জীবনের বালুচরে এক অনন্ত অপেক্ষা
শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬ ৪:৫১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমার দাদীর কাছে সারা পৃথিবী এক পাশে, আর আমি অন্য পাশে তবু তাঁর কাছে আমার ওজনই বেশি ছিল।
আর আমার কাছেও দাদী মানেই এক পৃথিবী, যার কাছে বাকি সবকিছুই তুচ্ছ।
মানুষের জীবনে কিছু বিদায় থাকে যা কেবল একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়। বরং একটি যুগের অবসান, একটি আশ্রয়ের পতন, একটি নিরাপদ পৃথিবীর বিলুপ্তি। আমার জীবনে আমার দাদির মৃত্যু তেমনই এক ঘটনা। সময়ের ক্যালেন্ডারে হয়তো তাঁর বিদায়ের দিনটি একটি সাধারণ তারিখ। কিন্তু আমার হৃদয়ের ইতিহাসে সেটি এক অনন্ত বেদনাবিদুর শোকের দিন বা এক দীর্ঘ রাত্রির সূচনা।
আজও কখনো কখনো মনে হয় আমার দাদি কোথাও আছেন। হয়তো উঠোনের এক কোণে বসে আছেন, হয়তো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আমার ফেরার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। জানি আর কোনোদিন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। আর কোনোদিন তাঁর স্নেহভরা হাত মাথায় পড়বে না। আর কোনোদিন অভিমান করে তাঁর কাছে গিয়ে বসা হবে না। মৃত্যুর এই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ মানুষকে বুঝিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হলো হারিয়ে যাওয়া।
দাদি ছিলেন আমার শৈশবের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম আশ্রয়, প্রথম নিরাপত্তা। তাঁর কোলে মাথা রাখলেই পৃথিবীর সব দুঃখ যেন দূরে সরে যেত। সংসারের ঝড়, মানুষের অবহেলা, জীবনের অনিশ্চয়তা সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক নীরব প্রাচীর। আজ সেই প্রাচীর আমার নেই। ফলে পৃথিবীর রোদও বেশি তীব্র লাগে, বৃষ্টিও বেশি নির্দয় মনে হয়।
মানুষ প্রায়ই বলে সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু কিছু ক্ষত সময়ের সঙ্গে শুকায় না বরং আরও গভীর হয়। দাদির অনুপস্থিতি আমার জীবনে তেমনই এক অপূরণীয় শূন্যতা। প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্তে তাঁর অভাব অনুভব করি। কোনো সুখবর পেলে মনে হয় তাঁকে বলি। কোনো কষ্ট পেলে মনে হয়, তাঁর কাছে গিয়ে বসি। কিন্তু যাকে বলার জন্য হৃদয় ব্যাকুল হয় তিনি তো আর এই পৃথিবীতে নেই।
জীবনকে প্রায়ই নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু আমার কাছে জীবন এখন এক বিশাল বালুচর। এখানে মানুষের পদচিহ্ন আছে, স্মৃতির ছায়া আছে, কিন্তু নেই স্থায়িত্ব। জোয়ারের পানির মতো মানুষ আসে, ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখায়। তারপর একসময় ভাটার টানে হারিয়ে যায়। বালুচরে যেমন বাতাসের ঝাপটায় সব চিহ্ন মুছে যায়। তেমনি জীবনের বহু সম্পর্ক, বহু হাসি, বহু স্বপ্নও সময়ের ঝড়ে বিলীন হয়ে যায়।
দাদির মৃত্যুর পর আমি এই সত্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। আমরা ভাবি প্রিয় মানুষগুলো চিরকাল আমাদের পাশে থাকবে। আমরা ভাবি সময় এখনও অনেক আছে। কিন্তু জীবন কারও জন্য অপেক্ষা করে না। একদিন হঠাৎ করেই দেখা যায় যে মানুষটিকে ছাড়া জীবন কল্পনা করা যেত না সেই হয়ে গেছে স্মৃতি। কখনো কখনো গভীর রাতে মনে হয় আমার ভেতরের একটি ঘর চিরতরে খালি হয়ে গেছে। বাইরে সবকিছু আগের মতোই আছে। সূর্য ওঠে, মানুষ হাসে, বাজার বসে, উৎসব হয়। কিন্তু অন্তরের সেই ঘরে আর আলো জ্বলে না। সেখানে শুধু স্মৃতির ধুলো জমে থাকে। দাদির কণ্ঠস্বর, তাঁর গল্প, তাঁর উপদেশ, তাঁর হাসি সবকিছু যেন দূর অতীতের প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
মানুষের জীবনে অপূর্ণতারও এক বিশেষ ভাষা আছে। কিছু স্বপ্ন পূরণ হয় না, কিছু কথা বলা হয় না, কিছু ভালোবাসা প্রকাশ করা হয় না। আমার জীবনেও দাদিকে ঘিরে বহু অপূর্ণতা রয়ে গেছে। হয়তো আরও বেশি সময় তাঁর সঙ্গে কাটানো উচিত ছিল। হয়তো আরও বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করা উচিত ছিল। হয়তো তাঁর ত্যাগ ও মমতার প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত ছিল। কিন্তু মানুষ সাধারণত প্রিয়জনের মূল্য বুঝতে শেখে তাদের হারানোর পর।
আজ আমি যখন নিজের জীবনকে ফিরে দেখি তখন মনে হয় আমি এক ছন্নছাড়া পথিক। সংসারের এই বিশাল বালুচরে হাঁটছি ঠিকই কিন্তু সেই পুরোনো আশ্রয় আর নেই। জীবনের নানা অর্জন, ব্যস্ততা ও সম্পর্কের ভিড়ের মাঝেও কোথাও এক গভীর একাকিত্ব আমাকে অনুসরণ করে। কারণ পৃথিবীর সব শূন্যতা পূরণ করা গেলেও দাদির মতো একজন মানুষের শূন্যতা পূরণ করার ক্ষমতা কারও নেই।
তবে এই বেদনার মাঝেও একটি শিক্ষা রয়েছে। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন ধৈর্য, মমতা, সহনশীলতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তিনি চলে গেছেন কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর স্নেহের স্মৃতি এখনও আমার জীবনের পথপ্রদর্শক। মানুষ দেহে বেঁচে থাকে সীমিত সময় কিন্তু ভালোবাসায় বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
আজ যখন তাঁর কথা মনে পড়ে চোখ ভিজে ওঠে। আমার দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি পেটপুরে ভাত খেতে পারিনি। মনে হয় দূর আকাশের কোনো অদৃশ্য প্রান্তে তিনি হয়তো আমার জন্য দোয়া করছেন। হয়তো তিনি দেখছেন আমি এখনও সেই পুরোনো স্মৃতির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছি। এখনও অপেক্ষা করছে একটি অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের জন্য। কিন্তু জীবন তো অপেক্ষার নাম নয়, জীবন চলার নাম। তাই শোককে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে হয়।
আত্মীয়তা রক্তের বন্ধন হলেও সব আত্মীয় কল্যাণকামী হয় না। কিছু দুষ্টু, স্বার্থপর ও হিংসাপরায়ণ আত্মীয় নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে পরিবারের শান্তি, সম্প্রীতি ও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা গুজব, অপবাদ, কূটকৌশল ও ভুল বোঝাবুঝির মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরায়। অনেক সময় পরিবারের একজনের সাফল্য তাদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে। ফলে তারা প্রকাশ্যে বা গোপনে ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করে। এমন মানুষরা আপনজনের মুখোশ পরে থাকলেও তাদের আচরণ পরিবারকে মানষিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইতিহাস ও বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয়, বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের শত্রু অধিক ভয়ংকর। তাই পরিবারকে রক্ষা করতে হলে সম্পর্কের নামে অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রজ্ঞা, সতর্কতা ও নৈতিক দৃঢ়তার সঙ্গে চলতে হয়।
হৃদয়ের গভীরে দাদির স্মৃতিকে ধারণ করেই বাঁচতে হয় আমাকে। কারণ ভালোবাসার মানুষগুলো কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা আমাদের স্মৃতির ভেতর, আমাদের চরিত্রের ভেতর, আমাদের প্রতিটি অনুভূতির ভেতর বেঁচে থাকে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার নাম দাদি। তাঁর চলে যাওয়ার পর আমি বুঝেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শব্দটি হলো ‘বিদায়’। আর সবচেয়ে গভীর ব্যথাটি হলো সেই মানুষটির জন্য অপেক্ষা করা। যিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
জীবনের এই বালুচরে দাঁড়িয়ে আজও মনে মনে বলি বু তুমি যদি কখনো স্মৃতির ওপার থেকে আমার ডাক শুনতে পাও। জেনে রেখো তোমার মাসুম এখনও তোমাকে খুঁজে বেড়ায়। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়েও সে আজও নিজেকে একা মনে করে। কারণ জীবনের অনেক শূন্যতা পূরণ হয়, কিন্তু তোমার শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হয় না। আর কোনোদিন হবে না দেখা, তবুও হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তুমি রয়ে যাবে। আমার অস্তিত্বের গভীরে, আমার স্মৃতির আকাশে, আমার জীবনের অনন্ত বেদনার মধ্যে।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।
১২৩ বার পড়া হয়েছে