সর্বশেষ

জাতীয়

বৈষম্যবিরোধী অঙ্গীকার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১:৫৯ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সেই সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উঠেছে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা (আনুমানিক ৯০ কোটি মার্কিন ডলার) পাচারের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিহীন প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে গড়ে তোলা এক ‘মেটিকুলাস’ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ লুণ্ঠন ও ডিজিটাল রুটে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্ত ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও ৪৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট সাম্রাজ্য: সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন।

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা অসম্ভব। এর উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, তার অধীনস্থ তিনটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের টাকা থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার প্রেক্ষাপট তার অনুকূলেই ছিল। কারণ ওই সময় আমলারা ছিলেন লাজুক অবস্থানে। জনপ্রতিনিধিদেরও উপস্থিতি ছিল না।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪২,৪৩৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে আওয়ামী সরকারের বাজেটের অবশিষ্ট অংশ যোগ করে মোট ছিল ৪৪,২৪৩ কোটি টাকা।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছিল ২,৪২৩ কোটি টাকা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪৩৮ কোটি টাকা সহ মোট বাজেট ছিল ৪৭,১০৪ কোটি টাকা। দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি অর্থব্যয়ের একক ক্ষমতা ভোগ করেছেন।

দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তারা জানান, আসিফের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের অঙ্ক ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে এই বিপুল পরিমাণ বাজেট থেকে পরিকল্পিতভাবে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় ছিল না।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুরো দুর্নীতি প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ("Meticulous Design") আওতায়।

রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ: স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ছিল না।

আমলাতান্ত্রিক ভয় ও একক নিয়ন্ত্রণ: তৎকালীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা ও আমলারা তটস্থ ছিলেন। এই প্রশাসনিক ভীতিকে কাজে লাগিয়ে আসিফ মাহমুদ নিজের পছন্দের কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে একটি নিজস্ব ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন।

বেনামি টেন্ডার ও ভুয়া প্রকল্প: বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি ও শ্রম কল্যাণের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি এই সিন্ডিকেটের হাতে নেওয়া হয়।

আধুনিক ক্রিপ্টো-পাচার: যেভাবে ডিজিটাল রুটে বিদেশে গেল ৯০ কোটি ডলার

সম্প্রতি অভিযোগ ওঠার পর সজীব ভূঁইয়ার সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দাবি করেন—একটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে পাচারের নতুন ও আধুনিক কৌশলের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

প্রথাগত হুন্ডির বাইরে ব্লকচেইন: সরাসরি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বা প্রথাগত হুন্ডি চ্যানেলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সির (Crypto Currency) মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়েছে।

‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ চক্রের ভূমিকা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থ ও প্রযুক্তি খাতে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু বিতর্কিত ‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ এই পাচার প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করেন।

পাসওয়ার্ডভিত্তিক ওয়ালেট: দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে উত্তোলিত কমিশন ও আত্মসাতের টাকা বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তর করে শেষ পর্যন্ত পাসওয়ার্ডভিত্তিক নিরাপদ ‘ক্রিপ্টো ওয়ালেটে’ রূপান্তর করা হয় এবং বিদেশে পাচার সম্পন্ন হয়।

নির্বাচিত সরকারের আমলেও আড়ালের চেষ্টা ও দুদকের তৎপরতা: অভ্যুত্থানের প্রধান স্লোগান ছিল দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থানের পেছনের রূপকার বলে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এই ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সাবেক এই উপদেষ্টাকে ঘিরে তোলপাড় থামেনি। আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে এখনো এই চক্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী সদস্য সরব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

ফাইল ও নথিপত্র জব্দ: আসিফ মাহমুদের দেড় বছরের মেয়াদে গ্রহণ করা সমস্ত মেগা প্রকল্প, দরপত্র নথি, ই-জিপি ফাইল এবং বিশেষ বরাদ্দ সংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করছে দুদক।

ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত: অর্থ হস্তান্তরের রুট শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট যৌথভাবে ডিজিটাল ট্রানজেকশন ট্র্যাকিং শুরু করেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ডিজিটাল অর্থ হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট রুট এবং ফাইলপত্রের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষ হলেই দেশের এই ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির বিশদ চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট আকারে আদালতে দাখিল করা হবে।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০