সর্বশেষ

ফেবু লিখন

অতো গুড় তো আধসের না!

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১:০২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
গ্রামবাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরলে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই চোখে পড়ে না, কানে আসে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা কত শত প্রবাদ, প্রবচন আর মজার মজার কথামালা। এসব কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকে গ্রামের মানুষের জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, রসবোধ আর বাস্তবতার গভীর শিক্ষা।
তেমনই একটি বহুল প্রচলিত কথা— “অতো গুড় তো আধসের না!”
হাবীব চৌহান

কথাটি শুনতে যতটা সহজ, এর ভেতরের অর্থ কিন্তু বেশ গভীর। সম্প্রতি গ্রামের একটি বাজারে গিয়ে এমনই একটি ঘটনার সাক্ষী হলাম।

বাজারের এক পাশে দুজন মানুষ কোনো একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বেশ উত্তেজিতভাবে আলোচনা করছিলেন। প্রথমে মনে হলো, হয়তো সাধারণ কথাবার্তা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কথার সুর বদলে গেল। আলোচনা গড়াল তর্কে, আর তর্ক ধীরে ধীরে রূপ নিল একেবারে কথার লড়াইয়ে।

ততক্ষণে আশপাশের লোকজনও কৌতূহলী হয়ে তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। কী নিয়ে এত তর্ক—সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।
কিছুক্ষণ পর বিষয়টি পরিষ্কার হলো। জমিজমা বিক্রির ব্যাপার। বিক্রেতা যে দাম চাইছেন, ক্রেতা তার চেয়ে অনেক কম দাম বলছেন। বিক্রেতা ক্রেতার প্রস্তাবে রীতিমতো ক্ষুব্ধ। একপর্যায়ে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলে উঠলেন—

“অতো গুড় তো আধসের না!”

কথাটি শুনে আশপাশের কয়েকজন মুচকি হাসলেন। কিন্তু কথাটির মধ্যেই যেন পুরো পরিস্থিতির সারকথা লুকিয়ে ছিল। অর্থাৎ, যতটা আশা করা হচ্ছে, ততটা পাওয়া যাবে না; জিনিসের মূল্য বা সামর্থ্য যতটুকু, তার বেশি দাবি করলে তা বাস্তবসম্মত নয়।

গ্রামবাংলার মানুষের কথাবার্তার এমন সৌন্দর্যই আলাদা। তারা অনেক সময় দীর্ঘ বক্তৃতা না দিয়ে একটি মাত্র প্রবাদ বা প্রচলিত কথার মধ্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে ফেলেন।
“অতো গুড় তো আধসের না”— কথাটি শুধু জমি কেনাবেচার দরদামে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের নানা ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। কেউ যদি সামর্থ্যের চেয়ে বেশি দাবি করেন, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্য চান কিংবা অল্প কাজের বিনিময়ে অনেক কিছু পাওয়ার আশা করেন—তখনও গ্রামের মানুষ হাসতে হাসতে বলে ওঠেন, “অতো গুড় তো আধসের না!”

এই কথাগুলো আমাদের গ্রামীণ জীবনের অমূল্য সম্পদ। এগুলো কোনো অভিধানের পাতায় শুধু শব্দ হয়ে পড়ে থাকে না; মানুষের মুখে মুখে, হাসি-ঠাট্টায়, ঝগড়া-বিবাদে, দরদামে আর প্রতিদিনের জীবনযাপনে বেঁচে থাকে।

গ্রামের বয়স্ক মানুষদের মুখে এমন কথা শুনলে মনে হয়, আমরা যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো এক সময়ের কাছে ফিরে গেছি। যে সময়ে মানুষের কথাবার্তায় ছিল সরলতা, রসবোধ আর জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ। অল্প কথায় বড় কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাদের।

আজকের দিনে আমরা আধুনিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছি। বদলে যাচ্ছে গ্রাম, বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাপন, বদলে যাচ্ছে কথাবার্তার ধরনও। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর প্রযুক্তির ভিড়ে অনেক পুরোনো প্রবাদ-প্রবচন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

তবুও কোনো এক গ্রামীণ বাজারে, চায়ের দোকানের আড্ডায়, উঠানের গল্পে কিংবা জমিজমার দরদামে হঠাৎ যখন শুনি—

“অতো গুড় তো আধসের না!”

তখন মনে হয়, আমাদের শেকড় এখনো পুরোপুরি শুকিয়ে যায়নি। এইসব কথার মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে আমাদের গ্রামবাংলা। লুকিয়ে আছে মাটির গন্ধ, মানুষের হাসি-কান্না, অভিজ্ঞতার নির্যাস আর সহজ-সরল জীবনবোধ।

তাই এসব প্রচলিত কথা শুধু হাসির কথা নয়—এগুলো আমাদের লোকজ সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো এই কথাগুলোই একদিন হয়তো আমাদের অতীতকে চিনিয়ে দেবে। আর সেই কারণেই মনে হয়—

গুড় যতই মিষ্টি হোক, মাপ কিন্তু আধসেরের বেশি নয়। আর জীবনের প্রত্যাশাও যেন সামর্থ্যের সীমা না ছাড়ায়। গ্রামবাংলার মানুষ তাই হাসতে হাসতেই বলে—

“অতো গুড় তো আধসের না!”

লেখক: সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১২০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন