সর্বশেষ

মতামত

প্রতিহিংসার রাজনীতি বনাম ২৫ বছরের ভিশন: সিঙ্গাপুর মডেল কি আমাদের শিক্ষা দেবে?

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:৩৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি গভীর উদ্বেগের ছবি ফুটে ওঠে। সংসদ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা কিংবা রাজপথ—সবখানেই এক ধরনের অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলার আবহ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেও যখন একে অপরকে দোষারোপ করার ‘ব্লেম-গেম’ থামে না, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে; আমরা কি তবে আবারও পিছিয়ে যাচ্ছি? রাজনীতি যদি কেবল প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হয়, তবে রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন যে সুদূর পরাহত; তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

ইতিহাস থেকে একটি উদাহরণ আমাদের চোখ খুলে দিতে পারে। ১৯৬৫ সালে যখন মালয়েশিয়া থেকে আলাদা হয়ে সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়—তাদের না ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ, না ছিল পর্যাপ্ত ভূখণ্ড। কিন্তু লি কুয়ান ইউ-এর দূরদর্শী নেতৃত্বে তারা মাত্র ২৫ বছরে একটি অনগ্রসর জেলে পাড়া থেকে উন্নত বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হয়। আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের রোল মডেল। ১৯৬৫ সালে তাদের মাথাপিছু আয় ছিল ৫০০ ডলারের নিচে, যা আজ ৮০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তাদের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল—অতীতের কাসুন্দি না ঘেঁটে ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা। তাদের রাজনীতিবিদরা প্রতিহিংসায় সময় নষ্ট না করে আগামী ২৫ বছরের একটি সুনির্দিষ্ট ভিশন সামনে রেখেছিলেন।

সিঙ্গাপুরের উন্নতির অন্যতম স্তম্ভ ছিল ‘মেরিটোক্রেসি’ বা যোগ্যতার মূল্যায়ন। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও দলীয়করণের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে যে অস্থিরতা আর হৈচৈ আমরা দেখছি; তা মূলত মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বড় করে দেখার ফল। যখনই প্রশাসনিক স্তরে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পায়, তখনই দুর্নীতি বাড়ে এবং সুশাসন বাধাগ্রস্ত হয়। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় থাকলে আমরা কখনোই একটি টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারব না।

রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের অর্থনীতিতে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) এমন দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করতে ভয় পান, যেখানে স্থিতিশীলতার অভাব থাকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমাদের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা লোপ পায় এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। সিঙ্গাপুর প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকলে একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ডও বিশ্বকে শাসন করতে পারে।

আমরা আমাদের গৌরব নিয়ে পড়ে আছি—যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা ভিয়েতনাম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে উন্নতি কাকে বলে। পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার পর আমরা আজ তৃতীয় অবস্থানে নেমে গেছি, আর ভিয়েতনাম আমাদের টপকে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। এর কারণ একটাই—তারা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তি ও শিল্পের আধুনিকায়নে মন দিয়েছে।

আমাদের কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। অথচ কৃষিপ্রধান এই দেশে প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ এবং কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারলে আমরা বিশ্ববাজারে বড় অংশ দখল করতে পারতাম। আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারলেও সঠিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের অভাবে তারা মেধা পাচার করতে বাধ্য হচ্ছে।

আগামী ২৫ বছরের পরিকল্পনায় যদি আমরা কৃষি-প্রযুক্তি (Agri-tech) এবং উচ্চমূল্যের শিল্পজাত পণ্য (High-value manufacturing) উৎপাদনে গুরুত্ব না দিই; তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমরা আরও পিছিয়ে পড়ব। ভিয়েতনাম বা সিঙ্গাপুর যা পেরেছে; আমরা কেন পারব না?

আমাদের অর্থনীতির একক নির্ভরতা এখন পোশাক খাতের ওপর, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ড যেখানে ইলেকট্রনিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ টানছে; আমরা সেখানে এখনো প্রাথমিক স্তরেই আটকে আছি। আমাদের এখন উচিত ‘ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং’ এবং ‘ফ্রিল্যান্সিং’ খাতে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। আমাদের দেশের লাখ লাখ মেধাবী তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, কিন্তু সরকারি নীতি ও অবকাঠামোর অভাবে তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং বৈশ্বিক পেমেন্ট গেটওয়ের নিশ্চয়তা দিলে এই খাতই হতে পারে আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়ের উৎস।

আমাদের দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ এখন ফ্রিল্যান্সিং করছে। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং সহজ পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন পেপাল) নিশ্চিত করা যায়; তবে এটি পোশাক খাতের মতোই বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হবে।

বিশ্ব এখন চিপ ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ভারত ও ভিয়েতনাম এই খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পাচ্ছে। আমাদেরও উচিত কেবল ‘অ্যাসেম্বলি’ বা জোড়া লাগানো নয়, বরং উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দেওয়া।

ফ্রিল্যান্সিং বা ইলেকট্রনিক্সে সফল হতে হলে গতানুগতিক শিক্ষার বাইরে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে ২৫ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।

আমাদের এখন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি দরকার, যেখানে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে। রাজনীতি মানেই শত্রুতা নয়, বরং মতাদর্শের ভিন্নতা। সংসদকে হতে হবে তর্কের নয়, বরং সমাধানের কেন্দ্র। আমাদের প্রধান দলগুলোর উচিত এখন ব্লেম-গেম বন্ধ করে আগামী ২৫ বছরের জন্য একটি ‘জাতীয় মহাপরিকল্পনা’ বা ‘ন্যাশনাল চার্টার’ তৈরি করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির উন্নয়নে একটি জাতীয় রোডম্যাপ থাকতে হবে; যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে না। এই পরিকল্পনায় ব্যক্তিপূজা বা দলকানা রাজনীতির কোনো স্থান থাকবে না।

সিঙ্গাপুর বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর মূল শক্তি হলো তাদের জাতীয় সংহতি। আমাদেরও এখন সময় এসেছে সব দলের সম্মতিতে একটি ‘লিখিত জাতীয় সনদ’ তৈরি করার; যেখানে অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা, বৈদেশিক নীতি এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসনের বিষয়ে সবার স্বাক্ষর থাকবে। সরকারে যেই আসুক, এই মৌলিক নীতিগুলো যেন অপরিবর্তিত থাকে। সংসদ হবে এই সনদের রক্ষক, যেখানে রাজনীতি হবে যুক্তি আর পলিসির ভিত্তিতে; প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়। এই লিখিত প্রতিশ্রুতিই পারে আমাদের ২৫ বছরের ভিশনকে বাস্তবে রূপ দিতে।

রাজনীতি হওয়া উচিত জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য, কেবল গদি দখলের জন্য নয়। আমাদের রাজনীতিবিদদের এখনই সময় সিঙ্গাপুরের ২৫ বছরের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার। যদি পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহনশীলতা এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধ জাগ্রত না হয়, তবে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের এই বৃত্ত থেকে আমরা বের হতে পারব না।

অতীতের ঘৃণা ভুলে আগামী ২৫ বছরের একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি এবং তা বাস্তবায়নে ভেদাভেদ ভুলে কাজ করি। কারণ দেশ যদি হেরে যায়; তবে কোনো দলই শেষ পর্যন্ত জিততে পারবে না।

লেখক : কবি, কথাশিল্পী ও নির্মাতা।

১৫৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন