বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন
নতুন ক্যাম্পাস নয়, প্রয়োজন উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষণা
রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬ ১১:৩৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সরকার বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা
করেছে। বলা হয়েছে, সেখানে নার্সিং, মেডিকেল সায়েন্স, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর
বিভিন্ন বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ভবিষ্যতমুখী করে
তোলার লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং উচ্চাভিলাষী। বিশেষত শ্রমবাজারের দ্রুত
পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির
ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মকে উপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলার চিন্তা অবশ্যই
সময়োপযোগী।
তবে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে
যাওয়ার সুযোগ নেই: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার ঘাটতি, নাকি
বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত দুর্বলতা? বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে দেশে সরকারি ও
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চশিক্ষার
কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে আবেগ, প্রতীকী
উন্নয়ন বা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, বৈশ্বিক পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা
এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাপরিকল্পনার ভিত্তি হওয়া উচিত
রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল; সাময়িক রাজনৈতিক বিবেচনা নয়।
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান
সৃষ্টি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা। এ
কারণেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর, গবেষণামুখী এবং
জ্ঞানসৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করার প্রশ্নটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি
প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, উদ্ভাবন, সামাজিক
রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি গবেষণাগার,
গ্রন্থাগার, শিক্ষক ও গবেষকদের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ হয়ে
পড়ে, তখন বাহ্যিক বৃদ্ধি ঘটলেও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠা করতেই হলে সবার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে: বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়
কি নতুন বিভাগ খোলা, দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে, নাকি
তার প্রাণশক্তি নিহিত থাকে একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ, উচ্চমানের
শিক্ষক এবং শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির মধ্যে? বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের মর্যাদার ভিত্তি ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং উৎকৃষ্ট শিক্ষক,
মৌলিক গবেষণা, মেধার মূল্যায়ন এবং স্বাধীন জ্ঞানচর্চা। তাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান।
জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে
প্রতীয়মান হয় যে, তাদের প্রকৃত শক্তি আকর্ষণীয় ব্র্যান্ডিং বা আধুনিক অবকাঠামোয় নয়; বরং
প্রশাসনিক নেতৃত্ব, শিক্ষকসমাজ, গবেষক, গবেষণার পরিধি এবং শক্তিশালী একাডেমিক সংস্কৃতিতে
নিহিত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় তার উৎপাদিত জ্ঞান, গবেষণার
প্রভাব, উদ্ভাবনের সক্ষমতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,
বিশ্বের বহু খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের যাত্রার শুরুতে আজকের মতো সমৃদ্ধ অবকাঠামোর অধিকারী
ছিল না। কিন্তু তারা শুরু থেকেই মেধাবী শিক্ষক, গবেষণা এবং একাডেমিক স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ
অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ফলস্বরূপ তারা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ কেবল উচ্চ ডিগ্রি বা পরীক্ষার ফলাফলের ওপর
নির্ভর করে না; বরং গবেষণার মৌলিকত্ব, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, গবেষণা নেতৃত্ব, বৈশ্বিক
সহযোগিতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বাস্তব অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। একই সঙ্গে
একাডেমিক সততা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই
হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল শিক্ষাদানেই নয়,
জ্ঞান উৎপাদন ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনা করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি
এমন মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও কাঠামো নির্মাণ করতে পেরেছি? নিঃসন্দেহে দেশের
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল এবং গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষক রয়েছেন, যাঁদের
ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সাফল্য এবং
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়। সামগ্রিকভাবে এখনো গবেষণাকেন্দ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতি,
পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণাভিত্তিক পদোন্নতি
ব্যবস্থা এবং সুস্থ একাডেমিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ সীমিত পরিসরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই
শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনে গবেষণাগত উৎকর্ষের চেয়ে অন্যান্য
বিবেচনা বেশি প্রভাব বিস্তার করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদন ক্ষমতাকে দুর্বল
করে। ফলে বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ের শিক্ষকসমাজ ও গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে
তোলার কাজ কোনো স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রকল্প নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয়
বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের বিষয়। নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন বিভাগ খোলার মাধ্যমে এই
ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত
উন্নয়ন, পোস্টডক্টরাল গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান, জবাবদিহিমূলক একাডেমিক মূল্যায়ন
ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান অবকাঠামোর আলোকে মূল্যায়ন করার প্রবণতা দেখাই। নতুন
ভবন, সুবিশাল ক্যাম্পাস, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা নতুন বিভাগ সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের
দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে প্রতিভাত হয়। কারণ এগুলো চোখে দেখা যায় এবং রাজনৈতিক সাফল্যের
প্রদর্শনী হিসেবেও উপস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস ও শিক্ষাদর্শন উভয়ই আমাদের স্মরণ করিয়ে
দেয় যে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি এমন কিছু অদৃশ্য কিন্তু মৌলিক উপাদানের ওপর
প্রতিষ্ঠিত, যা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে। গবেষণার স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, মুক্ত বিতর্কের
পরিবেশ, জ্ঞান উৎপাদনের সংস্কৃতি এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি।
জার্মান চিন্তাবিদ ও শিক্ষাদার্শনিক ভিলহেলম ফন হুমবোল্ট (১৭৬৭-১৮৩৫) যে আধুনিক
গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল গবেষণা ও শিক্ষার
অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সেই ধারণা অনুসারে, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি
একই সঙ্গে জ্ঞানস্রষ্টা, গবেষক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের বাহক। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার শিক্ষকদের চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপ্তি, গবেষণার বিষয়বস্তু ও মান এবং
জ্ঞানসৃষ্টিতে তাদের একাগ্রতা ও অবদানের মাধ্যমে। ভবনের উচ্চতা নয়, জ্ঞানের উচ্চতাই একটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা নির্ধারণ করে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট
হয়ে উঠছে। দেশের অনেক যোগ্য শিক্ষক, গবেষক এবং সম্ভাবনাময় তরুণ একাডেমিক বিভিন্ন কারণে
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানে পেশাগত ভবিষ্যৎ
খুঁজছেন। এমন কি অনেকেই বিদেশী পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। উচ্চশিক্ষা রাজনীতিকীকরণ,
গবেষণা তহবিলের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া,
একাডেমিক স্বাধীনতার সংকট, দুর্বল প্রণোদনা এবং পদোন্নতিতে গবেষণার তুলনায় অন্যান্য বিবেচনার
প্রভাব অনেক মেধাবী ব্যক্তিকে বিকল্প পরিবেশের দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
প্রায়ই তাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে:
বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কীভাবে অধিক গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং আন্তর্জাতিক
মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়? কারণ নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে বিদ্যমান
প্রতিষ্ঠানগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অনেক ক্ষেত্রেই অধিক ফলপ্রসূ, সাশ্রয়ী এবং
টেকসই বিনিয়োগ।
আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের আলোচনা তাই নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন
কিংবা নতুন বিষয় খোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে
শিক্ষক নিয়োগের কঠোর ও মেধাভিত্তিক মানদণ্ড এবং সেগুলো অনুসরণের নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা,
গবেষণার জন্য সহায়ক পরিবেশ, একাডেমিক স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক
স্বায়ত্তশাসন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং গবেষণাকেন্দ্রিক পদোন্নতি ব্যবস্থা। একই
সঙ্গে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় শিক্ষক ও গবেষক উন্নয়ন কৌশল। বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক গবেষণা
সহযোগিতা সম্প্রসারণ, পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারের
আধুনিকীকরণ এবং বিদেশে প্রশিক্ষিত গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরে কাজ করার জন্য
প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশ্বের যেসব দেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও
উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে, তারা প্রথমেই তাদের মানবসম্পদে বিনিয়োগ করেছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি হলো ‘মানব পুঁজি’ (হিউম্যান
ক্যাপিটাল); আর বিশ্ববিদ্যালয় সেই মানব পুঁজি গঠনের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অবকাঠামোগত কিংবা রাজনৈতিক প্রকল্প নয়; এটি একটি
বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম), যেখানে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার,
একাডেমিক স্বাধীনতা এবং জ্ঞানসৃষ্টির সংস্কৃতি পরস্পরকে শক্তিশালী করে। এমন পরিবেশ রাতারাতি
গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ,
নীতিগত স্থিতিশীলতা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বাংলাদেশে
আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। তবে সেই স্বপ্ন
বাস্তবায়নের জন্য নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ভবন নির্মাণ বা বিভাগ খোলার চেয়ে বেশি জরুরি
হলো বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাবান্ধব, মেধাকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত
জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নেতৃত্বে মেধা ও গবেষণাগত
উৎকর্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে; একই সঙ্গে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
সম্প্রসারণ এবং গবেষকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসের শিক্ষা
স্পষ্ট, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি ইট-পাথর-বালি, কংক্রিট বা প্রশাসনিক আদেশে নির্মিত হয়
না; তা নির্মিত হয় বিশ্বমানের শিক্ষক, গবেষক, মুক্ত জ্ঞানচর্চা এবং উৎকর্ষের প্রতি অবিচল
অঙ্গীকারের ওপর। যে জাতি তার উচ্চশিক্ষায় মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়,
ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত সেই জাতিই অর্জন করে।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
১৪৪ বার পড়া হয়েছে