ঠাকুরগাঁওয়ে সংঘাত নয়, সহিষ্ণুতার রাজনীতি চান রাষ্ট্রপতি
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:৩৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বা সংঘর্ষ চান না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, সব রাজনৈতিক দল নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করবে, রাজনীতি করবে; তবে কোনোভাবেই সংঘাতে জড়ানো যাবে না। গণতন্ত্র রক্ষায় সহিষ্ণুতা, আলোচনা ও সমঝোতার রাজনীতির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ শান্তিপ্রিয়। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির আয়োজনে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো সংঘাত, কোনো সংঘর্ষ চাই না। আমরা সব রাজনৈতিক দলকে বলব, আপনারা নিজেদের রাজনীতি করবেন, মতবাদ প্রচার করবেন, কিন্তু কখনো সংঘাতে জড়াবেন না।’
তিনি বলেন, অতীতে ঠাকুরগাঁওয়ের গণতন্ত্রকামী মানুষদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শ্রমিক-কৃষকদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই সময় পার হয়ে দেশ এখন নতুন সুযোগের সামনে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা অনেক ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে আজ এখানে এসেছি। এ রকম মৃত্যু ও রক্তপাত আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা যে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি, সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে চাই।’
বাংলাদেশে সমঝোতার রাজনীতির প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবাই যেন একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন, এমন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। তাঁর ভাষায়, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সহিষ্ণুতা।
নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি নির্ধারণ ও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়েছে। জায়গা নির্ধারণের পর আগামী বছর থেকে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া ভূল্লী ও রুহিয়াকে পৃথক উপজেলা করার দাবিও বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে ইউএনও যোগ দিয়েছেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বিমানবন্দর চালু হলে সাধারণ মানুষের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বেশি উপকৃত হবেন। তবে বিমানবন্দরকে কার্যকর ও টেকসই রাখতে হলে জেলায় শিল্পকারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে শিল্পকারখানা খুবই কম এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। এ পরিস্থিতি বদলাতে সরকার কাজ করছে। অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঠাকুরগাঁও সফর করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে শিগগিরই বিনিয়োগকারীদের আনার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
চীনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, চীনের রাষ্ট্রদূত ঠাকুরগাঁও সফর করেছেন। এ সময় প্রায় ছয় হাজার শিশুকে স্কুলব্যাগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১০ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষককে চীন সফরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে ঠাকুরগাঁওয়ে শিল্পকারখানা স্থাপনে চীন থেকে বিশেষজ্ঞ আসতে পারেন বলেও জানান তিনি।
মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ বিনা খরচে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং ঠাকুরগাঁও থেকেই কার্যক্রম শুরু করার কথা রয়েছে।
তবে শুধু চাকরি বা ঠিকাদারির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
তরুণদের মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ঠাকুরগাঁওকে মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের আরও বেশি বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণ হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জনগণের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্বের কারণে আগের মতো মানুষের কাছে যেতে না পারলেও তিনি ঠাকুরগাঁওবাসী থেকে দূরে সরে যাননি।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে তাঁকে জানানো হলে তিনি যথাসাধ্য মানুষের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন। ‘মনে করবেন না যে আমি আপনাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেছি। আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, আপনাদের সঙ্গেই থাকব’—বলেন তিনি।
ঠাকুরগাঁওয়ে নিজের জন্ম, শৈশব ও স্কুলজীবনের কথা স্মরণ করে মির্জা ফখরুল তাঁর শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। রুস্তম আলী স্যার ও খান ইউসুফ স্যারের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা তাঁকে সততা, নেতৃত্ব ও জীবনে চলার শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি সবাইকে ঐক্য ও ভালোবাসার ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ৫ আগস্টের পর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে সংঘাত ও প্রতিশোধের পরিবর্তে ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।
নাগরিক সংবর্ধনায় পাওয়া ভালোবাসার জন্য ঠাকুরগাঁওবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি কাজ করে যেতে চান।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ঠাকুরগাঁওবাসীর শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’
নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, জাতীয় সংসদের হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. আব্দুস সালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. জাহিদুর রহমান, রাষ্ট্রপতির বাল্যবন্ধু অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে এবং জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন প্রধানসহ অনেকে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ-জামান।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর এটিই মির্জা ফখরুলের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম সফর। দুই দিনের সরকারি সফরে রোববার দুপুরে হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের শহীদ মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়ামে পৌঁছান তিনি। সোমবার সফরের দ্বিতীয় দিনে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা রয়েছে।
১৪৬ বার পড়া হয়েছে