সময়ের মূল্য
রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:০২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কথা নয়—প্রয়োগের সময় এখন।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এক কথায় বলা যায়, “সময়”। অর্থ, সম্পদ, সুযোগ—সবকিছুই হারিয়ে গেলে কোনো না কোনোভাবে ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু সময় একবার চলে গেলে তা আর কোনোদিন ফিরে আসে না। তবু বিস্ময়কর হলেও সত্য, আমরা সময়ের এই অমূল্যতাকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি।
আমরা প্রায়ই একটি সহজ অথচ গভীর প্রশ্ন এড়িয়ে যাই—আগামীকালের জন্য যে কাজ আজ ফেলে রাখা হলো, সেটি যদি কালই করা হয়, তবে কালকের নিজস্ব কাজটি কবে সম্পন্ন হবে? এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক বড় অসঙ্গতি। আমরা আজকের কাজ কালকের ওপর ঠেলে দিই, আর কালকে আবার পরশুর দিকে সরিয়ে দিই। এভাবে কাজ জমতে জমতে একসময় তা বোঝায় পরিণত হয়, আর আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি নিজেরই তৈরি সেই চাপের নিচে।
সময়ের মূল্যায়ন আমরা মুখে স্বীকার করি—রচনা লিখি, বক্তৃতা দিই, উপদেশ দিই। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে সেই সচেতনতা খুব কমই দেখা যায়। সময় যেন আমাদের কাছে শুধুই একটি তাত্ত্বিক ধারণা, বাস্তব জীবনের একটি কার্যকর নীতি নয়। অথচ সফলতার প্রতিটি গল্পের পেছনে রয়েছে সময়ের সঠিক ব্যবহার, আর ব্যর্থতার অধিকাংশ কারণেই রয়েছে সময়ের অপচয়।
আজকের কাজের ভার বইতে না পেরে আমরা সেটিকে আগামীকালের ওপর চাপিয়ে দিই। কিন্তু আগামীকাল কি শুধুই জমে থাকা কাজের বোঝা বইবার জন্য? আগামীকাল তো নতুন সম্ভাবনার দিন, নতুন পরিকল্পনার দিন। সেখানে যদি আমরা অতীতের অবহেলার ভার চাপিয়ে দিই, তবে নতুন কিছু সৃষ্টির সুযোগ কোথায়?
এই প্রবণতা ধীরে ধীরে আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটি সংস্কৃতি যেন অজান্তেই আমাদের মধ্যে গড়ে উঠছে। অলসতা, উদাসীনতা এবং কাজ পেছানোর প্রবণতা আমাদের কর্মক্ষমতাকে নীরবে গ্রাস করছে। আমরা হয়তো তা তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারি না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের ব্যক্তিত্ব, কর্মজীবন এবং জাতিগত অগ্রগতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি দৃশ্যমান। পরীক্ষা পেছানোর প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় “স্বস্তি” হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তি আসলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে দেয়। তারা ধীরে ধীরে সময়ের গুরুত্ব ভুলে যায় এবং কাজ ফেলে রাখাকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নতুন প্রজন্মের ওপর। তাই শিক্ষার্থীদের এই মানসিকতা পরিবর্তন করা শুধু তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সন্তান শুধু আমার বা আপনার নয়—তারা আমাদের সবার। তাদের মধ্যে সময় সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কর্মনিষ্ঠা গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ছোটবেলা থেকেই আমরা “সময়ের মূল্য” শিরোনামে রচনা লিখতে শিখি। পরীক্ষার সাজেশনেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পায়। আমরা সুন্দর সুন্দর বাক্যে সময়ের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করি, উদাহরণ দিই, উপদেশ দিই। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন প্রায় অনুপস্থিত। যেন আমাদের শিক্ষা শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, জীবনের প্রয়োগে নয়।
কথা আর কাজের এই বিস্তর ফারাক আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে—এ প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা যদি নিজেদের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য না রাখি, তবে উন্নতির পথ কখনোই সুগম হবে না। ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, তেমনি জাতীয় জীবনেও এই অসামঞ্জস্য আমাদের পিছিয়ে দেয়।
সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সময়কে সম্মান করতে হলে এখনই শুরু করতে হবে। ছোট ছোট অভ্যাস—সময়মতো কাজ শেষ করা, অযথা দেরি না করা, পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোনো—এইসবের মাধ্যমেই আমরা বড় পরিবর্তন আনতে পারি।
আজই যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, “আজকের কাজ আজই শেষ করব,” তবে আমাদের জীবন অনেকটাই সহজ, সুন্দর এবং সফল হয়ে উঠবে।
সময় এখনই—কথা নয়, প্রয়োগের।
যথাসময়ে সকল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হোক—এটাই শুধু প্রত্যাশা নয়, এটি সময় সচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক।
৩১৪ বার পড়া হয়েছে