প্রসঙ্গ : তেলের লাইন
আমাদের ধৈর্য ও দায়িত্ববোধের অভাব চরমভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:৫০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সাতসকালে, এদের কাজই কি তেল নিতে আসা? আর কোনো কাজ নেই? হোন্ডা ছাড়া এরা এক পা-ও ফেলতে পারেন না? জীবনে কখনোই বুঝি এরা হোন্ডা ছাড়া চলেন নাই?
কেউ রাত তিনটায় এসে দাঁড়িয়েছেন, কেউ খুব ভোরে, কেউ সকালে এসেছেন। বয়স্ক থেকে শিশুরা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রয়েছেন তেলের লাইনে।
এই লাইনগুলোতে যে সব আলাপ-আলোচনা কথাবার্তা চলে তা বলা যাচ্ছে না। কতটুকু যে নৈতিকতার অবক্ষয় আর অবনতি হয়েছে আমাদের, তা সেদিন সরেজমিনে ঘুরে দেখলাম।
বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম তেলের লাইনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। পাম্পের তেল দেওয়ার দৃশ্যও দেখলাম। সেখানে অনেক বোতল পার্টি চোখে পড়ল। কেউ নিজের জন্য বোতল এনেছে, কেউ ক্ষমতাধর মিয়া ভাইয়ের জন্য এনেছেন।
তেল নিয়ে তুলকালাম শুরুর পর থেকে আজ অবধি পাম্পে যাইনি আমি নিজে। হোন্ডা বাইরে বের করি নাই এখনো পর্যন্ত। অনেকেই চুপচাপ আছেন এবং দেখছেন শেষ পর্যন্ত কী হয়!
অথচ আমি নির্বিঘ্নে বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোনো প্রকার সমস্যা কিংবা অসুবিধা মনে হচ্ছে না আমার কাছে। আমি তো পায়ে হেঁটে, ভ্যানে, রিকশায় চড়ে ও সাইকেল চালিয়ে ঘুরে-ফিরে বেড়িয়েছি দুই যুগ আগেও। তখন পেরেছি, এখনো পারব। তাই -----
আসলে শুধু পাবলিক ও মালবাহী গাড়িঘোড়া, কলকারখানা, হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ এমন জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর তেল বেশি দরকার ছিল। আর যারা আমার মতো পাবলিক, বিকল্প চলাচলের উপায় আছে, তারা কেউ যেন তেল নিতে পাম্পে না যান।
অর্থাৎ তেলের পেছনে ঘুরে সময় নষ্ট না করেন। তাহলেই পাম্প ফাঁকা হয়ে যাবে। পাম্প মালিকেরা কোনো বিক্রেতা পাবে না। তখন তারাই তেলের ক্রেতা খুঁজে বেড়াবে। আর তারা মাইকিং করবে, তেল লাগবে ভাই তেল! লাগবে তেল! দেবো তেল!
কিন্তু তা আর হলো না।
আমি তেল না নিয়েও ঘুরে বেড়াচ্ছি। ভেবেছিলাম আরও অনেকেই এমন করবেন। কেউ কেউ বলেন, আপনার মতোই বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরব। হয়তো হয়ে ওঠে না।
এই তো কিছুদিন আগে যিনি হোন্ডা কিনেছেন, ঠিকমতো অভ্যাসও গড়ে ওঠেনি, সেও প্রায় কোয়ার্টার কিলোমিটার দূরে লাইনে দাঁড়িয়ে ফোনে আরেকজনকে হেসে হেসে বলছেন, ভাই লাইনে আছি। সবমিলিয়ে ৩/৪ ঘণ্টার মতো লাগতে পারে তেল পেতে।
আমার মনে করি, ওই ব্যক্তির তেলটা নেওয়ার কী দরকার ছিল! সেই টাকায় ভ্যান, রিকশা কিংবা অটোতে চড়ে বেড়াতেন। মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছে তেলের লাইনে বকাবকি, বাগবিতণ্ডা, হাতাহাতি, মারামারি হচ্ছে। নানা কারণে বারবার ছুটে যেতে হচ্ছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশকে। সারাদিন তেলের পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে একজন (ট্যাগ অফিসার) অফিসারকে। তবুও শৃঙ্খলা ফিরছে না।
সবচেয়ে বড় কথা, উতলা না হয়ে আমাদের উচিত একটু নয়, বরং যথেষ্ট ধৈর্য ধারণ করা। সেই সঙ্গে আমাদেরকে যথেষ্ট সভ্যও হতে হবে।
উল্লেখ্য -
তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের সামাজিক আচরণ ও নৈতিকতার পরীক্ষা। এর মধ্যে ধৈর্য, সভ্যতা ও দায়িত্ববোধের অভাব চরমভাবে প্রকাশ পায়। আমাদের উচিত ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সমাজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তেলকে কেন্দ্র করে ধৈর্য ও নৈতিকতার চর্চা করা একটি সামাজিক দায়িত্ব।
লেখক: সাংবাদিক।
(লখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
২৮০ বার পড়া হয়েছে