সংসদ সচিবালয়ের কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য, অভিযোগ ‘হরিলুট’
রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সাম্প্রতিক কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম ও অতিমূল্য নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে। বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে ক্যামেরা, লেন্স, ব্যাগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪ হাজার টাকার একটি ব্যাগের মূল্য ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা। একইভাবে ৩ হাজার টাকার একটি কার্ড রিডারের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার একটি ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা বডির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। এ ধরনের চারটি ক্যামেরা বডি কেনা হয়েছে মোট ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকায়।
সব মিলিয়ে ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা, যেখানে প্রকৃত বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকারও কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন ছবি তোলার জন্য দ্রুততার সঙ্গে এসব সরঞ্জাম কেনা হয়। ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনের মধ্যেই সরবরাহ সম্পন্ন করা হয়। গত ১২ মার্চ সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ২৫ মার্চ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
ক্রয় তালিকায় চারটি ক্যামেরা বডির পাশাপাশি বিভিন্ন ফোকাল লেন্থের লেন্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২৪-৭০ এমএম লেন্স তিনটি কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায়, যেখানে প্রতিটির বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া ২৪-১২০ এমএম লেন্স কেনা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকায়, যার বাজারমূল্য প্রায় অর্ধেক। ১৪-২৪ এমএম ও ১০০-৪০০ এমএম লেন্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্যবৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
ক্যামেরা সেটের জন্য ছয়টি স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ) কেনা হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩০০ টাকায়, যদিও বাজারে প্রতিটির মূল্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া মেমোরি কার্ড, ব্যাটারি ও কার্ড রিডারের ক্ষেত্রেও অতিমূল্য নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, টেন্ডারে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে নিম্নমানের অন্য কোম্পানির পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে শুধু লোগো সংযোজন করে ব্র্যান্ডেড পণ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এ সব সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে ‘সেফ ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার দাবি করেছেন, দামি ব্র্যান্ড ও কর-ভ্যাটের কারণে ব্যয় বেশি হয়েছে। তবে বাজারদামের সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য ও পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুরো কেনাকাটা একটি কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও এর নেপথ্যে সাবেক সচিবের তত্ত্বাবধান ছিল। নিয়ম মেনে কাগজপত্র সম্পন্ন করা হলেও বাস্তবে অনিয়ম হয়েছে বলে তাদের দাবি।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এক ফটোগ্রাফার বলেন, সংসদের মতো জায়গায় ছবি তোলার জন্য ৪ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যেই মানসম্মত ক্যামেরা সেট যথেষ্ট। সেখানে প্রায় ৬০ লাখ টাকার সরঞ্জাম কেনা অস্বাভাবিক।
এ বিষয়ে সাবেক সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে এ কেনাকাটায় অনিয়মের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
১৬৫ বার পড়া হয়েছে