সর্বশেষ

সারাদেশ

রূপপুর প্রকল্পের পাশেই ভয়াবহ বালু লুট, ঝুঁকিতে পারমাণবিক কেন্দ্র

নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া

বৃহস্পতিবার , ১৪ মে, ২০২৬ ১২:৪৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চলছে ভয়াবহ বালু লুটের মহোৎসব। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অদূরে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রতিঘণ্টায় শতাধিক ট্রাক বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নে স্বশস্ত্র ক্যাডারদের পাহারায় প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ট্রাকে অর্ধকোটি টাকার বালু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করা হচ্ছে। এতে মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বালু সিন্ডিকেট।

অভিযোগ রয়েছে, মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট আধুনিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, হার্ডিং ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু।

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা জানিয়েছে, কুষ্টিয়ার পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ অনুমতি বা ইজারা নেই। ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদীতে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কোথাও বালু উত্তোলনের খবর পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত সোমবারও অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, কেপিআই জোন এলাকায় বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হার্ডিং ব্রিজসহ একই অঞ্চলে তিনটি কেপিআই জোন রয়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন পার্শ্ববর্তী স্থাপনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই এসব স্থাপনার আশপাশে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তবে সরেজমিনে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় যেন “দেশের মধ্যে আরেক দেশ” গড়ে তুলেছে বালুখেকো চক্র। প্রশাসন বা গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেলেই হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে সেখানে যেতে ভয় পান অনেকে।

উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় অন্তত ১০টি শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর চর কেটে অবৈধভাবে ফিলিং বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শত শত ট্রাকে করে বালু দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে এবং তীরবর্তী এলাকায় মজুত করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বিভক্ত স্থানীয় বিএনপির একাধিক গ্রুপ বালু লুটে একাট্টা হয়েছে। দ্বিতীয় সারির নেতা ও স্বশস্ত্র ক্যাডাররা মাঠে থাকলেও বড় অংশের অর্থ যাচ্ছে শীর্ষ নেতাদের পকেটে। প্রশাসন সব জানলেও প্রভাবশালী নেতাদের সম্পৃক্ততার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহজাহান আলী বলেন, যারা বালু তুলছে তারা সবাই আহ্বায়কের লোকজন। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যদিকে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলু দাবি করেন, যারা বালু উত্তোলন করছে তারা সরকারি দলের লোক। তাদের ঠেকানোর মতো ক্ষমতা বিএনপির নেই। প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তবে এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও স্বীকার করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি নদী কেটে বালু উত্তোলনের ফলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার যেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তার মাত্র ৯০০ মিটারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত। এছাড়া ৪০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে ৪১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। মাত্র ৬০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে হার্ডিং ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু। কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়কও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

গবেষক, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, অবৈধ ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে নোনা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এতে নদী ও তীরবর্তী পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে। ড্রেজারের মাধ্যমে বিকৃত খননের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তিত হচ্ছে, জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নদীভাঙনের গতি বাড়ছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, ইউরেনিয়াম সংযুক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি এভাবে বালু উত্তোলন ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বালু সিন্ডিকেটে রয়েছেন সাবেক এমপি অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম ও তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জানবার হোসেন, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ডাবলু, বিএনপি নেতা জহুরুল ইসলাম বিজলি মালিথা, বাহিরচর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা ভুই বাবু, বিএনপির পরাজিত প্রার্থী রাগীব রউফ চৌধুরী ও শাহজাহান গ্রুপের নেতা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এসএস আল হোসায়েন সোহাগ এবং সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল হাই আল হাদী।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের ভাই নজরুল ইসলাম নজু বলেন, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বালু লুটপাট করা হচ্ছে। সংসদ সদস্যের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল তার নাম ব্যবহার করছে।

তবে সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জানবার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা এসবের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি সরাসরি ভেড়ামারায় এসে কথা বলার আহ্বান জানান।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ব্যর্থ হলে জেলা প্রশাসন সরাসরি ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।

১২৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন