এইচএসসিতে ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অনুপস্থিত, বাড়ছে ড্রপআউটের শঙ্কা
সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬ ৪:২৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য বলছে, একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ। ফলে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে থেকে গেছেন। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
২ জুলাই শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে এবার পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না।
গত বছরও এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ পরীক্ষা দেননি। এক বছরের ব্যবধানে অনুপস্থিতির হার আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেননি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার। এই স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ কর্মশক্তি গঠন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু উচ্চমাধ্যমিক নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে না। একই সঙ্গে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদের মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকেরও শত শত পদ খালি থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক সংকট, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের জন্য আগেভাগে শ্রমবাজারে প্রবেশ, শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ, পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পরিবেশের অভাব।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। সরকার জানিয়েছে, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং ধাপে ধাপে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাজেট বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ও কলেজে ধরে রাখা, শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন, নিরাপদ ও ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে