নিঃসঙ্গ এক কবি হাসান মোস্তফা
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
এক সময় দেদারচ্ছে কবিতা লিখেছেন কবি হাসান মোস্তফা। বাংলাদেশের এমন কোনো পত্রিকা নেই যেখানে তার লেখা ছাপা হয়নি। আমার সম্পাদিত 'লোকশব্দ' লিটল ম্যাগাজিনে তার একটি কবিতা ছাপার সৌভাগ্য হয়েছিল। বেশ কয়েকটি কবিতার পাণ্ডুলিপি কবির সংগ্রহে আছে। তার অনেক কবিতা পত্রপত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আশির দশকে কবিতা লিখে যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে হাসান মোস্তফা কবিতায় নিবেদিত ছিলেন। অথচ এই মানুষটি এখন বড়ই নিঃসঙ্গ, একাকী এবং কিছুটা নীরব।
কবির সাথে কথা বলতে বলতে কবির কাব্যগ্রন্থ 'সুবর্ণগাঁয়ে যাবো' পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে আমার মনে হলো, প্রকৃতই তিনি আপন মনে লেখেন। নিজের মতো করে লেখেন। ভালোবেসে লেখেন। প্রেম ঢেলে লেখেন। সুধা ঢেলে লেখেন। বিরহকে সঙ্গী করে লেখেন। তিনি কলমের তুলিতে কাগজের ক্যানভাসে যে ছবি আঁকেন তা প্রকৃতির, নদীর, বৃক্ষের, আকাশের, সাগরের, বাতাসের, মানুষের জীবনের, যৌবনের, আশার, হতাশার, প্রেমের, ভালোবাসার, সুখের, দুঃখের, দেশপ্রেমের, দশ প্রেমের, জীবের। আর সেগুলো হয়ে উঠেছে পৃথিবীর কণ্ঠস্বর, জীব ও জড়ের ভাষা। কবিতার সাথে যার এত প্রেম ছিল, সেই কবি এখন কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। বন্ধুহীন হয়ে গেছেন।
কবি পারকিনসন রোগে আক্রান্ত। তার হাত কাঁপে। আর কবিতা লিখতে পারেন না। ভাব আসে, ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। লরেন্স লেনের কুষ্টিয়ার বাসায় হঠাৎই গিয়ে উপস্থিত হলাম। পাশের বাড়িতে কবির ভাই থাকেন। তিনি আমাকে কবির রুমে পৌঁছে দিতে সাহায্য করলেন। আমাকে দেখে কবি হতাশার স্বরে বললেন, “আমাকে কেউ দেখতে আসে না। আপনি দেখতে এসেছেন, আমি খুব খুশি হয়েছি।” ঢাকায় অবস্থানকালে কাদের সাথে কবির সুসম্পর্ক ছিল, সেসব বিষয়ে গল্প করলেন। কবি আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণসহ অসংখ্য কবির নাম উচ্চারণ করলেন। কবি ও বিশিষ্ট ছড়াকার নাসের মাহমুদের সাথে তার বন্ধুত্বের কথা বললেন। নাসের মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিগদ্য লেখার ইচ্ছার কথা বললেন। দুঃখ করে বললেন, “এখন আর কিছুই লিখতে পারবো না, অথচ নাসের মাহমুদকে নিয়ে আগেই লেখা উচিত ছিল। নাসের মাহমুদের মতো বিনয়ী, ভদ্র, উচ্চচিন্তার মানুষ কালে ভদ্রে জন্মে। এখন কেউ কাউকে মূল্যায়ন করতে চায় না। নাসের মাহমুদের কবি বন্ধুরাও নাসেরকে নিয়ে কিছুই লিখছে না—এটি সত্যিই দুঃখের কথা। কুষ্টিয়ায় যারা একসাথে লেখালেখি করতাম, তারা কেউ ফোনও করে না। কেউ কেউ খুব অহংকারী হয়ে গেছে।
কবিকে শান্তস্বরে থামিয়ে দিয়ে বললাম, এখন সময় বদলে গেছে। আগেকার দিনে মানুষের সাথে মানুষের যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল, যে ভাব-ভালোবাসা ছিল, তা এখন আর সে ভাবে লক্ষ্য করা যায় না। এখন কেউ কারো খোঁজ রাখতে চায় না। কবিকে বললাম, আপনি তো দুঃখকে মেখে নিয়েছেন ‘দুঃখ বিষয়ক কবিতা’য়। আপনি লিখেছেন—
“চাঁদ যেমন দুঃখের শরীরে এঁকে দেয় জ্যোৎস্নার চুমু
পত্র-পল্লব তখন দুলে ওঠে জ্যোৎস্নার বৃষ্টিতে
আমিও তেমনি মেখে নিয়েছি
অবয়বে দুঃখের অবিনাশী চুমু,
দুলে উঠি আমিও একাকিত্বের দংশনে অবিরত।”
কবিকে দেখে আমার মনে হলো, এক ধরনের উদাসীনতা কবির মধ্যে জেঁকে বসেছে। মনে হলো তিনি দুঃখের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন। কবি বারবার তার অকালপ্রয়াত একমাত্র সন্তান মহসিন রেজার কথা বলছিলেন। বলছিলেন স্ত্রীর অসুস্থতার কথা আর নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের কথা। কবির দুঃখকাতরতা দেখে কবির লেখা একমাত্র কাব্যগ্রন্থ 'সুবর্ণ গাঁয়ে যাবো' কবিতার বই থেকে ‘দুঃখ রয়ে যায়’ কবিতাটি পড়তে লাগলাম—
“পৃথিবীর বুকে রেখেছে সমুদ্র ধরে
সমুদ্র কখনো বিক্ষুব্ধ এবং কখনো শান্ত
পৃথিবী সয়ে যায়, সমুদ্র রয়ে যায়
আমি বুকে রেখেছি দুঃখকে ধরে
কখনো দুঃখগুলো বিক্ষুব্ধ এবং কখনো শান্ত
আমি সয়ে যাই, দুঃখ রয়ে যায়।”
কবির বাসায় এক ঘণ্টার মতো ছিলাম। ফিরতে হবে। বিদায়বেলায় কবিকে বললাম, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। নিশ্চয় মহান রাব্বুল আলামিন আপনার সন্তান হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করবেন। আল্লাহ আপনার সুস্থতা, নেক হায়াত এবং দীর্ঘ জীবন দান করুন।
কবি হাসান মোস্তফার জন্ম (১৯৫৭– ) রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার কসবা মাজাইল গ্রামে হলেও, তিনি তার পিতার সাথে শৈশবেই কুষ্টিয়া শহরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কবির পিতা মোকাররম হোসেন ছিলেন মোহিনী মোহন বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক। কবি দীর্ঘদিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চাকরির সুবাদে ঢাকায় বসবাস করলেও, চাকরি শেষে আবার কুষ্টিয়ায় ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়া পৌরসভার পেছনে লরেন্স লেনের নিজস্ব বাড়িতে নিঃসঙ্গ বসবাস করছেন।
শুভ কামনা প্রিয় কবি। আশা করি সুস্থ হয়ে আবার কবিতার প্রেমে মেতে উঠবেন।
লেখক : কবি ও ছড়াকার
১৩২ বার পড়া হয়েছে