নো বলে ছক্কা!
শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ক্রিকেটে ‘নো বলে ছক্কা’—শুনতেই যেন আনন্দের! ব্যাটসম্যানের জন্য এটি বাড়তি এক সুযোগ, সঙ্গে ছয় রানের প্রাপ্তি। খেলার মাঠে এমন সুযোগ এলে কেউ নিশ্চয়ই তা হাতছাড়া করতে চান না। বরং সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে বড় শট খেলাই ব্যাটসম্যানের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু জীবনের মাঠে?
কাল রাতে বয়সে আমার চেয়ে জুনিয়র এক তরুণের সঙ্গে জরুরি কিছু বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা চলছিল। নানা প্রসঙ্গের মধ্যে হঠাৎ সে একটি চমৎকার কথা বলল—“সমাজের এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা নো বলে ছক্কা হাঁকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।”
কথাটি শুনে থমকে গেলাম। ক্রিকেটের একটি শব্দবন্ধ কী অসাধারণভাবে আমাদের সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের একটি বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরতে পারে—ভাবতেই ভালো লাগল।
সত্যিই তো, ব্যক্তিজীবনেও কেউ কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। কখন কোথায় নিয়মের একটু ফাঁক আছে, কোথায় কারও দুর্বলতা, কোথায় কারও সরলতা, কোথায় পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া যায়—সেদিকে তাঁদের তীক্ষ্ণ নজর। সুযোগ পেলেই ব্যাট চালিয়ে দেন। আর সেই ব্যাটে কখনো কখনো এমন ছক্কা আসে, যার শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায়!
সমাজের চারপাশে একটু চোখ মেললেই এমন মানুষ দেখা যায়। কারও বিপদকে নিজের লাভের সিঁড়ি বানানো, অন্যের বিশ্বাসকে পুঁজি করে সুবিধা নেওয়া, কারও সরলতাকে দুর্বলতা মনে করা, প্রয়োজনের সময় ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা আর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে দূরে সরে যাওয়া—এসবও এক ধরনের ‘নো বলে ছক্কা’।
কেউ কেউ আবার অন্যের পরিশ্রমের ফল নিজের কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরতেও বেশ দক্ষ। কেউ সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন, কখন অন্যের তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে নিজে একটু ওপরে উঠে যাওয়া যায়। কেউ আবার সম্পর্ক, পরিচয় কিংবা বিশ্বাসকে ব্যবহার করেন নিজের স্বার্থে। তাঁদের কাছে নৈতিকতা অনেক সময় পরিস্থিতিনির্ভর, আর সুযোগই সবচেয়ে বড় সত্য।
তবে ক্রিকেট আর জীবনের ‘নো বলে ছক্কা’র মধ্যে একটি বড় পার্থক্য আছে।
ক্রিকেটে নো বলের ওপর ছক্কা হাঁকালে ব্যাটসম্যানের স্কোর বাড়ে, দল লাভবান হয়। সেখানে এটি খেলারই অংশ। কিন্তু জীবনে অন্যের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ছক্কা হাঁকানোকে সাফল্য বলা যায় না। সেটি হয়তো সাময়িক অর্জন এনে দেয়, কিন্তু মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি করে, তার হিসাব কোনো স্কোরবোর্ডে ওঠে না।
আজ যে মানুষটির সরলতার সুযোগ নিয়ে আপনি এগিয়ে গেলেন, কাল হয়তো সেই মানুষটির কাছেই আপনার প্রয়োজন হতে পারে। আজ যে বিশ্বাসকে আপনি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করলেন, কাল সেই বিশ্বাসের অভাবই হয়তো আপনাকে একা করে দেবে।
জীবন তাই শুধু সুযোগ নেওয়ার খেলা নয়; জীবন সুযোগ দেওয়ারও খেলা। কারও বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, কারও যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়া, অন্যের প্রাপ্যটুকু তাকে বুঝিয়ে দেওয়া, কারও সরলতাকে দুর্বলতা না ভাবা—এসবও জীবনের বড় বড় অর্জন।
আমাদের সমাজে এখন সাফল্যকে অনেক সময় শুধু ফল দিয়ে বিচার করা হয়। কে কত দ্রুত ওপরে উঠল, কে কত অর্থ করল, কে কত বড় পদে গেল—এসবই যেন সাফল্যের মাপকাঠি। কিন্তু কীভাবে সে সেখানে পৌঁছাল, কার হাত ধরে উঠল, কাকে পেছনে ফেলে উঠল, কার বিশ্বাস ভাঙল—সেসব প্রশ্ন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।
অথচ জীবনের আসল স্কোরবোর্ড অন্য জায়গায়।
সেখানে হিসাব হয়—আপনি কজন মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, কজন মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, আপনার কারণে কজন মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে, আর কতজন মানুষ আপনার আচরণে কষ্ট পেয়েছেন।
সময়ের সঙ্গে টাকা-পয়সা, পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা সাময়িক সাফল্যের অনেক হিসাবই মুছে যায়। কিন্তু মানুষের মনে আপনার ব্যবহার থেকে যায়। থেকে যায় আপনার সততা, আপনার মানবিকতা, আপনার দেওয়া আস্থা এবং আপনার রেখে যাওয়া স্মৃতি।
তাই খেলার মাঠে ‘নো বলে ছক্কা’ হোক আনন্দের, উচ্ছ্বাসের। কিন্তু জীবনের মাঠে অন্যের অসহায়ত্বকে ‘নো বল’ ভেবে তার ওপর ছক্কা হাঁকানোর প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
জীবনে সুযোগ আসবে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে—কিন্তু কাউকে ঠকিয়ে নয়, কারও বিশ্বাস ভেঙে নয়, অন্যের প্রাপ্য কেড়ে নয়।
বরং চেষ্টা হোক—সুযোগ সন্ধানী হওয়ার নয়, সুযোগ সৃষ্টিকারী হওয়ার।
কারণ অন্যের মাথার ওপর দিয়ে উঠে যাওয়া হয়তো সাফল্য; কিন্তু কাউকে সঙ্গে নিয়ে ওপরে ওঠাই প্রকৃত অর্জন।
কাল রাতের সেই তরুণের একটি ছোট্ট কথা তাই অনেক বড় ভাবনার দরজা খুলে দিল—
“নো বলে ছক্কা হাঁকিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু সেই ছক্কা মানুষকে কতটা দূরে সরিয়ে দিল—তার হিসাবও একদিন দিতে হয়।”
জীবনের খেলায় শেষ পর্যন্ত জয়ী সেই মানুষই, যে স্কোরবোর্ডে সবচেয়ে বেশি রান নয়—মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২০ বার পড়া হয়েছে