আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস
খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও আমদানিনির্ভরতা কাটেনি
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:৩১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল ও গম আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্যের মজুত ২২ লাখ টন ছাড়িয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন আগামীর সমৃদ্ধি’।
দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে আমদানির প্রয়োজন ফুরাচ্ছে না। খাদ্যশস্যের উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারমূল্য এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিকল্পিত আমদানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫১০ টন চাল ও গম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে চাল ৩০ হাজার ৭৩০ টন এবং গম ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৭৮০ টন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের মাধ্যমে এসব খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে।
গত অর্থবছরে দেশে মোট ৮৬ লাখ ২ হাজার ৮০ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়। এর মধ্যে চাল ছিল ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টন এবং গম ৭৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯০ টন। পরিসংখ্যান বলছে, বিশেষ করে গমের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, আমদানি কমাতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ জন্য কৃষিতে নতুন উদ্ভাবন প্রয়োজন। সরকার বলছে, উৎপাদন বাড়ছে। তবে আমদানির তথ্যও দিচ্ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্যের মোট মজুত ছিল ২২ লাখ ৭১ হাজার ২২৬ টন। এর মধ্যে চাল ১৯ লাখ ৫৫ হাজার ৭৫৪ টন, গম ৩ লাখ ১২ হাজার ৭৩ টন এবং ধান ৫ হাজার ২৩০ টন। ভাসমান মজুতসহ মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭৪ টন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে ধান, সেদ্ধ চাল, আতপ চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি পর্যায়ে মোট ১৮ লাখ ৪ হাজার ২ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুত থাকা সরবরাহব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক। তবে মজুত থাকলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান, মৌসুমভিত্তিক সরবরাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনের ওপর আমদানির সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
বিশেষ করে গমের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় আমদানির প্রয়োজন রয়েছে। চালের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় আমদানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি দেশীয় কৃষকদের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। অথচ নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং মাটির জৈব উপাদান কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দীর্ঘ মেয়াদে কৃষির উৎপাদনক্ষমতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা এক হাজার কোটিতে পৌঁছাতে পারে। সীমিত জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
এ পরিস্থিতিতে কৃষিতে উদ্ভাবন বলতে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি বা উন্নত বীজের ব্যবহার বোঝায় না। মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী সার প্রয়োগ, সাশ্রয়ী উপায়ে পানির ব্যবহার, রোগবালাই আগাম শনাক্তকরণ, ফসলের বহুমুখীকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়াও এর অংশ।
একই সঙ্গে উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে খাদ্য পৌঁছানো পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। সংরক্ষণ ও পরিবহনে অপচয় কমানো গেলে উৎপাদিত খাদ্যের আরও বেশি অংশ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন আগামীর সমৃদ্ধি’। বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষির টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের বিষয়গুলো সামনে রেখে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্যও এবারের প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার নাগালে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা আরও জোরদার করতে কৃষিতে উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম ফসলের জাত উদ্ভাবন, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণনব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর সুফল কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তারা যাতে সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন, সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য তাই শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান নয়; বরং কৃষি, পরিবেশ, পুষ্টি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠারও বার্তা। পরিকল্পিত উৎপাদন, কার্যকর মজুত ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনভিত্তিক আমদানি এবং কৃষিতে উদ্ভাবনের সমন্বয়ই পারে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে।
১১০ বার পড়া হয়েছে