সর্বশেষ

সাহিত্য

চেতনার গহন পলি ও অস্তিত্বের রক্তক্ষরণ: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর শিল্প-প্রতিবেশের এক নিভৃত পাঠ

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বিংশ শতাব্দীর বাংলা কথাসাহিত্যের মানচিত্রের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত নির্জন অথচ প্রখর এক আলোকবর্তিকা চোখে পড়ে। সেই আলো কোনো উৎসবে জ্বলে ওঠা রঙিন বাতি নয়, বরং তা পাহাড়ের গুহায় পথ হারানো এক ক্লান্ত পথিকের হাতে ধরা মশাল যার আলোয় চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে ধরা দেয়। এই আলোকবর্তিকার নাম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তিনি কেবল একজন গল্পকার বা ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের আত্মার এক নিভৃত ব্যবচ্ছেদকারী। যেখানে সাধারণ লেখকেরা গল্পের ভিড়ে মানুষের মুখ খুঁজতেন, ওয়ালীউল্লাহ সেখানে মানুষের অন্তহীন একাকীত্ব আর অস্তিত্বের হাহাকারকে মূর্ত করে তুলেছেন। তাঁর সাহিত্য যেন এক গভীর জলের তলদেশ, যেখানে স্রোত নেই কিন্তু চাপের তীব্রতায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
গাউসুর রহমান

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বেড়ে ওঠা এবং তাঁর শিল্পবোধের বিবর্তন এক চমৎকার দ্বান্দ্বিকতার ফসল। চট্টগ্রামের পটিয়ার সেই জল-হাওয়ায় ভেজা শৈশব, আর পরবর্তীতে ইউরোপের ধ্রুপদী সংস্কৃতির সংস্পর্শ এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই তাঁর লেখনী শাণিত হয়েছে। আসলে আধুনিকতা তো কেবল যন্ত্র বা নগরায়ণ নয়, আধুনিকতা হলো নিজের ভেতরে নিজে পরবাসী হয়ে যাওয়ার বোধ। ওয়ালীউল্লাহ সেই বিরল শিল্পী, যিনি বুঝেছিলেন যে মজিদ যখন গ্রামের প্রান্তে মাজার সাজিয়ে বসে, তখন সে কেবল প্রতারণা করছে না, বরং সে নিজের বিলীন হয়ে যাওয়া অস্তিত্বকে এক টুকরো লালসালুর নিচে আশ্রয় দিতে চাইছে। এই যে শেকড়হীন মানুষের নিজের জন্য একটা কাল্পনিক ভিত্তি তৈরি করা এটাই তো আধুনিক অস্তিত্ববাদের সারকথা। তাঁর লেখায় গ্রামীণ পটভূমি থাকলেও তা কখনই শুধু ‘আঞ্চলিক’ হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে মানুষের চিরন্তন সংকটের এক বিশ্বজনীন দর্পণ।

‘লালসালু’ উপন্যাসটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরা অভ্যস্ত ছিলেন বিভূতিভূষণের নিসর্গ প্রেম অথবা তারাশঙ্করের সমাজ-বিবর্তনের আখ্যানে। কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ সেখানে নিয়ে এলেন এক শীতল ও নির্মোহ দৃষ্টি। মহব্বতপুর গ্রামটি যেন এক স্থবির জলাশয়, যেখানে মজিদ নামের এক আগন্তুক পাথর ছুড়ে মারল। কিন্তু সেই পাথরটি কোনো পরিবর্তনের নয়, বরং এক আদিম শোষণের। মজিদ কি শুধুই একজন ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ী? গভীর নিরিখে দেখলে মনে হয়, মজিদ মূলত এক ক্ষুধার্ত অস্তিত্ব। এক শস্যহীন অঞ্চল থেকে সে যখন ভেসে আসে, তখন তার পিঠে থাকে না কোনো ইতিহাস, পেটে থাকে না অন্ন। এই শূন্যতাই তাকে বাধ্য করে এক মৃত মানুষকে ‘মোদাচ্ছের পীর’ হিসেবে খাড়া করতে।

এখানেই ওয়ালীউল্লাহর মুন্সিয়ানা। তিনি মজিদকে কোনো ক্লিশে খলনায়ক হিসেবে আঁকেননি। বরং মজিদের ভেতরের ভয়, তার রাতের নির্জনতায় নিজের তৈরি মিথ্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে কাঁপুনি সেটাকেই তিনি পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। মজিদ যখন মাছের চোখে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা খোঁজে, তখন পাঠক শিহরিত হয়।

যদি ‘লালসালু’ হয় বাহিরের লড়াই, তবে ‘চাঁদের অমাবস্যা’ হলো অন্তরের গভীর অন্ধকারে এক দুঃসাহসিক ডুব। এই উপন্যাসের আবহটাই এমন যে, মনে হয় চারপাশ এক পরাবাস্তব কুয়াশায় ঢাকা। আরিফ মাস্টার, এক যুবক শিক্ষক, যে কিনা অতি সাধারণ এক মানুষ। কিন্তু এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে সে যখন দেখে তার পরম শ্রদ্ধেয় কাদের সাহেব এক মৃত যুবতীর লাশের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তার সেই অতি সাধারণ জীবন এক আমূল সংকটের মুখোমুখি হয়।

এখানে ওয়ালীউল্লাহ সরাসরি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সেই মনস্তাত্ত্বিক জগতের ভেতরে আমাদের নিয়ে যান। মানুষের ভেতরে যে পশুত্ব (Id) এবং তার ওপর যে নৈতিকতার প্রলেপ (Super-ego), তাদের মধ্যকার সংঘাতই আরিফ মাস্টারের মূল যন্ত্রণা। সত্য বলা মানে নিজের আশ্রয় হারানো, আর চুপ থাকা মানে তিলে তিলে নিজের আত্মাকে হত্যা করা। সার্ত্রের সেই ‘Nausea’ বা বমিভাবের যে ধারণা, আরিফ মাস্টার যেন প্রতি মুহূর্তে তার মধ্য দিয়েই যায়। সে রাতে চাঁদের আলো ছিল, অথচ আরিফের কাছে তা অমাবস্যার চেয়েও অন্ধকার মনে হয়েছে। কারণ যখন বিবেক অন্ধ হয়ে যায়, তখন মহাবিশ্বের কোনো আলোই মানুষকে পথ দেখাতে পারে না।

এই উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহর ভাষা যেন আরও বেশি মেদহীন, আরও বেশি তীক্ষ্ণ। তিনি দীর্ঘ বর্ণনা দেন না, বরং অল্প কিছু শব্দে এক একটা দৃশ্য এমনভাবে আঁকেন যা হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়। কাদের সাহেবের সেই নির্বিকার ভঙ্গি আর আরিফের অস্থিরতা এ যেন মানুষের আদিম পাপ আর আধুনিক বিবেকের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। শেষ পর্যন্ত আরিফের যে সিদ্ধান্ত, তা কোনো বীরত্ব নয়, বরং এক চূড়ান্ত একাকীত্ব। সত্য তাকে মুক্তি দেয়নি, বরং তাকে আরও বেশি একা করে দিয়েছে। এটাই কি আধুনিক মানুষের নিয়তি নয়? সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালে তাকে ঘরছাড়া হতেই হয়।

ওয়ালীউল্লাহর শিল্পরীতির চূড়ান্ত ও সবচেয়ে জটিল প্রকাশ সম্ভবত ‘কাঁদো নদী কাঁদো’। বাংলা সাহিত্যে ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ বা চেতনাপ্রবাহ রীতির এত সার্থক প্রয়োগ এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। এখানে কাহিনি সরলরেখায় চলে না, বরং তা স্মৃতির অলিগলি বেয়ে এক গোলকধাঁধা তৈরি করে। কুমুরডাঙ্গা গ্রাম আর সেখানকার মৃতপ্রায় নদী এ যেন এক ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার প্রতীক। নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন কেবল পলি পড়ে না, সেখানে পড়ে থাকে মানুষের অসংখ্য দীর্ঘশ্বাস আর চাপা কান্না।

তবারক আলী বা অন্যান্য চরিত্রগুলো যখন কথা বলে, তখন মনে হয় তারা বর্তমানের চেয়েও বেশি অতীতে বাস করছে। জেমস জয়েস বা ভার্জিনিয়া উলফ যেমন মানুষের মনের গহন স্রোতকে ধরেছিলেন, ওয়ালীউল্লাহ তাকে দিয়েছেন এক দেশজ গন্ধ। এখানকার কান্না কোনো নির্দিষ্ট মানুষের নয়, এ যেন এক সমষ্টিগত শোক। নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে তো কেবল জল কমে যাওয়া নয়, তা হলো এক জনপদের জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলা। মানুষের ভেতরে যে আদিম ভয় আর অপরাধবোধ লুকিয়ে থাকে, তা এখানে নদীর চরের মতো জেগে ওঠে।

পুরো উপন্যাসে এক ধরনের ঘোরের আবহ তৈরি করে রেখেছেন লেখক। পাঠক যখন পড়তে বসেন, তখন তাঁর মনে হয় তিনি কোনো আখ্যান পড়ছেন না, বরং এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন বা পরাবাস্তব ঘোরের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। এখানে ভাষা নিজেই একটা চরিত্র। শব্দের বিন্যাসে এক ধরনের যান্ত্রিকতা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত ছন্দপতন, যা মানুষের অস্থির মনকে প্রতিফলিত করে। এই উপন্যাসে ওয়ালীউল্লাহ আমাদের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান সময় কোনো স্থির বিন্দু নয়, সময় হলো এক বহমান নদী, যা আমাদের ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়, রেখে যায় শুধু কিছু অর্থহীন স্মৃতি।

উপন্যাসেই কি ওয়ালীউল্লাহর সবটুকু পাওয়া সম্ভব? বোধহয় না। তাঁর নাটকগুলো পড়লে বোঝা যায় তিনি নীরবতাকে কতটা শক্তিশালী ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন। ওয়ালীউল্লাহর নাটকে সংলাপের চেয়েও বিরতি বা ‘Pause’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন যে, মানুষ যখন খুব বেশি যন্ত্রণায় থাকে, তখন সে চিৎকার করে না, সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ‘তরঙ্গভঙ্গ’ বা ‘সুড়ঙ্গ’ নাটকেও এই অস্তিত্বের সংকট আর আধুনিক মানুষের দিশেহারা রূপটি প্রকট। স্যামুয়েল বেকেটের সেই ‘অ্যাবসার্ড’ থিয়েটারের ছায়া যেন কোথাও কোথাও এসে মিশেছে তাঁর নাট্যদর্শনে। তাঁর চরিত্রগুলো যেন কোনো এক অদৃশ্য গোডোর প্রতীক্ষায় থাকে, যে গোডো হয়তো কোনোদিন আসবে না। এই যে প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তা এটাই তো আধুনিক জীবনের সারমর্ম।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গদ্যশৈলী নিয়ে আলোচনা না করলে তাঁর শিল্পভুবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি তথাকথিত আলঙ্কারিক ভাষা পছন্দ করতেন না। তাঁর শব্দগুলো যেন এক একটা পাথরের কুচি ঠান্ডা, কঠিন এবং ধারালো। তিনি কুয়াশা, মাছ, পানি বা অন্ধকারের মতো অনুষঙ্গগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করেন যে, সেগুলো প্রতীকী অর্থে এক বিশাল ব্যাপ্তি পায়। তাঁর রচনায় ‘মাছ’ যেন মানুষের সেই পিচ্ছিল ও অধরা কামনা, যা চাইলেই ধরা যায় না। আবার ‘অন্ধকার’ সেখানে কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়, বরং তা মানুষের আশ্রয়ের এক আদিম গহ্বর।

ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসে নারীর অবস্থান অত্যন্ত গভীর ও সংবেদনশীল। তাঁর সময়ে অনেক লেখকই নারীকে কেবল গৃহবধূ বা প্রেয়সী হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ নারীকে দেখেছেন এক একটা স্বাধীন অস্তিত্ব হিসেবে। জমিলা, রহিমা বা তাহেরা এরা প্রত্যেকেই নিজের মতো করে লড়াই করে। কখনো সরাসরি বিদ্রোহে, কখনো নীরব অবাধ্যতায়। তিনি ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে বর্ণিত অবদমিত কামনার (Suppressed Desires) যে চিত্রায়ন করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মাইলফলক। তিনি দেখিয়েছেন যে, পর্দার আড়ালে থাকা নারীরও এক নিজস্ব পৃথিবী আছে, যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রবেশাধিকার নেই।

ওয়ালীউল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন যে, পৃথিবীর ভিড়ে নিজের সত্যকে চেনাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সংশয় অনেক বেশি মহৎ। তাঁর সাহিত্য পাঠ করা মানে কোনো অলীক স্বর্গে ভ্রমণ করা নয়, বরং নিজের ভেতরের নরকটাকে একবার চিনে নেওয়া। তিনি যেন এক দক্ষ শল্যচিকিৎসক, যিনি আমাদের সমাজের এবং মনের পচনগুলোকে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কোনো নির্দিষ্ট যুগে সীমাবদ্ধ নয়, যতক্ষণ মানুষ তার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ে থাকবে, ততক্ষণ ওয়ালীউল্লাহ পাঠ অপরিহার্য।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর শিল্পভুবন কোনো একমুখী রাস্তা নয়। এটি এক চক্রাকার যাত্রা। তিনি শুরু করেছিলেন মাটির গভীর থেকে, আর শেষ করেছেন চেতনার সেই গহন নীলে, যেখানে নক্ষত্রেরাও নিঃসঙ্গ বোধ করে। তাঁর প্রতিটি লাইন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ জন্ম থেকেই একা, আর সেই একাকীত্বকে সঙ্গী করেই তাকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। জীবন হয়তো শেষ পর্যন্ত এক অর্থহীন দৌড়, কিন্তু সেই দৌড়ের মাঝেই মানুষ যখন থামে এবং নিজের ছায়ার দিকে তাকায়, তখনই সে নিজেকে চিনতে পারে।

ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য যেন সেই প্রবহমান নদী, যার কথা তিনি নিজে লিখেছিলেন। সেই নদী শুকিয়ে গেলেও তার হাহাকার রয়ে যায় বাতাসের শিহরণে। তিনি হয়তো খুব বেশি লেখেননি, কিন্তু যতটুকু লিখেছেন, তা দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল শূন্যতাকে পূরণ করেছেন। তাঁর গদ্যের সেই হাড়-কাঁপানো শৈত্য আর অনুভবের উষ্ণতা আমাদের আরও দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন করে রাখবে। তিনি ছিলেন সেই শিল্পী, যিনি শব্দের কারুকার্য দিয়ে মানুষের রক্তক্ষরণকে শিল্পে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।

১২৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন