ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: প্রণোদনা ছাড়া জনগণের ঘাড়ে বিনিয়োগের বোঝা কেন?
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬:৩৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সরকারের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগের লক্ষ্য প্রশংসনীয়—জ্বালানি আমদানি কমানো, বিদ্যুৎ-ঘাটতি মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো। কিন্তু ঘোষিত কাঠামোয় বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগের ভার সরাসরি ভোক্তার ওপর দিয়ে কেবল উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ কিনে নেওয়ার প্রস্তাব সাধারণ মানুষের জন্য লাভজনক কি না, তা নিয়ে বাস্তব ও ন্যায্য প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার বলেছে, বাংলাদেশে রুফটপ সোলারের জন্য সরকার এখন একটি ফলাফলভিত্তিক আর্থিক প্রণোদনা চালু করেছে। ব্যাটারিসহ যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে গ্রাহক প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। এ সুবিধা পেতে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে সিস্টেম স্থাপন করতে হবে; প্রণোদনার নির্ধারিত মেয়াদ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত।
তবে এটি প্ল্যান্ট বসানোর আগের মূলধনী ভর্তুকি নয়। প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, নেট-মিটার ও স্থাপনার বড় অঙ্কের খরচ আগে গ্রাহককেই বহন করতে হবে। সরকার পরে গ্রিডে দেওয়া উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের বিপরীতে অর্থ দেবে। ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকায় অনুমোদিত লোডের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সোলার স্থাপন, এক-ফেজ গ্রাহকের অংশগ্রহণ এবং ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে অর্থ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো: এই হিসাব কি পরিবারের প্রকৃত মূলধন ব্যয়, ব্যাটারির আয়ু ও প্রতিস্থাপন খরচকে যথেষ্টভাবে ধরেছে? একটি মাঝারি পরিবারের নিজস্ব ব্যবহার ও উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত বিক্রির জন্য ৫–১০ কিলোওয়াট সৌরব্যবস্থা, ইনভার্টার, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নেট-মিটার, স্থাপনা ব্যয় এবং—নীতি অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে—ব্যাটারিতে কয়েক লাখ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ লাগতে পারে। তিন বছরের সীমিত প্রিমিয়াম আয়ে এত বড় মূলধন দ্রুত ফেরত আসার নিশ্চয়তা নেই। ব্যাটারি বদল, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থের সুদ বা মূল্যস্ফীতির খরচও থাকলে সাধারণ ভোক্তার লাভ আরও অনিশ্চিত হয়।
এখানে সরকারের জন্য বিকল্প পথ ছিল: শুধু “আপনি স্থাপন করুন, আমরা উদ্বৃত্ত কিনব”—এ মডেলের বদলে সরাসরি মূলধনী প্রণোদনা। উদাহরণ হিসেবে ভারত আবাসিক রুফটপ সোলারের জন্য PM-Surya Ghar কর্মসূচিতে প্রথম ২ কিলোওয়াটে প্রতি কিলোওয়াট ৩০ হাজার রুপি, তৃতীয় কিলোওয়াটের জন্য ১৮ হাজার রুপি দেয়; ৩ কিলোওয়াট বা তার বেশি ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সহায়তা ৭৮ হাজার রুপি। অনুমোদিত বিক্রেতা, বিতরণ কোম্পানির যাচাই, নেট-মিটার ও কমিশনিংয়ের পর ভর্তুকি সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার ডিজিটাল প্রক্রিয়াও আছে।[pmsuryaghar +3]
বাংলাদেশেও ধাপভিত্তিক সহায়তা বিবেচনা করা যেতে পারে: ৩ কিলোওয়াটে ১০ শতাংশ, ৫ কিলোওয়াটে ২০ শতাংশ এবং ১০ কিলোওয়াটে ৩০ শতাংশ মূলধনী অনুদান—তবে এটি কেবল যাচাইকৃত মানসম্পন্ন যন্ত্র, লাইসেন্সধারী স্থাপনাকারী এবং কার্যকর নেট-মিটার সংযোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মাননিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত বক্তব্যের সঙ্গে এই শর্তটি সামঞ্জস্যপূর্ণ: নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার বা ব্যাটারি ঠেকাতে বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশন, ওয়ারেন্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী প্রয়োজন। তবে ওই বক্তব্যের সংসদীয় রেকর্ড বা নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রতিলিপি এই পর্যায়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি; প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তা সংসদ সচিবালয় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যাচাই জরুরি।
প্রণোদনা সরাসরি দেওয়ার অর্থ শুধু অনুদান নয়; সরকার চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য থেকে ধাপে ধাপে তার অংশ সমন্বয় করতে পারে। সঙ্গে কমসুদের ঋণ, একক অনলাইন আবেদন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নেট-মিটার অনুমোদন এবং কাস্টমস-এ সোলার যন্ত্রাংশের স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস জরুরি। বিদ্যুৎ বিভাগের ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নির্দেশিকা থাকলেও মাঠপর্যায়ে অনুমোদন বিলম্ব, বিতরণ কোম্পানির সক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে নীতি কাগজেই সীমিত থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ছাদে হাজার হাজার সৌরব্যবস্থা যুক্ত করার আগে বিতরণ লাইন, ট্রান্সফরমার, স্মার্ট মিটারিং ও রিভার্স পাওয়ার ফ্লো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা প্রকাশ করা দরকার। নইলে ভালো উদ্দেশ্যের একটি কর্মসূচি মধ্যবিত্তের জন্য লোকসানি বিনিয়োগ এবং সরকারের জন্য পরবর্তী সময়ে নতুন আর্থিক ও গ্রিড-সংকট তৈরি করতে পারে। সরকারের উচিত এখনই বাস্তব ব্যয়ভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন করে ন্যায্য প্রণোদনা, মাননিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কাঠামো ঘোষণা করা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২০ বার পড়া হয়েছে