টিএফআই সেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও আটকের তথ্য পাওয়া গেছে: চিফ প্রসিকিউটর
শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ৯:১৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
র্যাব-১ কার্যালয়ের কথিত গোপন বন্দিশালা ‘টিএফআই সেল’-এ বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাঁকে ভারতে নেওয়া হয়েছিল—প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের নিয়ে র্যাব-১-এর টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে শনিবার (১ আগস্ট) সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে টিএফআই সেলের কয়েকটি নির্দিষ্ট কক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও রয়েছে।
আমিনুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যবিধির রুল ৪৬-এ, রোম সংবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রয়োজনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল এই পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আয়নাঘর’ নিয়ে এতদিন বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও বিচারকদের শুধু নথি ও সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর না করে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে। পরিদর্শনের পর্যবেক্ষণ একটি মেমোরেন্ডামে সংরক্ষণ করা হবে, যা মামলার বিচারিক নথির অংশ হবে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, টিএফআই সেলের ভবনের ভেতরে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২২টি কক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে। কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের শুয়ে থাকাও কঠিন। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষে অনেক ব্যক্তিকে হাত ও চোখ বেঁধে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেককে পরে বিভিন্ন মামলায় আদালতে হাজির করা হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক গুম হওয়া ব্যক্তির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীসহ অনেকের নাম রয়েছে। গত বছরের আগস্টের পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফিরে এসে যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেগুলোর সঙ্গে ঘটনাস্থলের মিল পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, ব্যারিস্টার আরমানকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেছেন, তদন্তকারীরা সেটিও শনাক্ত করেছেন। একইভাবে সালাহউদ্দিন আহমদকে র্যাব-১-এর এই স্থাপনায় আটকে রাখার এবং পরে ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে।
পরিদর্শনের পর ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত আরেকটি গোপন আটককেন্দ্র ‘জেআইসি’ পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী শনিবার বিচারকেরা সেখানে যাবেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
আইনগত বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বিধান রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারাতেও একই ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে আয়নাঘরে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য, অবৈধ আটক, গুম, নির্যাতন ও হত্যার মতো অভিযোগগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এসব অভিযোগের বিচার ও তদন্ত চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, পরিদর্শনের সময় ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন দেয়াল তুলে আগের কাঠামো আড়াল করার আলামত পাওয়া গেছে। তদন্তের শুরুতে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে স্থাপনার মিল না পাওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়। পরে কয়েকটি স্থানে নির্মিত নতুন দেয়াল সরানো হলে আড়ালে থাকা কক্ষগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ভবনের নিচতলার একটি কক্ষকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রীয় বৈধ কোনো প্রয়োজনে ব্যবহার না হলে এতগুলো ছোট কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।
তিনি বলেন, এসব কক্ষের অস্তিত্ব গোপন করার জন্য যারা পরে দেয়াল নির্মাণ বা পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ভূমিকাও তদন্ত করা হচ্ছে। প্রমাণ নষ্ট বা আড়াল করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে প্রসিকিউশন কাজ করছে। তাঁর দাবি, আয়নাঘরের ঘটনাগুলো কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং তদন্তে উঠে আসা বাস্তব ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি যাঁদের নির্দেশে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতির আওতায় তদন্ত করা হচ্ছে।
১১৬ বার পড়া হয়েছে