সর্বশেষ

সাহিত্য

হাসির আড়ালে এক মেঘলা আকাশ

শাহেদ সরোওয়ার্দী
শাহেদ সরোওয়ার্দী

রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৪০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আমি তখন সবে ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। বয়সটা এমন—পড়াশোনার খাতায় ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন, আর বাস্তবে মাথার ভেতর সারাক্ষণ দুষ্টুমির ভূত।

পড়ালেখা করতাম, খেলাধুলা করতাম, আর সুযোগ পেলেই এমন সব কাণ্ড করতাম যে পাড়ার মানুষ আমাকে দেখলেই দূর থেকে বলত,

—ওই যে, শয়তানটা আসছে!
শাহেদ সরোওয়ার্দী

আমি অবশ্য এতে মোটেও কষ্ট পেতাম না। বরং মনে মনে ভাবতাম—বাহ! পরিচিতি তো ভালোই হচ্ছে!

বিকেল হলেই বন্ধুদের নিয়ে রাস্তায় বের হতাম। হাঁটতে হাঁটতে গলা ছেড়ে গান করতাম। গান কেমন হতো সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না, কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের শ্রোতা, শিল্পী এবং বিচারক—তিনটাই।

পাশ দিয়ে কেউ বিরক্ত হয়ে তাকালে আরও জোরে গান ধরতাম।

একবার বন্ধু মুকুলের বাসায় প্রথমবারের মতো কলিং বেল লাগানো হলো। খবরটা শুনেই আমাদের মধ্যে এমন উত্তেজনা তৈরি হলো, যেন মুকুলের বাড়িতে কলিং বেল নয়, বিনামূল্যে বিরিয়ানি বিতরণের মেশিন বসেছে।

আমি বললাম,

—চল, পরীক্ষা করে আসি।

পরীক্ষা অবশ্য আমরা এমনভাবে করতাম যে বিজ্ঞানীরা দেখলে নতুন কোনো গবেষণার বিষয় পেয়ে যেতেন।

একজন গিয়ে চুপিচুপি কলিং বেল চাপত।

*টিং টং!*

তারপরই—

—দৌড়!

কেউ কলাবাগানে, কেউ আখ ক্ষেতে, কেউ ঝোপের আড়ালে।

ভেতর থেকে মুকুলের বড় বোন শ্যামলী আপার গলা ভেসে আসত,

—কে?

আমরা তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছি। মনে হতো, দেশের সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছি।

শ্যামলী আপা দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে কাউকে না দেখে বিরক্ত হয়ে আবার দরজা বন্ধ করতেন।

দরজা লক হওয়ার শব্দটা কানে আসতেই আমরা আবার ছুটতাম।

*টিং টং!*

আবার দৌড়!

এ কাজে আমাদের সহযোগী ছিল হেলাল, ফুলন, শরীফ—এমনকি মাঝেমধ্যে মুকুল নিজেও।

অর্থাৎ যার বাড়িতে দুষ্টুমি করছি, তাকেও আমরা সহযোগী বানিয়ে ফেলেছি!

---

শুধু কলিং বেলেই আমাদের প্রতিভা সীমাবদ্ধ ছিল না।

কখনো কোনো বন্ধুর বাড়ির সামনে গিয়ে ফকিরের গলায় ডাকতাম,

—আম্মা... ভিক্ষা দিবেন?

ভেতর থেকে বন্ধুর আম্মা বা বোন বলত,

—দাঁড়াওগো, আসছি।

পটের মধ্যে চাল নিয়ে দরজা খুলে দেখত—কোনো ফকির নেই।

আমি দাঁড়িয়ে আছি।

দাঁত বের করে হাসছি।

কেউ পয়সা হাতে নিয়ে বের হয়ে আমাকে দেখে বলত,

—ওরে শয়তান!

আমি অত্যন্ত নিরীহ মুখ করে বলতাম,

—আমি আবার কী করলাম?

একবার তো একজন আমাকে দেখে এমনভাবে দরজা বন্ধ করেছিল যে মনে হয়েছিল, আমি ভিক্ষা চাইতে নয়, তাদের বাড়ির দলিল চাইতে গিয়েছিলাম।

---
একদিন কালর্ভাটে বসবো তাকিয়ে দেখি পাখি হাগু করে রেখেছে। মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো। ফুলনকে দেখলাম রাস্তায়।
বললাম- দোস্ত, এদিকে আসুতো।
হাতটা দিয়ে হাগু ঢেকে বসলাম। আর ফুলনকে বসতে দিলাম ঢেকে রাখা হাগু বরাবর। ও বসতেই হাতটা সরিয়ে নিলাম আর লেটকে গেলো ওর প্যান্ট।
আমি ওকে বললাম- তোমার পেছন চেক্ করো। ও উঠে পশ্চাৎদেশ এ তাকাতেই হাসতে হাসতে ঝেড়ে দিলাম দৌঁড়।
ও তো রেগে ফোঁসফোঁস করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। আহ্ কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম। মনে মনে গানও ধরেছিলাম।
- আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।

আবার, এলাকার কোনো বড় ভাইয়ের ওপর অভিমান হলে প্রতিশোধের ধরনও ছিল অভিনব।

এক বড় ভাই মসজিদের সামনে সাইকেল রেখে নামাজে ঢুকেছেন। আমি আর আমার সাঙ্গোপাঙ্গরা সুযোগ বুঝে তাঁর সাইকেলের চাকার পাম্প ছেড়ে দিলাম।

নামাজ শেষে বের হয়ে তিনি সাইকেল নিয়ে কিছুদূর যেতেই—

*ফুসসসস!*

চাকা বসে গেছে।

কিছুক্ষণ পর খবর এল,

—তোকে কিন্তু চিনে ফেলেছি!

আমি বললাম,

—কে বলেছে?

তিনি বললেন,

—তুই ছাড়া আর কে করবে?

আমি খুব আহত হয়ে বললাম,

—এভাবে আমাকে সন্দেহ করা কি ঠিক?

সেদিন রাতে তাঁর রুমের দরজার সামনে এক খাবলা গোবর রেখে এলাম।

প্রতিশোধেরও তো একটা নান্দনিকতা থাকা দরকার!

---

বন্ধু ফুলন ছিল একটু নাদুসনুদুস। তাই তার নাম হয়ে গেল ভোম্বল

আর মুকুল ছিল বেশ কাবু ধরনের। তাকে ডাকতাম শুটকি

নামের বিকৃতিতে ওরা রাগ করত, কিন্তু আমরা বুঝতাম—ভেতরে ভেতরে ওরাও আনন্দ পায়।

হেলালের অবস্থা আরও খারাপ।

ওর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতাম,

—মেরা লালহু! তুমি কুতায়?

হেলাল জানালা দিয়ে মুখ বের করে বলত,

—তোরে পাইলে কুত্তা বানায়া ছাড়মু!

আমি বলতাম,

—এই তো! মেরা লালহু রাগ করছে!

---

তখন আমাদের কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে ম্যান্ডি নামে এক আপু পড়ত।

সে সময় গোবিন্দ আর সালমান খানের পার্টনার সিনেমা বের হয়েছে। সিনেমার একটা গান নিয়ে আমরা ম্যান্ডি আপুর জীবন অতিষ্ঠ করে তুললাম।

গানটাকে নিজেদের মতো করে বানিয়ে সারাক্ষণ চিৎকার করতাম,

—ম্যান্ডি প! প! ম্যান্ডি প! প!

ম্যান্ডি আপু দূর থেকে চোখ বড় বড় করে তাকাতেন।

একদিন বললেন,

—এই! এমন বাজে করে গান করলে কিন্তু তোর বাড়িতে গিয়ে নালিশ করে আসব।

আমি সঙ্গে সঙ্গে ভদ্র ছেলের অভিনয় করে বললাম,

—সরি আপু। আর করব না।

দুদিন পর আবার—

—ম্যান্ডি প! প!

আপু রাগে বলতেন,

—তুই মানুষ হবি না!

আমি বলতাম,

—হব আপু। একটু সময় লাগবে।

---

এর মধ্যে আমার আরেকটা নেশা ছিল—সিনেমা।

শাবনূর-রিয়াজের সিনেমা এলে সেটা না দেখে থাকা অসম্ভব। সিনেমা হলের অন্ধকার, পর্দায় নায়ক-নায়িকা, চারপাশে দর্শকদের শিস—সব মিলিয়ে আমার কাছে সেটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

একবার সিনেমা দেখতে গেছি।

বিরতিতে ওয়াশরুম সেরে আবার হলে ঢুকলাম।

ভেতর তখন পুরো অন্ধকার।

নিজের সিট কোথায় কিছুই বুঝতে পারছি না।

হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছি।

হঠাৎ একটা জায়গায় হাত রাখলাম।

ভাবলাম—এই তো সিট!

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শরীরটা সামলে নিচ্ছি।

হঠাৎ একটা কোমল হাত এসে আমার হাতটা সরিয়ে দিল।

আমি তাকিয়ে দেখি—

*সিট নয়!*

এক অপরিচিত মেয়ের কাঁধে হাত রেখে আমি দাঁড়িয়ে আছি!

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি।

দুই সেকেন্ড।

তারপর আমার মাথায় একটাই সিদ্ধান্ত এল—

*বাঁচতে হলে পালাও!*

দিলাম দৌড়।

অন্ধকার হলের ভেতর মানুষজনকে ডিঙিয়ে, চেয়ার এড়িয়ে, কোনদিকে যাচ্ছি না জেনেই ছুটলাম।

একসময় একটা সিটে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবলাম—বেঁচে গেছি।

আলো জ্বলার পর দেখি, নিজের সিটেই এসে বসেছি!

বন্ধুরা জিজ্ঞেস করল,

—এত হাঁপাচ্ছিস কেন?

ঘটনা খুলে বলতেই ওরা এমন হাসি শুরু করল যে সিনেমার বাকি অংশের চেয়ে আমার কাণ্ডটাই তাদের কাছে বেশি বিনোদন হয়ে গেল।

---

আর ছিল জহুরুল স্যারের কাছে ফিজিক্স প্রাইভেট পড়া।

আমাদের ব্যাচে প্রায় ত্রিশজন ছেলে।

আমাদের পরের ব্যাচ ছিল মেয়েদের।

মেয়েদের ব্যাচ শুরু হওয়ার আগে ওরা স্যারের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে এমন হৈচৈ করত যে মনে হতো ফিজিক্স পড়তে নয়, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এসেছে।

ক্যাওম্যাও, হাসাহাসি, চিৎকার—সব মিলিয়ে আমাদের মাথা গরম।

একদিন দেখি, বাইরে রাখা আমাদের সব সাইকেলের পাম্প ছেড়ে দিয়েছে।

আমার রাগ হলো।

ভাবলাম—এর একটা জবাব দিতে হবে।

স্যারের কাছে মেয়েদের পরীক্ষার খাতা রাখা ছিল।

আমি সুযোগ বুঝে কয়েকটা খাতায় লিখে দিলাম আজব সব কথা।

কারও খাতায়—

“আমি হাগু করে ছুচু করব না, তুমি চেটে পরিষ্কার করে দেবে।”

কারও খাতায়—

“আমার হাগু পুষ্টি সমৃদ্ধ। খেলে শরীরে বল পাবে।”

আরেকজনের খাতায়—

“আমার হিসু স্যালাইন গুণসম্পন্ন। দুর্বল লাগলে খেয়ে নিও।”

লিখে আমি এমন সন্তুষ্ট হয়েছিলাম, যেন বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছি।

এরপর শুরু হলো তদন্ত।

মেয়েরা খাতা খুঁজে খুঁজে দেখছে কে এই মহৎ সাহিত্যকর্ম করেছে।

আমাদের ব্যাচ পরীক্ষা দিল।

খাতা স্যারের কাছে জমা।

মেয়েরা খাতা হাতে নিয়ে হাতের লেখা মিলাতে শুরু করল।

আমি তখন মনে মনে বলছি,

“হে আল্লাহ, এতদিনের দুষ্টুমি আজ ধরা পড়ে যাবে!”

