১৫ আগস্ট: বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়
শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৫৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ ১৫ আগস্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এই দিনটি এবার আগের মতো উৎসবমুখর নয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় গত দুই বছর ধরেই রাষ্ট্রীয় বা দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই এই দিনটিতে।
কোনো ইতিহাসকে আমরা বাদ দিতে পারি না। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে প্রাধান্য দিয়ে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের ইতিহাসকে ঢেকে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা চলছে। একটি রাজনৈতিক চক্র থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তারা ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গৌণ করে তুলতে চায়। এই প্রবণতা উদ্বেগজনক।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল অস্বীকারযোগ্য নয়। তখন দলটির হাল ধরেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে দেশ ও জনগণের সঙ্গে আচরণ করেছে আওয়ামী লীগ, তা জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ১৭ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি, গণতন্ত্রহীনতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্বাচন বিহীন দেশ পরিচালনা—এসব অভিযোগে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
গত ১৭ বছর ধরে এই দিনটিকে ঘিরে আওয়ামী লীগ আয়োজন করত নানা অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করেও ছিল ব্যাপক আয়োজন। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দলটি নিষিদ্ধ হওয়ায় এবারও গত বছরের মতো কোনো সরকারি বা দলীয় অনুষ্ঠান নেই।
১৫ আগস্টের ঘটনার পর শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনামলে যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, তার প্রতিবাদে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ৩২ নম্বর রোডের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের খবর এসেছে। এটি জনগণের জমে থাকা ১৭ বছরের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দেওয়া কোনোদিনই সম্ভব নয়। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা মূলত তার কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলের দলের অসৎ রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের কারণেই।
যদিও বাংলাদেশে সরকারি বা দলীয় কোনো আয়োজন নেই, তবুও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে অনুষ্ঠান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এলাকায় বাংলাবন্ধু ফাউন্ডেশন আজ একটি স্মরণসভার আয়োজন করেছে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর জীবন, নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। কিন্তু এই দিনটিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করে দেশের ঐতিহাসিক চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করা উচিত নয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাজনীতি করা যাবে, কিন্তু তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে না। ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করার কোনো অপচেষ্টা সফল হবে না। বাংলাদেশের জনগণ তাদের ইতিহাসকে সম্মান জানাতে জানে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান যেমনই হোক, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরস্মরণীয়। জনগণের ক্ষোভের কারণেই আজ এই দিনটিতে নীরবতা, কিন্তু ইতিহাসের ভারে এই নীরবতাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় স্মরণ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২৩ বার পড়া হয়েছে