মৃত্তিকার মৌন ও জলছবির গান: রবীন্দ্র-চেতনার নিসর্গ-দিগন্ত
রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৫১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ ২০২৬ সালের এক অলস ভোরের আলো যখন জানলার কার্নিশ ছুঁয়ে ঘরে ঢোকে, তখন চারপাশের যান্ত্রিক শব্দের ভিড়েও কেমন এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আগস্টের এই সিক্ত দিনগুলো একসময় মেঘমল্লারের সুরে গান গেয়ে উঠত, অথচ আজ সেখানে কেবল তপ্ত বাতাসের হাহাকার। এই যে ঋতুচক্রের খেই হারিয়ে ফেলা, মাটির বুক চিরে কংক্রিটের অরণ্য গড়া আর নদীগুলোকে টুঁটি টিপে হত্যা করা এই সংকটের দিনে বারবার একজনের কথা মনে পড়ে। তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে কেবল একজন কবি বা সাহিত্যিক বললে বড় কম বলা হয়; তিনি ছিলেন এই ধরিত্রীর এক অতন্দ্র প্রহরী, যাঁর কলম মাটির গভীরে শিকড় ছড়িয়ে আর আকাশের নীলিমায় ডানা মেলে আমাদের শিখিয়েছিল কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়।
রবীন্দ্রনাথের চেতনার অর্ধেকের বেশি জুড়ে যেন এক বহমান জলধারা। বিশেষ করে পদ্মাপারের সেই দিনগুলো, যেখানে তিনি বোটের ওপর বসে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন, তা তাঁর অন্তরাত্মাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। পূর্ববঙ্গের সেই নদীমাতৃক জীবন কবিকে শিখিয়েছিল নিরবচ্ছিন্ন গতির মাহাত্ম্য। 'ছিন্নপত্র'-এর পাতা ওল্টালে দেখা যায়, নদী সেখানে কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং তা জীবনেরই এক দর্পণ। নদীর তটরেখা যখন ভাঙে, তখন মানুষের অহংকারও যেন চূর্ণ হয়ে যায়। নদী যেমন ধাবমান, মানুষের প্রাণও তেমনি এক অজানার দিকে ছুটে চলা।
কবির চোখে নদী ছিল এক চিরন্তন নারী, যে একদিকে ধ্বংস করে আবার অন্যদিকে সৃজনের পলি ছড়ায়। নদীর ওপর যখন মেঘের ছায়া পড়ত, তখন সেই দৃশ্যটি তাঁর কাছে স্রেফ দৃশ্য ছিল না, ছিল এক আধ্যাত্মিক মিলন। 'সোনার তরী' কবিতায় যে কূলহারা নদী আর মহাকালের খেয়াঘাটের রূপক দেখা যায়, তা মূলত মানুষের নশ্বরতা আর প্রকৃতির অবিনশ্বরতার এক মহাকাব্যিক লড়াই। মানুষ তার সারা জীবনের ফসল নৌকায় তুলে দেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মহাকালের স্রোতে তাকে নিজেকেই বিলীন হতে হয়। নদী এখানে বিয়োগান্তক হলেও পরম সত্য।
রবীন্দ্রনাথের কাছে বৃক্ষ ছিল পৃথিবীর আদি ধাত্রী। আকাশপানে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ তাঁর কাছে মনে হতো মাটির প্রার্থনা। 'বনবাণী' কাব্যে তিনি বৃক্ষকে যে সম্ভাষণ জানিয়েছেন, তা আধুনিক 'ডিপ ইকোলজি' বা গভীর পরিবেশবিদ্যার তাত্ত্বিকদেরও হার মানায়। তাঁর ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় সেই যে করুণ আর্তি “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর” তাকে কি স্রেফ রোমান্টিকতা বলা চলে? না, তা ছিল এক দ্রোহ। যান্ত্রিক সভ্যতা যখন নগরায়ণের দোহাই দিয়ে বনের পর বন উজাড় করছিল, তখন কবি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই কংক্রিটের জঙ্গল মানুষের মনের রসদ কেড়ে নিচ্ছে।
শান্তিনিকেতনের সেই রুক্ষ লাল মাটিকে তিনি যে ভালোবাসায় শ্যামল করে তুলেছিলেন, তা আজ আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। বৃক্ষরোপণ উৎসব কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না তাঁর কাছে; এটি ছিল ধরিত্রীর কাছে মানুষের ঋণের এক সামান্য স্বীকৃতি। “মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ” এই চরণে তিনি অরণ্যকে দেখেছেন এক অদম্য যোদ্ধা হিসেবে, যে কি না মরুভূমির গ্রাস থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে। গাছ কেবল ফল বা ছায়া দেয় না, গাছ মানুষকে স্থিতধী হতে শেখায়। আজকের এই দ্রুতগতির জীবনে আমরা কি পারি না একটি মুহূর্ত কোনো মহীরুহের তলায় দাঁড়িয়ে তার নীরব ভাষা বুঝতে?
রবীন্দ্রনাথ যে কেবল শান্ত প্রকৃতির উপাসক ছিলেন না, বরং তিনি যে একজন তীক্ষ্ণ দূরদর্শী সমাজচিন্তক ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে তাঁর ‘মুক্তধারা’ এবং ‘রক্তকরবী’ নাটকে। আজ যখন বড় বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে, তখন ‘মুক্তধারা’র যন্ত্ররাজ বিভূতির কথা মনে পড়ে। সেই যে জলস্রোতকে কৃত্রিম লৌহযন্ত্র দিয়ে আটকে দেওয়ার অহংকার, তা আধুনিক প্রযুক্তির সেই দানবীয় রূপকেই ফুটিয়ে তোলে। রঞ্জিত আর অভিজিতের সেই দ্বন্দ্ব আসলে ক্ষমতার সাথে প্রাণের দ্বন্দ্ব। প্রকৃতিকে জয় করা মানেই যে তাকে হত্যা করা নয়, এই সত্যটি কবি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।
আবার ‘রক্তকরবী’ নাটকের যক্ষপুরী যেন আজকের এই খনিজ সম্পদ লুুণ্ঠনকারী পুঁজিবাদী সমাজের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। মাটির তলা থেকে সোনা খুঁড়ে বের করার নেশায় মানুষ যখন অন্ধ হয়, তখন সে ভুলে যায় যে মাটির ওপরেও এক অপূর্ব প্রাণের জগৎ আছে। নন্দিনী সেখানে সেই প্রাণের প্রতীক, যে তার লাল করবী দিয়ে যন্ত্রের শুষ্কতাকে জয় করতে চায়। যক্ষপুরীর রাজা যখন নিজেকে জালের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ আসলে কতটা নিঃসঙ্গ আর শ্রীহীন। এই নাটকগুলোয় রবীন্দ্রনাথ যে ‘ইকো-সেন্ট্রিজম’ বা প্রকৃতি-কেন্দ্রিক বিশ্ববীক্ষার কথা বলেছেন, তা আজকের পরিবেশ আন্দোলনের মূল স্তম্ভ হওয়া উচিত।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে ঋতুরা যেন একেকটি রক্তমাংসের চরিত্র। বিশেষ করে বর্ষা আর বসন্ত। বর্ষা মানেই তাঁর কাছে হৃদয়ের এক গভীর বিরহ আর মিলনের যুগলবন্দী। যখন আকাশ কালো করে মেঘ আসে, তখন কবির মনের আকাশেও যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। “নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে” এই নিসর্গ বর্ণনা কেবল কাব্যিক নয়, এটি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের সাথে প্রকৃতির এক অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা বলে। বর্ষার কদম ফুল কিংবা মাটির সোঁদা গন্ধ এসবই মানুষের ইন্দ্রিয়জ অনুভুতিকে তীব্র করে তোলে।
অন্যদিকে বসন্ত তাঁর কাছে প্রাণের নব জাগরণ। শুকনো পাতার ঝরে যাওয়া যেমন দরকার, নতুনের আগমনের জন্য তেমনি প্রস্তুতিও জরুরি। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, মানুষের মনের শোক, তাপ বা আনন্দ সবকিছুরই এক একটি প্রতিফলন প্রকৃতির ঋতুচক্রের মধ্যে লুকিয়ে আছে। ফরাসি দার্শনিকদের সেই ‘সংবেদনবাদ’ যেন রবীন্দ্রসংগীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। যখন গাওয়া হয়, “আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি”, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে কম্পন নক্ষত্রলোকে চলে, সেই একই কম্পন মানুষের প্রতিটি রক্তকণিকায় বয়ে চলেছে। এই একাত্মবোধ থাকলে কি মানুষ পারে তার পরিবেশকে কলুষিত করতে?
আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যখন নদীগুলোর মৃতপ্রায় অবস্থা দেখি, তখন বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। আমাদের পদ্মা, মেঘনা বা গড়াই সবই আজ মানুষের লোভের বলি। রবীন্দ্রনাথের সেই বহমান পদ্মা আজ চর পড়ে মরে যাচ্ছে। প্লাস্টিক আর রাসায়নিক বর্জ্যে নদীর জল আজ বিষাক্ত। অথচ এই নদীই ছিল আমাদের সংস্কৃতির ধমনী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যে যে নির্মল প্রকৃতির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা আজ আমাদের জন্য এক বড় অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের নদী ও প্রকৃতি চেতনা কেবল পাঠ্যবইয়ের কোনো প্রবন্ধ নয়, তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক পথনির্দেশিকা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ঘাসের ওপর পা ফেলার সময়ও সংবেদনশীল হতে হয়। তিনি শিখিয়েছেন যে, একটি পাখির ডাক শোনা বা একটি বুনো ফুলের গন্ধ নেওয়ার মধ্যেও এক গভীর আনন্দ লুকিয়ে আছে। এই আনন্দ যারা অনুভব করতে পারে, তারা কখনো বৃক্ষচ্ছেদনকারী বা নদীদূষণকারী হতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথ যেন এক আলোকবর্তিকা নিয়ে আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। আজ যখন আমরা ধোঁয়া আর ধুলোর নগরীতে দমবন্ধ হয়ে আসি, তখন তাঁর গান আমাদের বলে যায় “মুক্ত করো হে আকাশ, নির্মল করো এই ধরা।” এই মুক্তি কেবল বাইরের নয়, এই মুক্তি আমাদের মনের সংকীর্ণতা থেকে। প্রকৃতির সাথে মানুষের এই যে প্রেম, এই যে অবিচ্ছেদ্য বন্ধন এটাই হতে পারে আগামীর পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র রক্ষাকবচ।
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখন নদীর জলে যে শেষ আভা ফুটে ওঠে, তার নামই হয়তো রবীন্দ্রনাথ। তিনি নেই, কিন্তু তাঁর নদীগুলো আছে (হয়তো জীর্ণ অবস্থায়), তাঁর অরণ্য আছে, আর আছে তাঁর সেই অমলিন চেতনা। সেই চেতনার পলি দিয়ে যদি আমরা আমাদের মনের জমিকে আবার উর্বর করতে পারি, তবেই হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যেতে পারব এক বাসযোগ্য পৃথিবী। রবীন্দ্র-দর্শন তাই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২০২৬ সালের এই আগস্টের স্নিগ্ধ প্রাতে দাঁড়িয়ে এইটুকুই হোক আমাদের অঙ্গীকার আমরা মাটিকে ভালোবাসব, আমরা জলকে বাঁচাব, আর আমরা প্রকৃতির বুকে নিজেকে হারিয়ে নতুন করে খুঁজে নেব।
কারণ, রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটি চিরকাল সত্য হয়ে থাকবে প্রকৃতি কোনো ব্যবহার্য পণ্য নয়, সে আমাদের আদি জননী। আর সেই জননীর কোলে শান্তিতে মাথা রাখার অধিকার আমাদের তখনই থাকবে, যখন আমরা তার মর্যাদা রক্ষা করতে জানব। প্রকৃতির এই মৌন আর জলছবির এই গান যেন আমাদের জীবনে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হয়।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৯ বার পড়া হয়েছে