প্রাথমিক শিক্ষক বদলি: নতুন নীতিমালার শর্ত নিয়ে শিক্ষকদের উদ্বেগ
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তবে নতুন নীতিমালায় জুড়ে দেওয়া কয়েকটি শর্তে শিক্ষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা ও শঙ্কা। বিশেষ করে ‘কোনো বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক থাকলে বদলি নয়’ এবং ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০’-এর বেশি হলে বদলির সুযোগ না থাকার শর্তটি শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার হরণ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, এবার উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে বদলি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। কিন্তু নতুন নীতিমালার কিছু কঠোর শর্তের কারণে অনেক শিক্ষক কাঙ্ক্ষিত বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র পাঁচজন করে শিক্ষক কর্মরত আছেন। এছাড়া সরকারের একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যাই নির্দিষ্ট করে পাঁচটি রাখা হয়েছে। ফলে নতুন নীতিমালার ‘পাঁচজন শিক্ষক থাকলে বদলি নয়’ শর্তের কারণে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভবিষ্যতেও বদলির সুযোগ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন।
এদিকে, দেশের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। কোথাও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ জনেরও কম, ফলে সেখানে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী মাত্র ৭-৮ জন। আবার এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রও রয়েছে অনেক বিদ্যালয়ে, যেখানে একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৭০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে কোথাও শিক্ষাসম্পদের অপচয় হচ্ছে, আবার কোথাও শিক্ষকদের ওপর পড়ছে মাত্রাতিরিক্ত চাপ।
শিক্ষকদের মতে, এই বৈষম্য দূর করার একমাত্র উপায় হলো আগে প্রচলিত থাকা ‘সমন্বিত বদলি’ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা। এতে শিক্ষার্থী কম থাকা বিদ্যালয় থেকে অতিরিক্ত শিক্ষককে শিক্ষার্থী বেশি থাকা বিদ্যালয়ে পদায়ন করা সম্ভব হবে। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, “প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সমন্বিত বদলি ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষক সংকট যেমন কমবে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও মানসম্মত শিক্ষা পাবে।”
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহেদা শারমিন জুলি জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে ২৮৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। অর্থাৎ প্রত্যেক শিক্ষককে ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। একই উপজেলার খেজুরিছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমা রানী দেব জানান, তাঁদের ৪০৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। এমন পরিস্থিতিতে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষক সমিতির নেতা জাকির হোসেন জানান, শ্রীমঙ্গল চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। আবার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার কারণেও অনেক সহকারী শিক্ষক বদলির সুযোগ পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “১:২০-এর নিচে অনুপাত থাকা বিদ্যালয়গুলো থেকে অন্তত একজন সহকারী শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া অথবা ১:৪০ অনুপাত বজায় রেখে বদলির বিধান রাখা জরুরি।”
এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকদের কাছ থেকে মৌখিকভাবে এমন অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে জানিয়েছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বদলি সংক্রান্ত উপজেলা কমিটি।”
সার্বিক বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী জানান, পাঁচজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনের বিধান রাখা হয়েছে এবং স্থানীয় বদলি কমিটিরও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আমরা বাস্তবায়ন করি। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেশি কিন্তু শিক্ষকের পদ কম, সেসব বিদ্যালয় নিয়ে খুব শিগগিরই একটি জরিপ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। এছাড়া খুব কাছাকাছি সময়ে প্রায় ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষককে পদায়ন করা হবে, যা এই সংকটের অনেকটাই সমাধান করবে।”
তবে সাধারণ শিক্ষকদের দাবি, স্থানীয় কমিটির হাতে ক্ষমতা থাকলেও নীতিমালায় বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষক বদলিতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে এবং দেশজুড়ে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের বিভ্রান্তি কমবে।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে