যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগোর মসজিদে ভয়াবহ বন্দুক হামলা: নিহত ৫
মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬ ৮:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান দিয়েগোতে একটি ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে দুই কিশোর বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন।
পরবর্তীতে হামলাকারী ওই দুই কিশোর নিজেদের ওপর গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করে। স্থানীয় সময় সোমবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ক্লেইরমন্ট এলাকায় অবস্থিত সান দিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় এই মসজিদে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই হামলাটিকে একটি ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ (Hate Crime) হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে।
হামলার শিকার যারা ও রক্ষীর বীরত্ব ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো মসজিদে গুলির খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। সেখানে ভবনের সামনে গুলিবিদ্ধ তিনজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিহতদের মধ্যে মসজিদের একজন নিরাপত্তারক্ষীও রয়েছেন। সান ডিয়েগো পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ওই নিরাপত্তারক্ষী নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তার এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কারণেই আজ অনেক মানুষের প্রাণ বেঁচেছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ এখনো নিহত তিনজনের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
মসজিদে হামলার পরপরই পুলিশ খবর পায়, কাছেই একটি গাড়ি থেকে একজন মালিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। পরে মসজিদ থেকে কিছুটা দূরে একটি গাড়ির ভেতর থেকে সন্দেহভাজন দুই হামলাকারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের তথ্যমতে, হামলাকারী দুজনের একজনের বয়স ১৭ এবং অপরজনের বয়স ১৮ বা ১৯ বছর। তারা নিজেদের গুলিতেই আত্মহত্যা করেছে।
শিশুদের নিরাপদ সরিয়ে নেওয়া ও স্কুল লকডাউন ইসলামিক সেন্টারের ওই সুবিশাল ক্যাম্পাসের ভেতরেই শিশুদের জন্য ‘আল রশিদ স্কুল’ নামের একটি ইসলামী বিদ্যালয় রয়েছে। হামলার সময় সেখানে শিশুরা ক্লাসে অবস্থান করছিল। ঘটনার পর ওপর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে, তখন আতঙ্কিত শিশুরা একে অপরের হাত ধরে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে আশেপাশের অন্যান্য স্কুলগুলোও লকডাউন করে দেওয়া হয়।
হামলার পূর্বাভাস ও পুলিশের তৎপরতা হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এক সন্দেহভাজনের মা পুলিশকে ফোন করে জানান যে, তার ছেলে কয়েকটি বন্দুক ও নিজের গাড়ি নিয়ে অপর এক সঙ্গীর সাথে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। তারা দুজনই সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ছদ্মবেশী (ক্যামোফ্লেজ) পোশাক পরিহিত ছিল। বাড়ি থেকে পালানো ওই তরুণের ঘরে একটি চিরকুট পাওয়া যায়, যাতে সাধারণ বিদ্বেষমূলক ও উগ্র কথাবার্তা লেখা ছিল। তবে সেখানে নির্দিষ্ট কোনো মসজিদ, স্থান বা ব্যক্তির ওপর হামলার কোনো হুমকি ছিল না।
পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল জানান, ওই তরুণের আচরণ কেবল ‘আত্মঘাতী’ মানুষের মতো ছিল না, বরং তা বড় কোনো নাশকতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। খবর পেয়ে তদন্তকারীরা স্থানীয় একটি হাই স্কুলে যান (যেখানে দুই কিশোরের একজন পড়ত) এবং একটি শপিং মলেও তল্লাশি চালান, যেখানে তাদের গাড়ির অবস্থান ট্র্যাক করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, পুলিশ যখন এক সন্দেহভাজনের মায়ের সাথে কথা বলছিল, ঠিক তখনই কিছুটা দূরে মসজিদে এই গুলির ঘটনা ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) বর্তমানে ঘটনাটির তদন্ত করছে এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছে তথ্য চেয়েছে। সিবিএস-এর বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, সন্দেহভাজনের মায়ের পাওয়া চিরকুটের সূত্র ধরেই এফবিআই ঘটনাটিকে ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ হিসেবে তদন্ত করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি একটি সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র থেকে অন্তত ৩০ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনেছেন। সাথে সাথে তিনি ৯১১ নম্বরে কল করেন এবং ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তিনি স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, "ভাগ্য ভালো যে ঘটনাটি শুক্রবার ঘটেনি, কারণ ছুটির দিন হওয়ায় সেদিন রাস্তায় ও মসজিদে মানুষের উপচেপড়া ভিড় থাকে।"
নেতৃবৃন্দের তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগোর পরিচালক ইমাম ত্বহা হাসান। তিনি বলেন, “কোনো উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য ও আপত্তিকর। এই স্থাপনাটি একটি উপাসনালয়, কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়।”
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এক বিবৃতিতে এই ঘটনায় তিনি ‘স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি এমন একটি জায়গা যেখানে পরিবার ও শিশুরা একত্রিত হয়, প্রতিবেশীরা শান্তিতে ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে উপাসনা করে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা ভীতি প্রদর্শন ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য সহ্য করবে না।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে একটি ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি প্রাথমিক কিছু তথ্য পেয়েছি। আমরা এই বিষয়টি খুব জোরালোভাবে খতিয়ে দেখব।”
১১৯ বার পড়া হয়েছে