রবীন্দ্রনাথের কবিতাঃ প্রেমে, সুন্দরে, প্রকৃতিতে
রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:২৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির প্রতি আত্মীয়তা অনুভব করার বিচিত্র প্রকার এবং ক্রমবিকশিত ভাবনাধারা কবিতায় যেমন অনুভব করা যায়, তেমনি গানেও অনুভব করা যায়। বরং গানে সেই অনুভবের পূর্ণ পরিণত বোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
রবীন্দ্রনাথের গানে- কবিতায় মৃত্যুর নানা রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়। মৃত্যু কখনো রাতের অন্ধকারে দুয়ার ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে। যারা ঘরে বসবাস করে, তারা আগন্তকের পরিচয় জানতে পারে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তা মনে-প্রাণে অনুভব করেন, আগন্তুক তাঁর পরিচিত সত্তা ‘মৃত্যু’ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই সত্তাটির এক হাতে তরবারি, অন্য হাতে বরণমালা লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গানে সেই সত্তার উপস্থিতি জানান দেয়া হয়েছে, এভাবে-
“এক হাতে ওর কৃপাণ আছে, আর এক হাতে দ্বার।
ওযে ভেঙ্গেছে তোর দ্বার।
মৃত্যু এসেছে যুদ্ধ করে গৃহবাসীর প্রাণ হরণ করতে। কবি জানেন- মৃত্যু অনিবার্য সত্য, মৃত্যুকে বরণ করে নিতেই হবে। কবির অভিপ্রায় হচ্ছে মৃত্যুর পরও পৃথিবী যেন কবিকে মনে রাখে, কবির উপস্থিতি যেন টের পায়। রবীন্দ্রনাথ তাই জীবনধারার প্রবর্তক মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। কবি লেখেন-
“তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।
নতুন খেয়ায় করবে খেলা এই আমি-আহা,
নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুর ভোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।”
রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, গানে পুনরুজ্জীবন কল্পনার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় দেখান যে, প্রাণ নেয়ার জন্যে আসলেও মৃত্যুর হাতে কবিকে বরণ করে নেবে। এই 'মৃত্যু' ‘চিত্রা' কাব্যের সেই জীবনদেবতা কি না- সে প্রশ্ন এসেই যায়। ‘জীবনদেবতা’কে কবি বলেছিলেনঃ
"এখন কি শেষ হয়েছে প্রাণেশ
যা-কিছু আছিল মোর।
যত শোভা, যত গান, যত প্রাণ, জাগরণ, ঘুমঘোর।
ভেঙে দাও তবে আজিকার সভা,
আনো নব রূপ, আন নব শোভা,
নূতন করিয়া লহো আরবার
চিরপুরাতন মোরে।
নূতন বিবাহে বাঁধিবে আমায়
নবীন জীবন- ডোরে।"
জীবন শেষে এক ধরনের বিবাহের কথা বলা হয়েছে 'চিত্রা' কাব্যের 'সিন্ধুপারে' কবিতাতে। এ কবিতায় আমরা প্রতীকী মৃত্যুর এবং লোকান্তর-যাত্রার দীর্ঘ, বিশদ বৃত্তান্তের উল্লেখ পাওয়া যায়, উল্লেখ পাওয়া যায় বিবাহের, লক্ষ্য করা যায় বিবাহ দৃশ্য। রবীন্দ্রকাব্যে অপার রহস্যময়ী অবগুন্ঠিতার সঙ্গে অজানা পুরীতে পৌঁছে যাবার পর এক বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে দেখা যায়। নায়ক বধূকে বলেঃ 'সব দেখিলাম, তোমারে দেখিনি শুধু’। এক পর্যায়ে হাসিতে উচ্ছল রমণী অবগুন্ঠন মুগ্ধ হয়ে উঠলে নায়ক রমণীর চরনে মাথা নত করে বিস্ময়কর ভাবে উচ্চারণ করেঃ ‘এখানেও তুমি জীবনদেবতা’। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ জীবনকে নতুন রূপে, নতুন শোভায় বার বার দেখেছেন। মৃত্যুলোকে পৌঁছে যাবার পরও নতুন জীবনের সঙ্গে আবার মিলন।
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে, মানুষের শিয়রে এসে শান্তি ও সান্ত্বনার মতো জেগে রয়েছেন প্রকৃতিদেবী। এই প্রকৃতি মমতা দিসে প্রশমিত করে মানুষের সব জ্বালা-যন্ত্রণা। প্রকৃতিদেবী তার সৌন্দর্য। শুশ্রূষা দিয়ে যেন মানুষের সব ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিচ্ছেন। এ ধারণা রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিলো, তেমনি ছিলো ওয়ার্ডসওয়ার্থের। প্রকৃতিপ্রেমের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ান্সের জীবনদর্শনের সমীপবর্তিতা সহজেই লক্ষ্য করা যায়।
'বস্তু ও স্রষ্টার মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান প্রতিষ্ঠিত না হলে বস্তু স্বরূপ-প্রকাশ করে না রবীন্দ্রনাথের চোখে। সে বস্তু সৌন্দর্য হতে পারে, প্রেম হতে পারে, আনন্দ হতে পারে। বিশুদ্ধ সৌন্দর্যকে একটি যথাযোগ্য মূর্তিদানের উদ্দেশ্যে কবি 'মানসী'কে আবিষ্কার করেছেন। এই মানসী কবির মনের সৌন্দর্যের প্রতীক। আর তাই মানসীর সঙ্গে সৌন্দর্যের মাধুর্যের, রসরহস্যের ব্যাপার জড়িত। 'মানসী' কাব্যকে কবির একাধিক কাব্যের সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। 'মানসী' কাব্যের বিভিন্ন কবিতার মধ্যে ভাবের ও রূপের মিল লক্ষ্য করা যায়। যদিও 'মানসী' কাব্যে এসে কবির ভাবজগতের নতুনত্ব সহজেই সন্ধান করা সম্ভব। তবে 'মানসী' কাব্যে পূর্ববর্তী কাজের অনুপ্রেরণা একেবারে নিঃশেষিত হয়ে যায়নি।
রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে, মানুষের শিয়রে শান্তি ও সান্ত্বনার মতো জেগে রয়েছেন প্রকৃতিদেবী। এই প্রকৃতি মমতা দিয়ে প্রশমিত করে মানুষের সব জ্বালা-যন্ত্রণা। প্রকৃতিদেবী তাঁর সৌন্দর্য ও শুশ্রূষা দিয়ে যেন মানুষের সব ক্ষয়-ক্ষতি পূরণ করে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এই এই দুই কবির মধ্যেই ছিলো এক ধরনের ধ্যানদৃষ্টি; যা প্রকৃতির মর্মস্থল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। 'মানসী' কাব্যেও রবীন্দ্রনাথের এই বৈশিষ্ট্য সত্য হয়ে উঠছে। প্রকৃতিপটে স্থাপিত মানুষকে রবীন্দ্রনাথ ও ওয়ার্ডসওয়ার্থ সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ তাই উচ্চারণ করেনঃ
“ প্রথম মধ্যাহ্নতাপে প্রান্তর ব্যাপিয়া কাঁপে
বাষ্প শিখা অনলশ্বসনা,
অম্বেষিয়া দশ-দিশা যেন ধরণীর তৃষা
মেলিয়াছে লেলিহা রসনা।
ছায়া মেলি সারি সারি স্তব্ধ আছে তিন চারি
শিশুগাছ পাণ্ডুকিশলয়,
নিমবৃক্ষ ঘনশাখা গুচ্ছ গুচ্ছ পুষ্পে ঢাকা-
আম্রবন তাম্রফলময়।
গোলক-চাঁপার ফুলে গন্ধের হিল্লোল তুলে,
বন হতে আসে বাতায়নে।"
['কুহুধ্বনি', 'মানসী']
'মানসী' কাব্যে প্রকৃতিদৃশ্যের এমন ঘনপ্রাচুর্য লক্ষ্য করা যায়। আর তাই মানসীকে, প্রিয়াকে কবির মনে হয় প্রকৃতির মর্মর্জাতিকা। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাছে প্রকৃতি ছিলো অস্তিত্বের অস্তিত্ব, জীবনের জীবন।
প্রকৃতি তাঁর কাব্যে মনে হয়েছে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও স্বনির্ভর। ‘ Wordsworth sees nature as not merely living its own life but full of full of beauty and joy." [The Romantic Imagination: C. M. Bowra]
রবীন্দ্রনাথও প্রকৃতির সূক্ষ্ম বিবর্তনশীল মুখশ্রী লক্ষ্য করে যুগপৎ ধ্যান ও আনন্দ লাভ করেছিলেন। প্রকৃতি তাঁর কাছে সুন্দর, কবিতা লেখার প্রেরণা।
'কড়ি ও কোমল' কাব্যে যে প্রকৃতি চেতনা নারীর সৌন্দর্যের উপস্থাপনা প্রেমের ও ধ্যানের উন্মেষ ঘটিয়ে ছিলো, তারই বিকশিত রূপ ‘মানসী' কাব্যের বিভিন্ন কবিতা। এখানে প্রেম ও প্রকৃতি, নারী ও প্রকৃতি এক এবং একাকার হয়ে গিয়েছে। জানা গেছে যে, 'মানসী' কাব্যের অধিকাংশ কবিতা পশ্চিমের এক শহরের নির্জন বাংলো ঘরে লিখিত হয়েছিলো। 'মানসী' কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন:
‘আমার কল্পনার উপর নতুন পরিবেষ্টনের প্রভাব বার বার দেখেছি, এই জন্যই আলমোড়ায় যখন ছিলুম, আমার লেখনী হঠাৎ নতুন পথ নিলো ‘শিশুর’ কবিতায় । অথচ সে জাতীয় কতিপয় কোন উপলক্ষই সেখানে ছিল না। পূর্বতন রচনাধারা থেকে স্বতন্ত্র এ একটা নূতন কাব্যরূপের প্রকাশ 'মানসী' ও সেই রকম। নূতন আবেষ্টনে ও এই কবিতাগুলি সহসা যেন ধ্যান ধারণ করল। পূর্ববর্তী 'কড়ি ও কোমল' এর সঙ্গে এর বিশেষ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নূতন শক্তি দিতে পেরেছি। মানসীতে ছন্দের নানা খেয়াল দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। কবির সঙ্গে যেন একজন শিল্পী এসে যোগ দিল।
[' মানসী’; সূচনা ২/ ১১৫-১১৬]
ওয়ার্ডসওয়ার্সের কাব্যের মতোই রবীন্দ্রনাথের কাব্যে মৃৎপ্রকৃতিকে ভালোবাসার অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। মাটির পৃথিবীকে ভালোবাসার অনেক পরিচয় 'মানসী' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় নিহিত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির নির্জন রুপের সান্নিধ্যে এসে এক শান্ত সমাহিত তপস্বীতুল্য আত্মার আবিষ্কার করেন নিজেরই ব্যক্তিত্বের ভিতরে।
'মানসী' কাব্যে (১৮৯০) কবিচেতনার এক অভূতপূর্ব বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। কাব্যসৃষ্টির মৌলিকতা, শিল্পরূপ এবং চৈতন্যের গভীর উপলব্ধি বিবেচনা করলে ‘মানসী' পূর্ববর্তী কাব্যগুলো থেকে অগ্রসর। কবি-প্রতিভার স্মারক হিসেবে 'মানসী' অসাধারণ তাৎপর্যমণ্ডিত। 'কড়ি ও কোমল' কাব্যে রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্ত পার্থিব চেতনার উত্তাপের মধ্যে শান্তি পাচ্ছিল না ।'মানসী' কাব্যেও এ ধরনের আশান্তি, দ্বিধা ও সংশয় ঘনায়িত হতে দেখা যায়। 'মানসী' কাব্যে দুটি প্রধান সুর ধ্বনিত হয়েছে। এর একটি হচ্ছে প্রেম, অন্যটি হচ্ছে প্রকৃতি ও সৌন্দর্যচেতনা। 'মানসী' কাব্যের এই দুটি সুরের মধ্যেই পার্থিব চেতনার উত্তাপ অনুভব করা যায়।
আর এই দু'টি সুরেই দ্বিধা ও সংশয় ঘনীভূত হতে দেখা যায়। দেহ ও আত্মার অন্বয় সম্পর্ক সম্বন্ধে পূর্ণচেতনার সাক্ষাৎ তখনো তিনি লাভ করতে সক্ষম হননি। 'মানসী'তে এসেও প্রেমকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেহচেতনার অঙ্গীভূত করে দেখেছিলেন। এবং সেজন্যই তাঁর মানসিক বিক্ষোভ, ক্ষেত্র বিশেষে অশান্তিও দানা বেঁধেছে। কবি নিজেই মনে করতেন যে, বাসনার উত্তাপে প্রেমকে পাওয়া সম্ভব নয়। আর তাই তিনি লেখেনঃ
‘ নিভাও বাসনা-বহ্নি নয়নের নীরে।’ রবীন্দ্রনাথের মানবিক হৃদয় 'মানসী' নামক স্বপ্নপ্রতিমার আনুকূল্য লাভের জন্যেই সক্রিয় ছিলো। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আমরা দেখতে পাই যে, জীবনে কিছুই হারিয়ে যায় না। যে প্রকৃতি সৌন্দর্যমন্ত্রে কবিকে দীক্ষা দিয়েছিলো, সে চলে গিয়েছে আবার নতুন রূপে আসবে বলে।
প্রকৃতির ভেতর কবি গৌরবের সন্ধান পেয়েছেন। কবি এ-ও অনুভব করেন যে, আনন্দের যা কিছু, তা কখনো চিরতরে ধ্বংস করতে পারবে না কেউ। তিনি এ-ও মনে করতেন যে, সত্য ও সুন্দরকে চিরতরে ধ্বংস করতে পারবে না কেউ। আর সত্য, সুন্দর, কল্যাণ, আনন্দ একই সুরে গাঁথা। আত্মা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপসাগরের দর্শন ও বার্তা পাঠায়।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৪৮ বার পড়া হয়েছে