আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়, বলছেন বিশ্লেষকেরা
শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬ ৭:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, অপরাধ দমনে ধারাবাহিক পদক্ষেপ, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় জোরদার করা গেলে দেশের উন্নয়ন আরও টেকসই হবে।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ে না, কর্মসংস্থানও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায় না। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আধুনিক মালয়েশিয়ার উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রমও গতিশীল হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, শিল্পকারখানা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতার অভিযোগ ওঠে। এর প্রভাব অর্থনীতি ও জনজীবনেও পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের বড় একটি প্রত্যাশা ছিল শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ১২৯টি এবং চুরির ২ হাজার ২১৪টি ঘটনার তথ্য উঠে আসে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির (বিসিআরএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫ হাজার ৯৯৮টি ঘটনার তথ্যও সংগঠনটি প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকদের দাবি, পূর্ববর্তী সময়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম আরও সমন্বিত হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক আইন কর্মকর্তার একযোগে পদত্যাগের ঘটনায় বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। চাঁদাবাজি, সহিংসতা, শিল্পকারখানায় হামলা কিংবা সাংবাদিক নির্যাতনের মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাঁদের ভাষ্য, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে অপরাধের প্রকৃতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে তাঁরা মনে করেন।
১৪৭ বার পড়া হয়েছে