সর্বশেষ

ফেবু লিখন

নিকোর পদক, কেইনের দৌড় আর সেই আমিটা

মুনিরুছ সালেহীন
মুনিরুছ সালেহীন

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬ ৬:০১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ফুটবলের বিশ্বকাপ সত্যিকার অর্থেই দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ। তা না হলে আমার মতো এত মৌসুমি, চার- বছরে- একবার- ফুটবল ফ্যান-হয়ে ওঠা লোক যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি, প্রাত্যহিক নিয়ম ভেঙে রাত ১ টা, ২টা বা তিনটায় খেলা দেখে! শুধু কি আমি? আমার বউ যে ফুটবলের অফসাইড বোঝে না, দলগুলির পরিচয়ও কম জানে,সেও মাতে এই উৎসবে। তবে সে এটা বোঝে ফুটবলকে পায়ে ধরে রাখা, ড্রিবলিং কিংবা পাস - সত্যিই এক নিপুণ আর্ট। সেটা দেখতেই যেন তার রাত দুপুরে টিভি সেটের সামনে বসা। কে হারল, কে জিতল এটা তাকে মাতায় না।

বিশ্বকাপ জুড়ে কত রোমাঞ্চ, কত উত্তেজনা, হাসি কান্না, কত যে গল্প ছড়ায়। এবারের বৃহত্তম বিশ্বকাপে তা ছিল আরো টান টান। তবে ফাইনালে স্পেনের প্রত্যাশিত নান্দনিক ফুটবল, দুর্দান্ত দাপুটে খেলা কিংবা আর্জেন্টিনার অপ্রত্যাশিত বাজে খেলা- এ সব কিছু ছাড়িয়ে ফাইনালের খেলা-উত্তর দুটি ঘটনা আমাকে মাতিয়েছে, উদ্বেলিত করেছে। হয়তো এজন্যই যে এ দুটো ঘটনাকে আমি নিবিড়ভাবে রিলেট করতে পারি নিজের জীবনের সাথে।

সম্ভবত বদলী খেলোয়াড় হিসেবে নেমেছিলেন স্পানিশ প্লেয়ার নিকো উইলিয়ামস। খেলার শেষ পর্যন্ত নজরকাড়া খেলা খেলেছেন। অবিস্মরণীয় স্প্যানিশ জয়ের পর
সহযোদ্ধারা যখন মাঠে দলীয় ট্রফি নিয়ে উদযাপন করছিল, তখন উইলিয়ামস গ্যালারির দিকে ছুটে যান তার স্বর্ণপদকটি মা মারিয়া আর্থারের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। ফুটবলে তার প্রতিটি জয়ই নাকি এভাবে উদযাপন করেন নিকো।
কেন?

মায়ের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা। নিকোর জন্মের আগে, তার বাবা-মা সাহারা মরুভূমি জুড়ে ৩,২০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটে পৌঁছেছিলেন স্পেনে।
যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি তাঁর চ্যাম্পিয়নশিপের সমস্ত কৃতিত্ব সবসময় তাঁর মাকে দেন, তখন উইলিয়ামস বলেছিলেন: "আমি খুব দ্রুত দৌড়াই, কিন্তু আমি আমার মায়ের মতো দ্রুত দৌড়াতে পারি না, কারণ তিনি একবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে সাহারা মরুভূমি পার হয়েছিলেন... আমি পদকটি আমার মাকে দিয়েছি কারণ তিনি অন্য যে কারো চেয়ে এটির বেশি যোগ্য।"

স্টেডিয়ামে নিকোর পদক নিয়ে মায়ের কাছে যাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে নিয়ে যায় প্রায় চল্লিশ বছর আগে, আমার মায়ের কাছে।
নিকোর মায়ের মতো এতো শারীরিক কষ্টের মুখোমুখি না হলেও আমার মাও কম বড় জীবনযোদ্ধা নন। মাত্র পয়ত্রিশ বছর বয়সে যখন তিনি স্বামীহারা হন তখন তিনি নয় সন্তানের জননী। সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রামীণ পরিবেশে এই অবস্থায় তাদের পথে রাখতে, শিক্ষিত করতে, মানুষ করতে কী যুদ্ধটাই না তাঁকে করতে হয়েছে। তিনি শিখিয়েছেন কম পেয়ে, কম খেয়ে কীভাবে সন্তুষ্ট, অনুযোগহীন থাকতে হয়, কীভাবে চারদিকের কদর্যতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হয়, কীভাবে আত্মবিশ্বাস আর আত্মমর্যাদায় দাঁড়াতে হয়।

মনে পড়ে অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট পেয়ে দ্রুত ছুটে এসেছিলাম বাড়ি। যখন বাড়ি পৌঁছেছি মা তখন জোহরের নামাজের জন্য জায়নামাজে। যমজ বোন দীপু হঠাৎ আমাকে দেখে অবাক। আমার ভেতরের আনন্দ উদ্ভাসিত মুখ খেয়াল করে সে জিগ্যেস করে, কি রে, কী খবর, খুব খুশি খুশি লাগতাছে তরে! আমি কিছু বলি না। অপেক্ষা করি মা কখন জায়নামাজ থেকে উঠবেন। তারপর মা'র নামাজ শেষ হতেই মায়ের পা ছুঁয়ে জানাই, ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছি, ফার্স্ট হয়েছি।আহহহ, মায়ের স্বর্গীয় আনন্দে উদ্ভাসিত সেই মুখ! বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে মা বলেন, কী করবো এখন? কোলে তুলে নেব? পাশে দাঁড়ানো দীপুর চোখও আনন্দে অশ্রুসজল। সে বলে, বদমাইশ, এতক্ষণ কীভাবে চুপ মেরেছিলি!

বিশ্বকাপ ফাইনালের উদযাপনে নিকো উইলিয়ামস বা তার মা'র চেয়েও বেশি আলোচিত ও ভাইরাল হয়েছে স্প্যানিশ দলের কিশোর তারকা ল্যামিনে ইয়ামালের তিন বছর বয়সী ভাই কেইন। ভাইয়ের খেলার বিভিন্ন মুহূর্তে তার অভিব্যক্তি, ফাইনালের পর মাঠে তার দৌড়ঝাপ, ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি, ভাইয়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়া- শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত দূরন্তপনা আর অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ দেখিয়ে কেইন কেড়ে নিয়েছে প্রচারের আলো। ইয়ামাল জানিয়েছে সে তার এই সৎ ভাইকে (একই মা, ভিন্ন বাবা) ভালোবাসে নিজের সন্তানের মতো, উপভোগ করে ওর যাবতীয় দুষ্টুমি।

কত বার যে দেখেছি ইয়ামাল, কেইনের ভিডিও ক্লিপগুলো! নিজের শৈশবের সাথে মিল খুঁজে পেয়েই মনে হয় চোখ ভিজে গেছে বার বার, ফিরে গেছি নিজের শৈশবে।
পিতৃহীন পরিবারে নয় ভাইবোনের সবার ছোট আমি।(সাথে জমজ বোন)। কেইনের মতো এমনি আদরের ছিলাম আমিও। কেইনের সাথে ইয়ামালের বয়সের যেমন পার্থক্য, তেমনি পার্থক্য আমার সাথে আমাদের বড় ভাই- দাদার। কী স্নেহটাই না করতেন আমাদের জমজ দু ভাইবোনকে! বিশেষ করে আমাকে।

চাকরি থেকে এক বার বাড়ি ফিরে শোনেন আমরা দুজন নান্টু দা'র সাথে বেড়াতে গেছি বড় বোনের শ্বশুর বাড়ি। সেই বাড়ি খুব বেশি দূরে না হলেও সেখানে যেতে বালিপাড়া দিয়ে পাড়ি দিতে হয় প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র। নান্টু দা তখন ১৫/১৬ বছরের কিশোর। সে-ই আমাদের নিয়ে বেড়াতে গেছে শুনে দাদা রাগে অগ্নিশর্মা হন, পাগলের মতো আচরণ করতে থাকেন । তিনি যেন দিব্য চোখে দেখছেন ফেরিতে নদী পার হতে যেয়ে আমরা একজন পড়ে যাচ্ছি, নান্টু দা তাকে সামলাতে গিয়ে অন্যজন পড়ছি নদীতে। মাকে প্রায়- চূড়ান্ত রায় দিয়ে জানিয়ে দেন, এমন আহাম্মকি কেউ

করে (নান্টু দার মতো কিশোরের সাথে আমাদের পাঠায়)! বলেন, মায়ের বিছানা আর কখনো পূর্ণ হবে না!

ছোট ভাইবোনের জন্য কী পরিমাণ ভালোবাসা থাকলে একজন বড় ভাই তাদের নিয়ে এত কনসার্নড হতে পারেন!

অন্যান্য ভাইবোনেরা পরিবারের একমাত্র ব্রেড উইনার বড় ভাইয়ের সামনে শ্রদ্ধায় ভয়ে চুপসে থাকলেও শিশু আমি ঘুমন্ত দাদার হাত পা শাড়ির পাড় দিয়ে বেঁধে রাখার দুষ্টুমি থেকে বিরত হইনি। শৈশবে ও কৈশোরে গ্রামের বাড়িতে, তার বাসায় আমার হাজারো দুষ্টুমি, ইতরামি হাসিমুখে সহ্য করেছেন দাদা। ছোট অন্যদের পান থেকে চুন খসলে যথেচ্ছ বকাঝকা করেছেন, আমাকে তাও করেননি।

দাদা বাড়ি আসলে তার প্যান্টের পকেট থেকে খুচরো পয়সা সরানোর জন্য প্রতিযোগিতা চলতো আমার আর দীপুর মধ্যে। পয়সা পেয়ে নিজেদের বাহাদুর মনে করতাম, আর ভাবতাম দাদা কিছুই বুঝতে পারেন না। পরে মা'র কাছে সেই বাহাদুরি শোনাতে গিয়ে জেনেছি আমাদের নেয়ার সুবিধার জন্যই দাদা বেশি করে খুচরা পয়সা রেখে দিতেন পকেটে।

শুধু দাদা নন, বড় অন্য ছয় ভাইবোনেরও হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসায় বড় হয়েছি আমি। বড় আপা, বেবি আপা, নান্টু দা, পারু দা, লিলি আপা, সফু দা- কার কথা লিখব! এত আদর, এত স্নেহ, এত প্রশ্রয় আর কোন ছোট ভাই কবে পেয়েছে!

বিশ্বকাপ ফাইনালের ভাইরাল ঘটনা খুলে দিয়েছে একজন সাধারণ মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতির দুয়ার, করেছে নস্টালজিয়াক। তাই নিকোর মায়ের ছবিতে নিজের মাকে, কেইনের ছবিতে নিজেকে আর ইয়ামালের মধ্যে দেখছি আমার ভাইবোনদের।

টিভির স্ক্রিনে এখন আর কোনো খেলা দেখছি না। তবে প্রায় প্রতিদিনই কোনো কোনো ঘটনা কিংবা কোনো স্মৃতির হাত ধরে দেখি জায়নামাজে বসা আমার মাকে, আর দাদার পকেট থেকে পয়সা চুরি করা সেই ছোট্ট আমিকে।

আহহ, কোথায় হারিয়ে গেছে সেই ছায়াময়, মায়াময়, ভালোবাসাময় সময়!

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১২৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন