সিলেটে মাদক ও অনলাইন জুয়ার জোড়া ছোবল: ধ্বংসের মুখে সীমান্ত জনপদ
সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬ ৪:৪৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সিলেটে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক প্রবেশ এবং হাতের স্মার্টফোনে অনলাইন জুয়ার রমরমায় সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর যুবসমাজ আজ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মাদক কারবারের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে খুন এবং জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পারিবারিক সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তরুণরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া নজরদারি রাখলেও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এই নীরব ধ্বংসযজ্ঞ।
সিলেটের জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদক দেশে প্রবেশ করছে। একই সাথে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজ উপায়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভনে তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার মরণনেশায়। এর ফলে সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে এক ভয়ানক ও নীরব সামাজিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জৈন্তাপুর উপজেলার খাসিয়া হাওর, শ্রীপুর, মিনাটিলা, রাবার বাগান এবং ডিবির হাওরসহ দীর্ঘ সীমান্তরেখা দিয়ে দেদারসে ঢুকছে ভারতীয় মাদক। উপজেলার পুরাতন বিদ্যুৎ অফিস এলাকাটি এখন অবৈধ ‘শিলং তীর’ খেলার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী চক্র এই জুয়া ও মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলংয়ের হাজিপুর বাজার মাদক ও চোরাচালানের প্রধান আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবাধে আসছে ভারতীয় মদ ও ইয়াবা। পাশাপাশি উপজেলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট ও বাবু৮৮-এর মতো অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, যা পরবর্তীতে তাদের চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাদকের ভয়াবহতার এক নৃশংস চিত্র দেখা গেছে কানাইঘাটে। গত ১ ডিসেম্বর সীমান্তবর্তী রাতাছড়া গ্রামে মাদক বিক্রির মাত্র ২ লাখ টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ছয়ফুল ইসলাম নামে এক তরুণকে খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া জকিগঞ্জের কুশিয়ারা নদীপথ ও কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান দেশে প্রবেশ করছে। মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা আইনশৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ইয়াবাকে ‘বিচি’ বা ‘মাল’ নামে ডাকছে।
কোম্পানীগঞ্জের উৎমা ছড়া ও কালাইরাগ সীমান্ত দিয়ে খাদ্যদ্রব্যের আড়ালে মদ-ইয়াবা প্রবেশ করছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন বাজারে মাদকসেবীদের প্রকাশ্য আড্ডা বসছে। সম্প্রতি পুলিশ ও র্যাব বিশেষ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন জুয়াড়ি ও মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বর্তমান ভয়াবহতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১২৭ বার পড়া হয়েছে