উদিত সূর্য আর মেঘের আড়ালে নয়
বৃহস্পতিবার , ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:৪০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আষাঢ়-শ্রাবণ, বৈশাখ-জৈষ্ঠে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে-পুড়ে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ। কিংবা পুলিশের টিয়ার শেলের মুখোমুখি। রাজপথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন তারা।
এদের অনেকেই এবার সংরক্ষিত আসনে মহিলা এমপি হয়েছেন। এ ছাড়া উঠে এসেছেন মতুয়া, মারমা, চাকমা, বোমাং কিংবা ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায়ের নারীরা। রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা। এ রকম এক বাস্তবতার ওপর আগামীর সংসদ। এই জন্য সরকারি দল বিএনপিকে ধন্যবাদ-যোগ্য। সরকার গঠন করার পর এই প্রথমবার তারা একটা সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দুই-এক জন হয়তো অজানা, অচেনা মুখের সংযোজন হয়েছে। এতে কেউ কেউ বিস্মিত এবং বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে অনেক হিসেব-নিকাশ আছে। যা খোলা চোখে দেখা যায় না। কিছু সমঝোতা করতে হয়। যা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনৈতিক বাস্তবতা। এর মধ্যে থেকেই কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, এটাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
বিরোধী জোটকেও ধন্যবাদ। তারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে যাদের যোগ্য মনে করেছেন, তাদেরই সংরক্ষিত মহিলা আসনে নমিনেশন দিয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ রাজনীতির বাইরের নয়। বাইরে থেকে এসে নারী সংরক্ষিত আসনের তালিকায় জায়গা নিতে পারেনি। সবাই কোনো না কোনো ভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। হয়তো রাজনীতি এবং পারিবার এই দুটোর সঙ্গেই কারো সম্পর্ক থাকতে পারে। যা তালিকায় স্থান পাওয়ার ব্যাপারে তেমন বড় প্রতিবন্ধক নয়।
যাই হোক এবারের সংরক্ষিত মহিলা আসনের পার্লামেন্ট মেম্বার নিয়ে আর পুরনো বাক্য লেখা হবে না। ৩০ বা ৫০ সেট নেকলেস। যাদের অধিকাংশের শোভাবর্ধন ছাড়া পার্লামেন্টে তেমন কোনো কাজ ছিল না। তবে শোভা বর্ধনকারী পার্লামেন্ট মেম্বাররা পার্লামেন্টের বাইরে নির্বাচিত এমপিদের মতোই ক্ষমতার শোভা দেখাতেন। অনেকে আবার আর্থিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নির্বাচিত এমপিদের থেকেও অনেক বেশি ক্ষমতা দেখিয়েছেন। এবার আমরা অতীতের সেই ভুল বা অপকর্মকে বিদায় জানাতে চাই। আমাদের চাওয়া হবে এবারের মহিলা পার্লামেন্ট সদস্যরা রাজনীতিক আচরণ করবেন, এবং দেশের পিছিয়ে থাকা মহিলাদের সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করবেন।
তারপরও কিছু কথা থাকে। এবার পার্লামেন্টে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনীত এমপিদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নোংরা প্রচার খুবই দুঃখজনক। নানা রকম অপপ্রচার চলছে। যা রাজনৈতিক দেউলিয়া ছাড়া আর কিছুই না। কারো, কারো ক্ষেত্রে অতীতের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে কার সঙ্গে কি সম্পর্কের কারণে মনোনীত হয়েছেন। একটা কথা সবার মাথায় রাখতে হবে, রাজনৈতিক দল তার দলের কথা চিন্তা করেই নমিনেশন দিয়েছে। প্রত্যেক দলের দলীয় স্বাধীনতা রয়েছে, কাকে সে নমিনেশন দেবে। কাকে দেবে না। বিরোধী পক্ষ বা বাইরের লোকদের তা নিয়ে অযাচিত মন্তব্য না করাই বাঞ্ছনীয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এ দেশে এক যুগান্তকারী ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিবর্তন এসেছে। ’৭১-এর স্বাধীনতা পরবর্তীতে একটা স্বৈরশাসককে পরিবর্তন করতে এ-তো রক্তক্ষয় আর হয়নি। আমদের মতো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে সকলে কাধে কাধ মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু না! দেখছি, দেশের কল্যাণের পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। গলাগলির পরিবর্তে গালাগালি শুরু হয়ে গেছে। হয়তো সামনে দেখা যাবে মুখোমুখি সমর যুদ্ধে অবতীর্ন। চট্টগ্রামে এরই মধ্যে এর পূর্বাভাস আমরা দেখলাম।
একটা গোষ্ঠী ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া। কথায়, কথায় নতুন সরকারকে ফেলে দেয়ার কথা বলছে। সভা-সমাবেশ, সামাজিক মাধ্যমে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে নানা ধরনের বাক্য উচ্চারণ করছে। সরকারি দল ক্ষমতায় থাকায় হয়তো ধৈর্য নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা চাইছে না সরকারের শুরুতেই বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর সম্পর্ক সৃষ্টি হোক। কিন্তু সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কি সব সময় কেন্দ্রীয় নেতাদের কথা শুনব? এর নিশ্চয়তা কে দিতে পারবে? স্থানীয় রাজনীতিতে সব নেতা-কর্মীদের নিজ নিজ অবস্থান রয়েছে। অবস্থান নড়বড়ে হয়ে গেলে তখন কেন্দ্রের থেকে স্থানীয় প্রধা হয়ে দেখা দেয়।
বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনারা এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন না। কেউ হয়তো ভাবছেন, নতুন সরকারকে ফেলে দিয়ে ক্ষমতায় যাবেন। ক্ষমতায় যাওয়া এতো সহজ নয়।
আপনাদের আন্দোলন বা অসহযোগিতার কারণে সরকার বেকায়দায় পড়ে যাবে, এ কথা ঠিক। কিন্তু এতো সহজে ক্ষমতাচ্যুত করা অসম্ভব। কেননা বর্তমান সরকার বা সরকারি দলের দীর্ঘ আন্দোলন করে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এরশাদের সময় ৯ বছর এবং আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ১৬ বছর আন্দোলন করে টিকে ছিল। তাদের রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। এ ছাড়া দেশের ভোটারদের একটা বড় অংশ তাদের সমর্থক। এবং ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। তা-ই সরকার ফেলার আন্দোলন গেলে দেশে শুধু নৈরাজ্য দেখা দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা দেশের সাধারণ মানুষের কাম্য নয়। তা-ই যা কিছুই করেন কেন, আপনার সে অধিকার আছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একটু ভেবে নেয়া বোধহয় প্রয়োজন।
একটা কথা সব রাজনৈতিক দলকে ভাবতে হবে। আবারো যদি দেশে নৈরাজ্য দেখা দেয় এই পথ ধরে যারা আসবে তা কারোর জন্যই সুখকর হবে না। এমনিতেই রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষের মধ্যে খুব একটা সুখ স্মৃতি নেই। তাই এই সুযোগে ভিন্ন শক্তি যদি সুযোগ নেই তাহলে সাধারণ জনগণকে আপনাদের পাশে পাবেন কি না তা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। পাশাপাশি আর একটা বাইরের অপশক্তির কথাও মাথায় রাখতে হবে। তা কাছের কিংবা দূরেরও হতে হবে।
দূরের এক পরাশক্তি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থান ওই পরাশক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ইনডিয়া মহাসাগর দিয়ে ৪০ শতাংশের ওপর বাণিজ্য চলাচল হয়। আরেক কারণ হচ্ছে, এই অঞ্চলের নতুন পরাশক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছে একটি দেশ। নতুন শক্তির অগ্রযাত্রা থমকে বাংলাদেশের অবস্থান তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আমাদের প্রত্যাশা, আপনারা একে অপরের সমালোচনা করবেন। তা গঠনমূলক এবং জনগণের স্বার্থে। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তোষামোদ নয়। তোষামোদ সরকারকে স্বৈরশাসক পরিণত করে। সবাইকে মাথায় রাখতে হবে, ৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন এসেছে সেই পরিবর্তনের পথ ধরেই আমাদের দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের ভাবনা এবং পরিকল্পনা থাকবে, একবিংশের উন্নত মহাসড়কে ওঠার। আমরা আর পেছনের পথে হাটতে চাই না। পেছন পায়ে হাটে অশুভ শক্তি!
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
১২৫ বার পড়া হয়েছে