কুষ্টিয়ায় সুফী শামিম ও কক্সবাজারে নয়ন সাধু হত্যা : কোন পথে দেশ?
বৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:২৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কেউ আপনার মতের না হলে ভিন্ন মতের ভিন্ন দর্শন এর হলে তাঁকে হত্যা করতে হবে কেন ? এই হত্যা কি মানবতার পক্ষে? মানবাধিকারের পক্ষে ? অপরাধিরে বিচারের জন্য রাষ্ট্র রয়েছে, রয়েছে তার আইন।
২০২৪এর ৫ আগস্ট'র বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে 'তৌহিদী জনতা' বা 'বিক্ষুব্ধ মুসল্লি' ব্যানারে মব (উত্তেজিত জনতা) বা মব জাস্টিসের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই ব্যানারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাজার, এমনকি গণমাধ্যমের ওপর হামলার দৃশ্যও দেখা গেছে। প্রশ্ন হলো 'তৌহিদী জনতা' আসলে কারা ? প্রকৃত অর্থে 'তৌহিদী জনতা' অর্থ একত্ববাদী জনগোষ্ঠী, যা বাংলাদেশে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়, বরং কোনো বিশেষ ইস্যুতে বা কোনো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়া বিক্ষুব্ধ মুসলিম গোষ্ঠী বা সাধারণ মানুষের একটি ব্যানারের নাম। তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষাকারী হিসেবে দাবি করে এবং প্রায়শই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, মাজার, বা নারী তারকাদের অংশগ্রহণে বাধা প্রদান করে। তারা বিভিন্ন স্থানে নারীকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান পণ্ড, মাজারে ভাঙচুর, বিভিন্ন সাধু-সুফীদের হত্যা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে থানা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিসের নামে ভাঙচুর বা দাবি আদায়ের চেষ্টা করেছে।
'তৌহিদী জনতা' কোনো একক সুসংগঠিত দল নয়, বরং এটি ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কিছু সুযোগসন্ধানী, কট্টরপন্থী এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর একটি মব বা উগ্রবাদী অ্যাকশন টিম, যা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও শুন্যতার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু সময় মব বন্ধ থাকলেও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ভিন্ন মতের সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা, কক্সবাজারে নয়ন সাধুর হত্যাকাণ্ডর ঘটনা সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের মূল্যবোধের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ।
কক্সবাজারের খুরুশকুলের সেই পাহাড়ের বুক আজ এক বুক চাপা কান্নায় ভারী হয়ে আছে। প্রকৃতির স্নিগ্ধ নির্জনতাকে চিরে দিয়ে যে নির্মম সত্যটি আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ধর্মীয় সেবায় নিবেদিত এক প্রাণ, এক শান্ত-সৌম্য মানুষ—নয়ন সাধু। যার জীবনটা ছিল কেবল শান্তি আর প্রার্থনার চরণে উৎসর্গ করা। আজ সেই পাহাড়ের অরণ্য সাক্ষী হয়ে আছে এমন এক বর্বরতার, যা মধ্যযুগীয় বীভৎসতাকেও হার মানায়। শৈশবের খেলার মাঠ বা মন্দিরের প্রাঙ্গণে নয়, নয়ন সাধুর নিথর দেহটি উদ্ধার করা হলো পাহাড়ের এক নিভৃত কোণ থেকে। অপহরণের পর তাকে যে সীমাহীন যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তার প্রতিটি ক্ষত আজ সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাকে নির্যাতন করে, গাছে ঝুলিয়ে যে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তা কেবল এক ব্যক্তির ওপর নয়—বরং আমাদের পুরো মনুষ্যত্বের গায়ে এক গভীর কলঙ্ক।
যখন তার পরিবার ব্যাকুল হয়ে থানায় জিডি করে আশায় বুক বেঁধেছিল যে—হয়তো তিনি ফিরে আসবেন, হয়তো আবারও সেই পরিচিত হাসিমুখটি দেখা যাবে—তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে নিয়তি এমন এক বিভীষিকাময় সমাপ্তি লিখে রেখেছে। তারা ফিরে পেলেন এক নিথর দেহ, যা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে। যে হাত দুটো আশীর্বাদ আর সেবার জন্য ছিল, সেই হাত দুটো আজ স্থির হয়ে গেছে। একটি ঘর চিরতরে অন্ধকারে ডুবে গেল, এক জোড়া চোখ অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আজ পাথর হয়ে গেছে। আমাদের নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ? নয়ন সাধুর এই হত্যাকাণ্ড কোনো গোষ্ঠী বা জাতির বিবাদ নয়, এটি স্রেফ মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। এমন এক শান্তিকামী মানুষের সঙ্গে এই বর্বরতা আমাদের এই আধুনিক সমাজের বড় এক ব্যর্থতা। এই নির্মমতার সামনে চুপ থাকা মানে অপরাধীকে নীরবে সমর্থন দেওয়া।
সাম্প্রতিকালে বাংলাদেশের সমাজে নিষ্ঠুরতা ও নির্দয়তার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে, তাহা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং বিবেকবান মানুষের জন্য চরম লজ্জার কারণ হয়ে গেছে। অবলা পশু-পাখির প্রতি যে প্রকার নৃশংস আচরণ আমাদের সমাজ প্রত্যক্ষ করছে, তাহা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় বহন করে না। মাজারের পুকুরে জীবন্ত কুকুর কিংবা মুরগি ছুড়ে দিয়ে কুমিরের খাবারের দৃশ্য ধারণ করা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করা বিকৃত চরিত্রের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। মানবিক, নৈতিক বা ধর্মীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে গুম-খুনের বিচারের দাবিতে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আজও অস্পষ্ট ও দ্বিধাবিভক্ত। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটিই সবচাইতে বড় দুর্ভাগ্য। ভিন্ন মতের মানুষের প্রাণহরণ কোনো নৈতিক, মানবিক বা ধর্মীয় ভিত্তি আছে বলে মনে করতে পারি না। তবুও আমাদের সমাজে এমন ধরনের ঘটনার ঘটলেও কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ নীরব থাকে, আবার কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মবের মাধ্যমে খুনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই বিভাজন কেবল রাজনৈতিক মতভেদের ফলাফল নয়; এটি সামাজিক মনোবিজ্ঞানেরও একটি প্রতিফলন, যেখানে ‘দলগত পক্ষপাত’ (ইনগ্রুপ বায়াস) বা ‘শ্রেণী দ্বন্দ্ব’ মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের সার্বজনীন মানদণ্ড থেকে বিচ্যুত করে। অথচ অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের নৈতিক অবস্থান এবং সেই নীরবতা প্রায়শই অন্যায়কারীর পক্ষেই কাজ করে।
ইসলাম অন্য ধর্মের উপাসনালয় রক্ষার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে বিধ্বস্ত হয়ে যেত আশ্রম, গির্জা, উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ।” (সূরা হজ্জ ২২:৪০) মহা নবী রাসূল (সাঃ) নাজরানের খ্রিস্টানদের মসজিদে নববীতে উপাসনার সুযোগ দিয়েছিলেন। বিদায় হজ্জে বলেছেন: “তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান একে অপরের জন্য হারাম।” আর গুজব ছড়ানো প্রসঙ্গে কোরআন বলছে: "হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হতে না হয়।" (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)
আর এই বিষয়ে তাসাউফের শিক্ষা হলো : তাসাউফ বলে, ‘খালকের সাথে সদাচরণ খালেকের ইবাদত’। গাউসল আজম হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলতেন, “যার অন্তরে হিংসা আছে, তার অন্তরে আল্লাহ নেই।” মব মানে নফসের গোলামি, আধ্যাত্মিকতার মৃত্যু।" করণীয় হলো :
কুষ্টিয়া অঞ্চলের সুফি দরবেশ শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা, কক্সবাজারের নয়ন সাধুকে হত্যার ঘটনা আসলে কি শিক্ষা দেয় আমাদের। ভিন্ন মতের একজন মানুষকে পিটিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই মতপার্থক্য, বিশ্বাস বা বিরোধের গ্রহণযোগ্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। সভ্য সমাজে মতবিরোধ থাকবে, চিন্তার ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু তার সমাধান হতে হবে সংলাপ, যুক্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে। যেখানে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়, সেখানে শুধু মাত্র একটি প্রাণই নিভে যায় না, নিভে যায় সমাজের বিবেক ও মানবতার আলো। কুষ্টিয়া ও কক্সবাজারের এই ঘটনা আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাও তুলে ধরে। আমরা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি, যেখানে গুজব, উসকানি ও অজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্য কিংবা মিথ্যা তথ্য অনেক সময় মানুষের যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, পরিণত হয় ক্ষুব্ধ জনতায়,যারা মুহূর্তের আবেগে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়।
হামলাকারীরা-হত্যাকারীরা রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও অস্থিতিশীল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফকির লালন, খালেক দেওয়ান, আব্দুল হালিম, রাধারমণ, আরকুম শাহসহ বিভিন্ন ফকির, দরবেশ, পীর, মুরশিদের গান শুনলে দেখা যাবে যে, সেখানে ধর্মতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক জিজ্ঞাসাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। যে কারণে স্বভাবতই মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়। এই তত্ত্বগুলো দাঁড় করানোর মধ্য দিয়ে যে নতুন চিন্তা হাজির হয়, তার সঙ্গে কথিত পরকালবাদীদের একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, বিশেষত যারা ধর্ম বলতে পরকালকেই বোঝে। তারা আক্রমণের শুরুতে গাঁজার কথা বলে, অথবা জমি নিয়ে বা আধিপত্য নিয়ে মারধর কিংবা দানের বাক্স কার কাছে আছে, এসব দ্বন্দ্ব এসে হাজির হয়। এটা বড় কোনো বিষয় ছিল না। তবে এখন এসবকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া চেষ্টা কজরা হচ্ছে। কারণ, রাষ্ট্র এখন খুবই দুর্বল। সেই সঙ্গে মাজার প্রশ্নে, সুধিদের প্রশ্নে, সাধুদের প্রশ্নে রাষ্ট্রের কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই, রাষ্ট্র কীভাবে মাজার রক্ষা করবে, তা নিয়ে ফৌজদারি ব্যবস্থা ছাড়া পরিষ্কার কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। ধর্ম মানুষকে শান্তির পথ দেখায়, ধ্বংসের নয়। কাটপিস ভিডিও আর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মব বানানো ইসলাম, মানবতা ও রাষ্ট্রীয় আইন—তিন জায়গাতেই হারাম ও শাস্তিযোগ্য। যারা ধর্মের লেবাসকে পুঁজি করে তৌহিদ জনতার আড়ালে লুটপাট করছে তাদের রুখে দিতে হবে এবং আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে।
বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু, কুষ্টিয়ার সুফি শামীম আল জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যার পর আশ্বস্থ হবার পরিবর্তে হতাশ হচ্ছি। শামীম আল জাহাঙ্গীরের মৃত্যু, নয়ন সাধুকে হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার থেকেই মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে,মানুষকে সম্মান করা, ভিন্ন মতকে সহ্য করা এবং সহানুভূতিশীল হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ‘মব-জাস্টিস’ গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোনো সমাধানও আনবে না। আইনের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আইনের মাধ্যমেই সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। এ অবস্থা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে বহুদলীয়, বহুমতের গণতান্ত্রিক চেতনা ও ‘জুলাই-আগস্ট’ বিপ্লবের অপমৃত্যু ঘটতে বাধ্য। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এবং জনমনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মব কালচার বা অনুরূপ ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হলে, সমাজ হতে এই অপসংস্কৃতির অভিশাপ দূর করা সম্ভব হবে না।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
১৩৫ বার পড়া হয়েছে