একদিন আমি আর বন্ধু আমিন স্যারের বাসা থেকে বের হচ্ছি।

মেয়েরা বাইরে দাঁড়িয়ে।

একজন বলল,

—আমিন!

আমার বুকের ভেতর ধপ করে উঠল।

আমি মনে মনে বললাম,

“শেষ! সব শেষ! আজ আমার সাহিত্যিক পরিচয় ফাঁস!”

মেয়েরা আমিনকে বেশ কিছুক্ষণ শক্ত ভাষায় কী কী যেন বলল।

আমিনের মুখ লাল।

সে ফিরে এল।

আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,

—কী বলল?

আমিন বলল,

—ওদের খাতায় কে যেন বাজে বাজে কথা লিখছে। ওরা ভাবছে আমি লিখছি। আমাকে খুব বকা দিল!

আমি এমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম যে মনে হলো ফুসফুস থেকে পাঁচ কেজি বাতাস বের হলো।

আমিন আজও জানে না—তার নামে যে মামলা হয়েছিল, আসল আসামি তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল!

---

এইভাবেই দিনগুলো কাটছিল।

হাসি ছিল।

বন্ধু ছিল।

দুষ্টুমি ছিল।

স্বপ্ন ছিল।

জীবনটা তখন আমার কাছে একটা বিশাল মাঠের মতো—যেদিকে দৌড়াই সেদিকেই আনন্দ।

কিন্তু জীবন যে কখনো কখনো হঠাৎ দৌড় থামিয়ে দেয়, সেটা তখন জানতাম না।

একদিন শরীরটা কেমন যেন দুর্বল লাগতে শুরু করল।

প্রথমে গুরুত্ব দিইনি।

ভাবলাম, হয়তো বেশি দৌড়াদৌড়ি করেছি।

কয়েকদিন পর দুর্বলতা বাড়ল।

স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হলো।

কাজ হলো না।

শেষ পর্যন্ত বাবা আমাকে নিয়ে ঢাকায় গেলেন।

একটার পর একটা পরীক্ষা।

রক্ত পরীক্ষা।

আরও পরীক্ষা।

তারপর আরও পরীক্ষা।

আমি তখনও ভাবছি—কিছু একটা হবে, ওষুধ খাব, ঠিক হয়ে যাব।

ডাক্তার রিপোর্ট হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

ডাক্তারের সেই নীরবতা আজও আমার মনে আছে।

তিনি বাবাকে ডাকলেন।

তারপর খুব ধীরে বললেন,

—শুরুতেই চিকিৎসা হলে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে আপনাদের শক্ত থাকতে হবে।

আমি তখনও বুঝতে পারছিলাম না, কেন সবাই এত চুপ।

তারপর সেই কথাটা শুনলাম—

*আমার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে।*

মনে হলো কেউ যেন হঠাৎ করে আমার চারপাশের পৃথিবীর সব শব্দ বন্ধ করে দিয়েছে।

ম্যান্ডি আপুর ওপর করা দুষ্টুমি নেই।

কলিং বেলের শব্দ নেই।

“ভোম্বল” বলে ফুলনকে ডাকার সুযোগ নেই।

“শুটকি” বলে মুকুলকে খেপানোর কেউ নেই।

হেলালের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে “মেরা লালহু” বলে চিৎকার নেই।

সিনেমা হলের অন্ধকারে ভুল করে কারও কাঁধে হাত রাখার মতো হাস্যকর ঘটনাও নেই।

সবকিছু আছে—

শুধু আমি আগের আমি নেই।

---

ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আমি আর বন্ধুদের কাছে যেতাম না।

ওরা আসত।

ডাকত।

বলত,

—চল, বাইরে যাই।

আমি বলতাম,

—আজ না।

—কেন?

—এমনিই।

ওরা আমাকে আবার আগের মতো হাসাতে চাইত।

কেউ পুরোনো দুষ্টুমির কথা তুলত।

কেউ বলত,

—ওই মেয়েটার কাঁধের ঘটনা মনে আছে?

সবাই হাসত।

আমিও হাসার চেষ্টা করতাম।

কিন্তু আগের সেই হাসি আর আসত না।

ঠোঁট দুটো শুধু একটু বাঁকা হতো।

একটা শুকনো হাসি।

যেন হাসিটাও আমার সঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

মা আমার জন্য কাঁদতে কাঁদতে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগলেন।

আমি মাকে সান্ত্বনা দিতাম।

বলতাম,

—কাঁদো না মা। আমি ভালো হয়ে যাব।

কিন্তু কথাটা বলার সময় নিজের কণ্ঠেই আমি বিশ্বাস খুঁজে পেতাম না।

রাতে একা ঘরে শুয়ে থাকতাম।

কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম।

কখনো নদীর ধারে গিয়ে বসতাম।

নদীর পানি বয়ে যেত।

আমি তাকিয়ে থাকতাম।

ভাবতাম—

জীবন এত ছোট কেন?

সুখটা কেন এত অল্প সময়ের?

যে ছেলেটা কয়েকদিন আগেও অন্যের কলিং বেল বাজিয়ে দৌড়ে পালাত, সে আজ নিজের শরীরের ভেতরের অদৃশ্য শত্রুর কাছ থেকে পালানোর পথ খুঁজছে।

যে ছেলেটা অন্যকে বসানোর জন্য পাখির হাগু লুকিয়ে রাখত, সে আজ নিজের ভাগ্যের সামনে বসে আছে—অসহায়।

যে ছেলেটা সিনেমা হলে ভুল করে অপরিচিত মেয়ের কাঁধকে সিট ভেবে দাঁড়িয়ে থেকেও দৌড়ে বেঁচে গিয়েছিল, সে আজ জীবন নামের এই অন্ধকার হলের ভেতর নিজের সিটটাই খুঁজে পাচ্ছে না।

নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হতো—

আমি বুঝি একটা ভেসে বেড়ানো একলা মেঘ

কোথাও আমার স্থায়ী ঠিকানা নেই।

শুধু ভেসে চলেছি।

একদিন যে মেঘ বন্ধুদের নিয়ে আকাশজুড়ে হাসত, সে মেঘের ভেতর এখন শুধু বৃষ্টি জমে।

আমি চোখ মুছে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

দূরে কোথাও বন্ধুরা হয়তো হাসছে।

কেউ হয়তো ফুলনকে “ভোম্বল” বলে ডাকছে।

কেউ হয়তো মুকুলকে “শুটকি” বলে খেপাচ্ছে।

হয়তো হেলালের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছে—

—মেরা লালহু! তুমি কুতায়?

আর আমি নদীর পাড়ে বসে চুপচাপ শুনি।

একসময় যে হাসির শব্দে আমি পৃথিবী মাতিয়ে রাখতাম, সেই হাসির শব্দই এখন দূর থেকে শুনলে বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা হয়।

কারণ বুঝতে পারি—

*মানুষ আসলে সুখের সময়টাকে তখনই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, যখন সে জানে না সুখটা একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।*

আমি তখনও জানতাম না সামনে কী আছে।

শুধু জানতাম—

আমার শৈশবের সেই দুরন্ত ছেলেটা, যে কলিং বেল বাজিয়ে দৌড়াত, ফকির সেজে চাল চাইত, বন্ধুদের হাগুর ওপর বসাত, আর নিজের ভুলে সিনেমা হল থেকে দৌড়ে পালাত—

সে কোথাও হারিয়ে গেছে।

নদীর পাড়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাই শুধু মনে হতো—

*“জীবন, তোকে নিয়ে আমার আরও অনেক দুষ্টুমি করার ছিল রে...”*

কথাটা শেষ করতে পারতাম না।

চোখের পানি গড়িয়ে পড়ত।

আর ঠিক তখনই মনে হতো—

আকাশের সেই একলা মেঘটাও বুঝি কাঁদছে।

শুধু পার্থক্য একটাই—

*মেঘের কান্না নদীতে মিশে যায়, আর মানুষের কান্না থেকে যায় বুকের ভেতর।*

১৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন