গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও মালিকানার সংকট
বৃহস্পতিবার , ১৪ মে, ২০২৬ ৭:১৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করছে—এ দেশের সাংবাদিকতা এখনো একটি অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও বৈপরীত্যপূর্ণ পেশা। বিশেষ করে এখন টিভির বার্তা বিভাগের চার সাংবাদিককে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক গণমাধ্যম কাঠামো, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং মালিক-রাষ্ট্র সম্পর্কের গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
'এখন টিভি'র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) ও সম্পাদকীয় প্রধান তুষার আবদুল্লাহ পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে- জামাত ও বিএনপি সমর্থক) মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি এবং ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম (টিভি অফিস তালাবদ্ধ করে দেয়া!) নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশে সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা আদৌ কতটুকু?
একটি পক্ষ বলছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের যেমন নিয়োগ দেওয়ার অধিকার আছে, তেমনি প্রয়োজনবোধে চাকরিচ্যুত করারও প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে সেই ক্ষেত্রে শ্রম আইন, চুক্তি, প্রাপ্য সুবিধা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে। এই যুক্তি কোনও ভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অন্য পক্ষের উদ্বেগও অমূলক নয়। কারণ সংবাদমাধ্যমে “যেকোনো অজুহাতে” বার্তা বিভাগের কর্মীদের অপসারণের সংস্কৃতি সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে ইদানীং' মব' সংস্কৃতি রয়েছে এটা দানবের আচরণ । এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের অন্যতম বড় সংকটগুলো হলো—তাদের জন্য কার্যকর চাকরি বিধি, বেতন কাঠামো ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের অভাব। আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংকের সবক অনুযায়ী গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যেসব সংবাদপত্র ও মিডিয়া সোচ্চার, সেসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও সাংবাদিকদের শ্রম অধিকার প্রশ্নে নির্কাক বধির নীরবতা দেখা যায়।
দেশের ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ায় এখনো কোনো কার্যকর জাতীয় বেতন কাঠামো নেই। ফলে কোথাও একজন শীর্ষ নির্বাহীর বেতন লাখ টাকায় পৌঁছায়, আবার একই পেশায় সাংবাদিকতায় গ্র্যাজুয়েট একজন তরুণকে ১৫ হাজার টাকায় কাজ করতে হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসংখ্য সংবাদকর্মী আছেন, যারা কোনো বেতন বা সম্মানি ছাড়াই “প্রতিনিধি” পরিচয়ে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন।
এই বাস্তবতায় দেশের সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ পেশাগত সততা নয়, বরং ভাত কাপড়ের জন্য টিকে থাকার লড়াইয়ে বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষ বা রাষ্ট্রক্ষমতার অনুগত হয়ে পড়েন। কারণ তারা জানেন—একবার চাকরি হারালে বিকল্প কর্মসংস্থান প্রায় অসম্ভব । বিশেষ করে উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকারীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। এর ফলে অনেকেই মালিক ও সরকারের “স্বার্থরক্ষাকারী ব্যবস্থাপক” হয়ে ওঠেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের গণমাধ্যম বাস্তবতা এই নির্মম সত্যকে আরও উন্মোচিত করেছে। মালিকপক্ষের তুলনায় শতগুণ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা। হত্যা মামলার আসামি হয়ে অনেকে কারাগারে গেছেন, বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটক থেকেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ নিরাপদ থেকেছে, বরং নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
একই রাজনৈতিক বাস্তবতায় কারও বিরুদ্ধে “ফ্যাসিস্ট দোসর” তকমা জোটে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা হয় না—এমন দ্বৈত মানদণ্ডও গণমাধ্যমের সংকটকে স্পষ্ট করে। কোনো কোনো সম্পাদক বা সংবাদ ব্যবস্থাপক জেলে গেছেন, কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বহাল তবিয়তে থেকেছেন। আবার এমনও দেখা গেছে, রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে সাংবাদিকদের বহিষ্কার বা মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, অথচ একই ধরনের অবস্থান নেওয়া অন্যরা প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। এই বৈষম্য দেখায় যে, দেশে সাংবাদিকতার বিচার প্রায়ই নীতির ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের এই অস্থিরতা দূর করতে হলে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের সমাধান জরুরি। প্রথমত, গণমাধ্যমের অনুমোদন ও মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগ, পদায়ন ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও কার্যকর চাকরি বিধি প্রণয়ন ও প্রয়োগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর বিভাজন ও রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএফপির মতো প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও জরুরি।
গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণমাধ্যম যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে গণতন্ত্রও নিরাপদ থাকে না। সাংবাদিকরা কোনো প্রতিষ্ঠানে তালা দিতে চান না; তারা চান কাজের মর্যাদা, ন্যায্য বেতন এবং পেশাগত নিরাপত্তা। তারা মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের পাহারাদার বা সরকারের পিআর মেশিন হতে চান না। আবার মালিক ও সরকারকেও বুঝতে হবে—সাংবাদিকদের অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম গড়ে ওঠে না।
আজ বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের সবচেয়ে বড় দাবি হওয়া উচিত—একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার গণমাধ্যম কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সাংবাদিকরা ভয়ের মধ্যে নয়, দায়িত্ববোধ ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
লেখক : সাবেক সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।
৪৯৩ বার পড়া হয়েছে