সর্বশেষ

মতামত

গালির বন্যায় সামাজিক মাধ্যম: রাজনৈতিক বিষাক্ততা, বট বাহিনী ও আইনের

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৩৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ভাষা আরও তীব্র, আক্রমণাত্মক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফেসবুকের পোস্ট, লাইভ ভিডিও, রিলস ও ইউটিউবের মন্তব্যঘরে এখন নীতিগত বিতর্কের পাশাপাশি দেখা যায় গালাগাল, চরিত্রহনন, পরিবারকে টেনে অপমান, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা এবং শারীরিক ক্ষতির হুমকি। কোনো নাগরিক বিদ্যুৎ বিল, দ্রব্যমূল্য, রাস্তা, দুর্নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেক ক্ষেত্রে যুক্তির বদলে তার দিকে ধেয়ে আসে শত শত বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য।

এ পরিস্থিতির একটি বড় উদ্বেগ হলো সংঘবদ্ধ অনলাইন আক্রমণের অভিযোগ। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পেজ, সমর্থকগোষ্ঠী এবং সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে একই ধরনের গালি, ব্যঙ্গ, অপবাদ বা “হাহা” প্রতিক্রিয়া ছড়ালে সেটি স্বাভাবিক মতবিনিময়কে বাধাগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পোস্টে ভুয়া “হাহা” প্রতিক্রিয়া দিয়ে দৃশ্যমানতা কমানো এবং কৃত্রিম জনমত তৈরিতে কেনা যায় এমন বট প্রোফাইল ব্যবহারের অভিযোগ নিয়েও অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে।

তবে প্রমাণ ছাড়া সব সমালোচককে বট বলা যেমন ভুল, তেমনি সব গালিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ বলা আরও বিপজ্জনক। একাধিক নতুন বা নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট থেকে একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি, একই সময়ে হঠাৎ বিপুল মন্তব্য, পরিচয়হীন প্রোফাইল এবং সমন্বিত রাজনৈতিক হ্যাশট্যাগ—এসব সন্দেহের কারণ হতে পারে; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ডিজিটাল ফরেনসিক যাচাই প্রয়োজন।

বাংলা গালির বড় অংশ ব্যক্তি নয়, তার পরিবার, মা-বোন, স্ত্রী, সন্তান, শরীর বা যৌনতাকে লক্ষ্য করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে নারীর শরীর ও তথাকথিত পারিবারিক সম্মানকে অস্ত্র বানানো হয়। এতে গালি শুধু অশালীন ভাষা থাকে না; তা নারীবিদ্বেষী অনলাইন সহিংসতায় পরিণত হয়। আবার ধর্মীয় পরিচয়, আঞ্চলিক পরিচয়, পেশা বা সামাজিক শ্রেণিকে অপমানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করলে তা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক, বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার ক্ষেত্রে আইন দ্বারা যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতা আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে। তাই সরকার, মন্ত্রী, দল বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা নাগরিক অধিকার হতে পারে; কিন্তু ব্যক্তির বিরুদ্ধে যাচাইহীন অপরাধের অভিযোগ, যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি বা সহিংসতার হুমকি আলাদা আইনি প্রশ্ন তৈরি করে।

এখানে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারার পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। ৪৯৯ ধারা কোনো শাস্তির ধারা নয়; এটি মানহানির সংজ্ঞা ও অপরাধের উপাদান নির্ধারণ করে। কথায়, লেখায়, চিহ্নে বা দৃশ্যমান উপস্থাপনায় কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন অপবাদ প্রকাশ, যা তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বা যাতে সুনামহানি ঘটবে—এ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও করা হয়েছে, তা এই ধারার আওতায় মানহানি হতে পারে।

৪৯৯ ধারায় কয়েকটি ব্যতিক্রমও আছে। জনস্বার্থে সত্য তথ্য প্রকাশ, সরকারি কর্মচারীর জনসম্পর্কিত কাজ নিয়ে সদুদ্দেশ্যে মতামত, এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যায্য মন্তব্য নির্দিষ্ট শর্তে মানহানি নাও হতে পারে। ফলে “মন্ত্রী জবাব দিন” বা “এই নীতিতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত”—এ ধরনের নীতিগত সমালোচনা এবং প্রমাণ ছাড়া “তিনি চোর” বা “তিনি অপরাধী”—এ ধরনের ব্যক্তিগত অপবাদ একভাবে বিবেচিত হবে না।

৫০০ ধারা হলো ৪৯৯ ধারায় সংজ্ঞায়িত মানহানির অপরাধ প্রমাণিত হলে তার শাস্তির বিধান। এর অধীনে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অর্থাৎ ৪৯৯ ধারা আগে নির্ধারণ করে বক্তব্যটি আইনগত অর্থে মানহানিকর কি না; সেই অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হলে ৫০০ ধারার শাস্তির প্রশ্ন আসে। দুটি ধারা একই নয়, বরং পরস্পর-সম্পর্কিত।
একই অধ্যায়ে ৫০১ ধারায় জেনেশুনে মানহানিকর বিষয়বস্তু ছাপা বা খোদাই করে প্রকাশের প্রশ্ন এবং ৫০২ ধারায় জেনেশুনে এমন মানহানিকর মুদ্রিত বস্তু বিক্রি বা বিক্রির উদ্দেশ্যে বিতরণের বিষয়টি রয়েছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে শুধু মূল পোস্টদাতা নয়, কোনো কনটেন্ট জেনেশুনে পুনঃপ্রচারকারী ব্যক্তির ভূমিকাও ক্ষেত্রবিশেষে আইনি আলোচনায় আসতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বক্তব্যের ভাষা, প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, সত্যতা, জনস্বার্থ এবং ক্ষতির প্রশ্ন প্রমাণের বিষয়।

অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়ানো, ব্ল্যাকমেইল, অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি বা ছড়ানোর হুমকি আরও গুরুতর ডিজিটাল অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। সরকারি আইনভান্ডার অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ পরে ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন দ্বারা রহিত হয়েছে। বর্তমান সাইবার আইনি কাঠামোয় যৌন হয়রানি, সম্মতি ছাড়া কনটেন্ট প্রচার, ব্ল্যাকমেইল ও ডিজিটাল অশ্লীলতাকে অপরাধ হিসেবে দেখার বিধান রয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে গালির বিরুদ্ধে প্রতিকার মানে রাজনৈতিক সমালোচনা বন্ধ করা নয়। প্রয়োজন হলো—ব্যক্তিগত অপমান, মিথ্যা অপবাদ, যৌন হয়রানি ও বাস্তব সহিংসতার হুমকির বিরুদ্ধে সমান আইন প্রয়োগ; আর নীতিগত সমালোচনা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে নাগরিকের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করা। গালিবাজিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো বন্ধ না হলে কমেন্টবক্সের বিষাক্ততা একসময় জনপরিসরের স্বাভাবিক ভাষা হয়ে যাবে।


লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

১৩৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন