অনলাইন জুয়ার বিস্তারে সামাজিক বিপর্যয়, কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে
মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
একসময় জুয়া সীমাবদ্ধ ছিল গোপন আসর বা নির্দিষ্ট আড্ডাকেন্দ্রিক পরিসরে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে এখন তা পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়।
স্মার্টফোন, বিভিন্ন অ্যাপ এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে কেন্দ্র করে দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার নেটওয়ার্ক। এতে কিশোর-তরুণ, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরাও যুক্ত হচ্ছেন এই ভয়াবহ আসক্তিতে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইন জুয়ার কারণে আর্থিক ক্ষতি, পারিবারিক ভাঙন, অপরাধপ্রবণতা এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অনেকেই হারাচ্ছেন ব্যবসার মূলধন, জমিজমা ও পারিবারিক সঞ্চয়। কেউ কেউ চরম হতাশায় জীবনও শেষ করে দিচ্ছেন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনলাইন জুয়া কেন্দ্রিক প্রতারণা ও ঋণের চাপে আত্মহত্যা, সহিংসতা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও মূল নিয়ন্ত্রকরা অধিকাংশ সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্ম—যেমন সিকে৪৪৪, সিভি৬৬৬, নগদ৮৮, ক্রিক্রিয়া, ওয়ানএক্সবেট, বাবু৮৮ ও লাইনবেট—ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করায় লেনদেন আরও সহজ হয়ে পড়েছে। ফলে খুব সহজেই নতুন ব্যবহারকারীরা এই জগতে প্রবেশ করছে।
কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, আগে ডলারভিত্তিক লেনদেনের কারণে অংশগ্রহণ সীমিত থাকলেও এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষও দ্রুত এতে জড়িয়ে পড়ছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এক সরকারি চাকরিজীবীর অনলাইন জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে ঋণের চাপে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একইভাবে বিভিন্ন জেলায় অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট পারিবারিক বিরোধ, হত্যা ও আত্মহত্যার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার জানান, অনলাইন অপরাধ দমনে প্রতিটি থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা ও ভয় থেকে অভিযোগ করতে অনাগ্রহী হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তরুণদের মধ্যে জুয়ার আসক্তি বাড়ায় চুরি, মাদকাসক্তি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই জুয়ার টাকা জোগাতে পরিবারের সম্পদ বিক্রি বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে সংগঠিত এজেন্ট নেটওয়ার্ক। মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা মিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে। এমনকি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া সেলিব্রেটি ভিডিওর মাধ্যমেও প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার বিদেশে অবস্থান করায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সীমান্তবর্তী ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় এলাকাগুলোতে এ ধরনের নেটওয়ার্ক বেশি বিস্তৃত।
মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার বিস্তার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্থানীয়ভাবে শতাধিক তরুণ এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। মুজিবনগর এলাকায় অনলাইন জুয়ার অর্থে হঠাৎ করে বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি এই সিন্ডিকেট পরিচালনায় যুক্ত থাকলেও গ্রেপ্তারের পর অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ানো জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
তাদের মতে, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসন একসঙ্গে কাজ না করলে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
১৪৮ বার পড়া হয়েছে