জামায়াত-জোট বিতর্কের জের, নতুন দল গঠনের প্রস্তুতিতে এনসিপি ত্যাগীরা
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ ৩:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেওয়ার পর থেকে দলটির অভ্যন্তরে যে ভাঙন শুরু হয়েছিল, তার ফলাফল এখন নতুন মোড় নিচ্ছে বলে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলছে, এনসিপি ছেড়ে আসা নেতা, কিছু জুলাই যোদ্ধা এবং ছাত্রনেতাদের একটি অংশ গোপনে নতুন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছেন।
বিরোধের সূত্রপাত
গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই এনসিপির অন্তত ১৪-১৭ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেন, আর ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে স্মারকলিপি দিয়ে আপত্তি জানান । পদত্যাগকারীদের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা, যিনি পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে যান, এবং খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীনসহ আরও অনেকে। পদত্যাগপত্রে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক আপস এবং গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ তুলেছিলেন।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও জোট ঘোষণার পরপরই ফেসবুকে স্পষ্ট করে দেন, “আমি এই এনসিপির অংশ নই,” যদিও জোটের অধীনে তাকেও প্রার্থিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
জামায়াতের ‘বি-টিম’ অভিযোগ
দলত্যাগী নেতা ও জুলাই যোদ্ধাদের একাংশের অভিযোগ, সংসদে এনসিপির প্রাপ্ত আসনগুলো মূলত জামায়াতের আসন-সমঝোতার সুবাদেই এসেছে—জামায়াতের সহায়তা না পেলে দলটি কার্যত কোনো আসনই পেত না। তাদের ভাষায়, নির্বাচনের পর থেকে এনসিপি ক্রমেই জামায়াতের “বি-টিম” হিসেবে আচরণ করছে এবং দেশজুড়ে দলটির কর্মকাণ্ডে জামায়াতের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিরোধী দলের চিফ পদ পেয়েও ত্যাগীদের প্রতি নির্লিপ্ততা
সূত্রমতে, নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রধান পদ পাওয়ার পরও এনসিপির বর্তমান নেতৃত্ব দলত্যাগী নেতাদের প্রতি এখনো কোনো সমঝোতার উদ্যোগ নেয়নি। যারা জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেছেন, জামাত-ঘনিষ্ঠতার কারণে দলে যোগ দেননি, অথবা পদ ধরে রেখেও কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন—তাদের কাউকেই বর্তমান নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছে না। ত্যাগী নেতাদের ফিরিয়ে আনার জন্য দলের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বা সমঝোতা প্রস্তাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি, যা তাদের মধ্যে গভীর অভিমান তৈরি করেছে। মূলত এই দীর্ঘস্থায়ী উপেক্ষা ও যোগাযোগহীনতাই ত্যাগী ও অভিমানী এই নেতাদের বিকল্প রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
নতুন সংগঠনের প্রস্তুতি
সূত্র অনুযায়ী, এই উদ্যোগ এখন আর নিছক আলোচনার স্তরে নেই—রীতিমতো গোপনীয়তা বজায় রেখে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন এনসিপি থেকে পদত্যাগী একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা, দলে থেকেও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো সামান্তা শারমিন ও মনিরা শারমিনের মতো নেতৃত্ব, পাশাপাশি এনসিপিতে কখনো যোগ না দেওয়া মাহফুজ আলমের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কিছু জুলাই যোদ্ধাও। প্রসঙ্গত, মাহফুজ আলম ইতিমধ্যেই “অল্টারনেটিভস” নামে একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছেন, যা এই নতুন উদ্যোগের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া নারী সদস্যদের এমন প্রতিক্রিয়া এনসিপিকে গভীর সংকটে ফেলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জামায়াত-এনসিপি ঐক্যের প্রকৃত লাভ-ক্ষতি নিয়েও গণমাধ্যমে ব্যাপক বিশ্লেষণ চলছে, বিশেষত ভোটের পর সরকার গঠন ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সমঝোতার অস্পষ্টতা এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রস্তাবিত এই সংগঠনটি নিজেদের এনসিপির “মূল আদর্শিক ধারক” হিসেবে দাবি করে জনসমক্ষে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিনক্ষণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রকাশ্য বিবৃতি বা দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাই সমীচীন হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
১৫৬ বার পড়া হয়েছে