সড়কে অন্তহীন ভোগান্তি
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত হলো সুসংহত যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামোর বর্তমান চিত্র এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একই নৈরাজ্যের চিত্র দৃশ্যমান। কোথাও কোটি-কোটি টাকা ব্যয়ে দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মিত হলেও সংযোগ সড়কের অভাবে তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দেশের বিভিন্ন নদী ও খালের ওপর নির্মিত বহু সেতু বছরের পর বছর ধরে যোগাযোগহীন দ্বীপ-এর মতো দাঁড়িয়ে আছে। যার দুই পাশে কোনো রাস্তা নেই।
আবার কোথাও সড়ক থাকলেও সামান্য একটি কালভার্ট বা সংযোগ সেতুর অভাবে বিস্তীর্ণ জনপদ জুড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে । পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চরম সমন্বয়হীনতা এবং অদূরদর্শিতার কারণে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যুগের পর যুগ ধরে অবর্ণনীয় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে মাঠপর্যায়ে এসে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তার বড় প্রমাণ এটি।
সড়ক অবকাঠামো শৃঙ্খলাবদ্ধ, সুউন্নত ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় বাজেটে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সংস্কারের নামে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যে চর্চা চলছে; নিতান্তই সাধারণ মানুষের সাথে নির্মম উপহাস মাত্র। খানাখন্দ মেরামতের নামে সড়কের একপাশে কার্পেটিং ও জোড়াতালি দিয়ে অন্যপাশে যেতে না যেতেই আগের অংশ আবার ভেঙে ধসে যায়।
বর্ষা মৌসুমের সামান্য বৃষ্টিতেই ধুয়ে যায় পিচ ও বিটুমিন। এই টেকসইহীন সংস্কার কাজের অন্তরালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের অনৈতিক যোগসাজশ রয়েছে। রাষ্ট্রের সাথে প্রতারণার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ চক্র অবৈধ টাকার পাহাড় গড়ে তুলছে। টেকসই সড়ক নির্মাণের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের ৩ নম্বর ইট, বালু ও ভেজাল বিটুমিন। ফলে নতুন নির্মিত সড়কও কয়েক মাসের মধ্যে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই চক্র চলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়; প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাবে তারা সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
দুর্নীতির এই করাল গ্রাস, শুধু সড়ক খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে।
ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় চরম ভোগান্তির শিকার সাধারণ পথচারী ও চালকেরা ক্ষোভে-দুঃখে সরকারকে গালি দিয়ে নিজেদের মনের কষ্ট উপশম করার চেষ্টা করে। সড়কে বিপজ্জনক এসব খানাখন্দের জন্য অনেক সময় পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হন এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনায় মানুষের জানমাল বিপন্ন হয়।
সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও কঠোর নজরদারির অভাবেই এইসব অনিয়ম স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
নিম্নমানের কাজের জন্য ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের তদারকিতে গাফিলতি ও দুর্নীতির সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সরকারি অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
যেকোনো সেতু ও সড়ক নির্মাণের আগে তার সংযোগ অবকাঠামোর উপযোগিতা যাচাই করে যুগপৎ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতিটি জেলা ও উপজেলার সড়ক নির্মাণ; সংস্কার প্রকল্পের ব্যয় এবং উপাদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির সাথে, থার্ড-পার্টি অডিটের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি দূর করতে, সর্বাগ্রে অনৈতিক সিন্ডিকেট ভেঙে টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে না পারলে; দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়।
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
১১৯ বার পড়া হয়েছে