবং শেষ পর্যন্ত সেই পরম ঐক্যের সন্ধানে—এই ছিল নজরুলের মেটামরফোসিস। ধ্বংসের ভেতর দিয়ে সৃষ্টির যে বীজমন্ত্র তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়।

১৩০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০