ক্ষুদ্রঋণের শৃঙ্খল বনাম বড় খেলাপিদের রাজকপাল
বৃহস্পতিবার , ১৪ মে, ২০২৬ ৬:২৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এক নিষ্ঠুর পরিহাস হলো ঋণের দ্বিমুখী ব্যবহার। একজন সাধারণ দিনমজুর বা নিম্নবিত্ত গৃহবধূ ২০ হাজার টাকার কিস্তি দিতে না পেরে রাতের ঘুম হারাম করেন, সেখানে শত শত কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ গিলে ফেলা প্রভাবশালীরা দুবাই বা লন্ডনে বিলাসী জীবন কাটান।
সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫.৪৫ লক্ষ কোটি টাকায়। এই বিশাল অংকের টাকার বোঝা কার কাঁধে?
ক্ষুদ্রঋণের মরণকামড়:
গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা সাধারণত কিস্তি দিতে না পারলে ভিটেমাটি বিক্রির উপক্রম হয়। ঋণের কিস্তি যখন তাদের দুয়ারে হানা দেয়, তখন তারা শুধু টাকা নয়, নিজের সম্মানও হারান। ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে আত্মহত্যার খবরও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু কেন? কেন এই কঠোরতা শুধু তাদের জন্য যাদের হাতে ক্ষমতা নেই? রাষ্ট্র কি কেবল সাধারণ মানুষকে পিষে মারার জন্য আইন বানিয়েছে?
আমাদের সমাজে নিম্নবিত্তদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ বেঁচে থাকার শেষ খড়কুটো হলেও এর কিস্তি আদায়ের পদ্ধতি অত্যন্ত কঠোর। ১০-৮০ হাজার টাকার একটি ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি দিতে এক দিন দেরি হলে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ঋণের দরজায় হানা দেন, অনেক সময় সামাজিকভাবে হেনস্তা করেন। এর বিপরীতে, গত এপ্রিল ২০২৬-এ জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে আছে হাজার হাজার কোটি টাকা। অথচ এই শীর্ষ খেলাপিদের থেকে ঋণের মাত্র ১% এরও কম টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে।
ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও রাষ্ট্রের দায়:
রাঘববোয়ালরা যখন ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা গিলে ফেলে, তখন ব্যাংকগুলো কেন নিশ্চুপ? কেন তাদের বিদেশের সেকেন্ড হোমে গিয়ে সিআইডি হানা দেয় না? দুবাই বা লন্ডনে যারা জনগণের রক্তঘাম করা টাকা দিয়ে প্রাসাদ গড়েছেন, তারা কোন ক্ষমতার বলে এখনো আইনের ঊর্ধ্বে? ২০২৩ থেকে ২০২৬—গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাফিয়ে ৫.৪৫ লক্ষ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যার সিংহভাগই আটকে আছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকশ প্রভাবশালী পরিবারের কাছে।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট’ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন কঠোর নীতিমালা (যেমন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ট্রেড লাইসেন্স বাতিল) কাগজে-কলমে থাকলেও, তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। বড় বড় শিল্পপতিরা যখন জনগণের টাকা মেরে দিয়ে বিদেশে উৎসব করে, তখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলে—আইন কি তবে কেবল দুর্বলের জন্য?
ন্যায়বিচার আগে, কিস্তি পরে:
সাধারণ মানুষের এই প্রতিবাদ আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার আর্তনাদ। রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের স্পষ্ট দাবি---আগে শীর্ষ ২০ বা ১০০ খেলাপির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সেই টাকা আদায় নিশ্চিত করুন।
প্রকৃত দুস্থ বা সংকটে থাকা ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের জন্য কিস্তি স্থগিত বা জরিমানা মওকুফের ব্যবস্থা করুন।
১০ হাজার টাকার ঋণীর বিরুদ্ধে মামলা হলে কোটি টাকার খেলাপির বিরুদ্ধেও সমান্তরাল কঠোরতা বজায় রাখুন।
রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার। যখন কোটি টাকার চোরকে ফুলের মালা দেওয়া হয় আর দশ টাকার ঋণীকে হাতকড়া পরানো হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভ নিরসনে রাষ্ট্রকে শক্ত হাতে বড় রাঘববোয়ালদের ধরতে হবে। বড় খেলাপিরা আগে তাদের পাওনা পরিশোধ করুক; তবেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে।
বাংলাদেশের বর্তমান ঋণব্যবস্থা যেন গরিব মারার এক নিষ্ঠুর কলকব্জা। যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বড় বড় শিল্পপতিরা রাষ্ট্রীয় বিমানে চড়ে বিদেশে আয়েশ করেন---সেই দেশে ২০ হাজার টাকার কিস্তির জন্য একজন প্রান্তিক মানুষের ওপর চড়াও হওয়া কেবল অন্যায় নয়; এটি চূড়ান্ত নির্লজ্জতা!
লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
১১৯ বার পড়া হয়েছে