সঞ্চিতা: দ্রোহ, প্রেম ও মানবতার অখণ্ড দলিল
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য সংকলন কাজী নজরুল ইসলামের ‘সঞ্চিতা’। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থে বিদ্রোহী কবির বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা, শোষিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, নারীর সমমর্যাদা, প্রেম-বিরহ এবং সাম্যবাদী দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও ‘সঞ্চিতা’র কবিতাগুলো অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে সাহস জোগায়।
পুরোনো বইয়ের তাক থেকে ধূসর হয়ে আসা একটি মলাট হাতে নিলে আজও যেন এক অদ্ভুত উত্তাপ টের পাওয়া যায়। বইটির নাম ‘সঞ্চিতা’। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এক প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, যা শতবর্ষ পেরিয়ে এসে আজও স্থির হয়নি। কাজী নজরুল ইসলাম নামক এক অমোঘ ধূমকেতু যেদিন বাংলার আকাশপটে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সেদিন ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ সমাজ হয়তো প্রস্তুত ছিল না এমন তীব্র আলোকের জন্য। নজরুলের সমগ্র জীবন, তাঁর দ্রোহ, তাঁর অভিমান এবং তাঁর নিঃসঙ্গতার এক অখণ্ড দলিল এই ‘সঞ্চিতা’। এটি কেবল কতগুলো কালজয়ী কবিতার সংকলন নয়; পাতা উল্টালে মনে হয়, একটি জীবন্ত হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে কাগজের ভেতরে। ১৯২৮ সালে যখন এই গ্রন্থ প্রথম আলোর মুখ দেখে, ভারতবর্ষ তখন এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কটের আবর্তে। একদিকে পরাধীনতার গ্লানি, অন্যদিকে হিন্দু-মুসলমানের ভ্রাতৃঘাতী অবিশ্বাস। এমন এক দমবন্ধ করা সময়ে ‘সঞ্চিতা’ যেন ছাইচাপা আগুনে ফুঁ দিয়ে জ্বলে ওঠা এক দাবানল। কিন্তু এ আগুন কেবল পোড়ায় না, এ আগুন পথও দেখায়। ‘সঞ্চিতা’র ভেতর দিয়ে হাঁটলে মনে হয় যেন কোনো গহীন অরণ্যে প্রবেশ করা গেছে, যেখানে একদিকে দাবানল জ্বলছে, আবার তার ঠিক পাশেই বয়ে চলেছে এক সুশীতল, ঝিরঝিরে পাহাড়ি ঝরনা। দ্রোহ আর প্রেমের এমন আশ্চর্য সহাবস্থান পৃথিবীর সাহিত্যে খুব বেশি চোখে পড়ে না।
বইয়ের একেবারে প্রথম দিকের পাতায় চোখ রাখলে একটি উৎসর্গপত্র নজরে আসে। ‘বিশ্বকবিসম্রাট শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু’। ছোট্ট এই বাক্যটির ভেতর লুকিয়ে আছে এক ঐতিহাসিক বিনয় এবং এক অদ্ভুত সুন্দর সম্পর্ক। এটি বাংলা সাহিত্যের দুই ভিন্ন মেরুর, দুই ভিন্ন মনস্তত্ত্বের এক অপূর্ব মিলনসেতু। রবীন্দ্রনাথ যেখানে শান্ত সমাহিত, অসীমের ধ্যানে মগ্ন; নজরুল সেখানে অশান্ত, সসীমের মাঝে অসীমের শৃঙ্খল ভাঙার হুঙ্কারে মত্ত। একজন যেন ভোরের স্নিগ্ধ আলো, অন্যজন মধ্যাহ্নের খরতাপ আর কালবৈশাখীর তাণ্ডব। অথচ, এই উৎসর্গের মধ্য দিয়ে নজরুল যেন বুঝিয়ে দিলেন, শেকড়কে অস্বীকার করে কোনো মহীরুহ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। চিরায়ত ঐতিহ্যের প্রতি এই দায়বদ্ধতাই নজরুলের বিদ্রোহকে উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে রক্ষা করে এক দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছিল।
‘সঞ্চিতা’র পাতা খুললেই প্রথমে এসে আছড়ে পড়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই কালজয়ী গর্জন।
"বল বীর
বল উন্নত মম শির!"
পড়তে পড়তে পাঠকের নিজেরই যেন শিরদাঁড়া সোজা হয়ে যায়। এই কবিতাটি কোনো সাধারণ পঙ্ক্তিমালা নয়, এটি পরাধীন ও শোষিত মানুষের বহু যুগের অবদমিত আর্তনাদের এক আগ্নেয়গিরি। ফ্রেডরিখ নিৎসে তাঁর দর্শনে যে ‘উবারমেনশ’ বা অতিমানবের কল্পনা করেছিলেন, যে মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নেয়, প্রচলিত দাসসুলভ নৈতিকতার শৃঙ্খল ভেঙে নিজের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ ঠিক সেই অতিমানবেরই এক জীবন্ত, রক্তমাংসের রূপ। কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ পাশ্চাত্যের শুষ্ক দর্শনের মতো কেবল বুদ্ধিদীপ্ত নয়, তা মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের ঘাম আর রক্তে ভেজা।
"আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত বুকে গতি ফের।"
এখানেই নজরুলের স্বকীয়তা। তাঁর প্রলয় কেবল ধ্বংসের জন্য নয়। লোহা আগুনে না পুড়লে যেমন ইস্পাত হয় না, তেমনি পুরনো, জরাজীর্ণ, পচা-গলা সমাজকে চূর্ণ না করলে নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে পারে না। এই ধ্বংস এক গভীর মমত্ববোধ থেকে উৎসারিত। পার্সি বিশি শেলির ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’-এর মতোই এখানে মানুষের অধিকার এক স্বর্গীয় উচ্চতা লাভ করে। এই কবিতায় একই নিশ্বাসে উচ্চারিত হয় গ্রিক পুরাণের অরফিয়াসের বাঁশরি, হিন্দু পুরাণের নটরাজের তাণ্ডব এবং ইসলামি ঐতিহ্যের ইস্রাফিলের শিঙার মহা-হুঙ্কার। শব্দের এই যে অপূর্ব মিথস্ক্রিয়া, তা নজরুলকে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা ধর্মের কবিতে আবদ্ধ না রেখে সমগ্র মানবতার কবিতে রূপান্তরিত করেছে।
তত্ত্বের চশমা পরে খুঁজলে ‘সঞ্চিতা’য় মার্ক্সবাদের ছায়া দেখা যেতে পারে, উত্তর-উপনিবেশবাদের গন্ধ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু নজরুলের সাম্যবাদ কোনো বিদেশি ইশতেহার থেকে ধার করা ছিল না। তাঁর সাম্যবাদ জন্মেছিল বাংলার ধুলোমাটি থেকে, এক চরম দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। বিদ্রোহের এই প্রচণ্ড দাবানলের ঠিক পরেই ‘সঞ্চিতা’য় বেজে ওঠে সৃষ্টির এক অদ্ভুত মাতাল করা সুর ‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’।
"আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্ললে
বান ডেকে ঐ জাগ্ল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে!"
কী নিদারুণ এক বৈপরীত্য! যে মানুষটি একটু আগে মহাপ্রলয়ের নটরাজ রূপে ধ্বংসের তাণ্ডব চালাচ্ছিলেন, তিনিই আবার সৃষ্টির আনন্দে শিশুর মতো হেসে উঠছেন। কবির কাছে ভাঙা এবং গড়া এক মুদ্রারই এপিঠ-ওপিঠ। হাসির সাথে এখানে মিশে আছে আসল কাঁদন, মুক্তির সাথে মিশে আছে আসল বাঁধন। শূন্য বা রিক্ত বুকের দুঃখের মাঝেও যে এক অপার সৃষ্টিসুখ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কেবল একজন সংবেদনশীল শিল্পীই অনুভব করতে পারেন।
নজরুলকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’র খাপে বন্দি করে রাখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। ‘সঞ্চিতা’র পাতায় পাতায় কান পাতলে শোনা যায় এক বিরহী প্রেমিকের চাপা দীর্ঘশ্বাস। যে হৃদয় প্রবলভাবে ভালোবাসতে জানে না, সে হৃদয় কখনো তীব্রভাবে প্রতিবাদ করতে পারে না। ‘পূজারিণী’ কবিতাটি এর এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
"এতদিনে অবেলায়
প্রিয়তম!
ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণী সম
দিবা যামী
যবে আমি
নেচে ফিরি রুধিরাক্ত মরণ-খেলায় "
এখানে প্রেমিকের যে আকুতি, যে নিঃসঙ্গতা এবং আত্মসমর্পণের সুর বেজে উঠেছে, তা পাঠকের হৃদয়কে এক অজানা হাহাকারে পূর্ণ করে দেয়। অস্তিত্ববাদের চরম একাকিত্ব যেন এখানে রূপ পেয়েছে। জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামু মানুষের যে নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন, নজরুল তাঁর কবিতায় সেই যন্ত্রণাকে এক মহাজাগতিক রূপ দিয়েছেন। প্রেম এখানে কোনো জৈবিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক শুদ্ধি। ‘পূজারিণী’তে মন্দির, দেবতা এবং প্রেমের যে রূপক ব্যবহৃত হয়েছে, তা বৈষ্ণব পদাবলির রাধাতত্ত্বের এক আধুনিক ও মর্মান্তিক সংস্করণ।
এই বিরহ ও অভিমানের সবচেয়ে তীব্র রূপ দেখা যায় ‘অভিশাপ’ কবিতায়।
"যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে!"
এটি কি শুধুই কোনো প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের অভিমান? নাকি এই অভিশাপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর আশীর্বাদ এবং নিজেকে স্মৃতিতে অমর করে রাখার এক প্রবল আকুতি? কবি যখন বলেন, "পড়বে মনে আমার সোহাগ, কণ্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ," তখন এই অভিশাপ আসলে পরিণত হয় এক চরম আত্মিক সমর্পণে। ভালোবাসার কাছে মানুষের এই যে স্বেচ্ছায় পরাজিত হওয়া, এই পরাজয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রেমের প্রকৃত জয়। মানুষের জীবনে প্রেম আসে কখনো কালবৈশাখী হয়ে, কখনো বা শরতের শিউলি হয়ে। নজরুলের কাছে প্রেম ছিল সেই শিউলি ফুল, যা ঝরে গিয়েও সুবাস ছড়ায়।
নারী ও পুরুষের সম্পর্কেরগ জায়গাটিতে ‘সঞ্চিতা’ এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে রেখেছে, যা আজও, এই ২০২৬ সালেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন নারীবাদ কেবল ইউরোপের বইয়ের পাতায় আটকে ছিল, তখন নজরুল লিখছেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এই পঙ্ক্তিগুলো আজ হয়তো অনেকের কাছে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সময়ের অন্ধকার, রক্ষণশীল সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলার জন্য যে বুকের পাটা দরকার ছিল, তা নজরুলের ছিল। তাঁর কাছে নারী কেবল প্রেমিকা বা মাতা নয়, নারী হলো সমান অংশীদার। নারী শক্তির উৎস। লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে এমন সহজ, অকপট এবং অকাট্য যুক্তি তিনি দিয়েছেন, যা আজও আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা বৈষম্যের দিকে আঙুল তোলে।
সিমন দ্য বোভোয়ার তাঁর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে নারীকে বস্তু হিসেবে দেখার যে সমালোচনা করেছিলেন, নজরুল তার বহু আগেই কবিতায় সেই একই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি নারীকে কেবল মাতা, কন্যা বা বধূ হিসেবে নয়, বরং সমাজ বিনির্মাণের সমান অংশীদার ও পূর্ণাঙ্গ ‘মানুষ’ হিসেবে দেখেছেন। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় তিনি সমাজের তথাকথিত পতিতা নারীদের ‘মাতা’ বলে সম্বোধন করে যে মানবিক সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পাপে নিমজ্জিত মানুষের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং পাপের কারণগুলো অনুসন্ধান করার এবং পতিত মানুষকে বুকে টেনে নেওয়ার এই যে মানবতা, এটাই নজরুলের আত্মার বিশালতা।
নজরুলের ভাষারীতি নিয়ে ভাবলে আজও বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। তৎসম শব্দের গম্ভীর, ভারী চালের ঠিক পাশেই তিনি বসিয়ে দিলেন আরবি, ফারসি শব্দের সাবলীল স্রোত। যেন গ্রামের কোনো দাওয়ায় পাশাপাশি বসে গল্প করছে ভিন্ন ধর্মের দুই বৃদ্ধ। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো অস্বস্তি নেই। মিখাইল বাখতিনের বহুস্বরতত্ত্বের কথা হয়তো একাডেমীয় মহলে খুব উচ্চারিত হয়, কিন্তু নজরুল কোনো তত্ত্ব না জেনেই বাংলার রাজপথের, হাটের, বাজারের ভাষাকে কবিতার ছন্দে এমনভাবে বাঁধলেন যে, তা হয়ে উঠল এক ঐন্দ্রজালিক সুর। তাঁর ছন্দের যে দ্রুতলয়, মাত্রাবৃত্তের যে ঘোড়ার খুরের মতো দাপট, তা পাঠককে এক অদ্ভুত রণোন্মাদনায় মাতিয়ে তোলে। মনে হয়, যেন বুকের ভেতর দামামা বাজছে। এই ভাষা, এই শব্দশৈলী কোনো ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য থেকে আসেনি; এসেছে সরাসরি মানুষের বুকের স্পন্দন থেকে।
তবে, ‘সঞ্চিতা’র কেবল এক পিঠে যদি দ্রোহ আর সংগ্রামের আগুন থাকে, তবে অন্য পিঠে রয়েছে এক বুকভাঙা, নীরব কান্না আর প্রেমের অতলস্পর্শী বিষাদ। বিদ্রোহী কবি নজরুলের আড়ালে যে একটা চরম অভিমানী, সংবেদনশীল এবং বিরহী মন লুকিয়ে ছিল, তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে ‘অভিশাপ’, কিংবা ‘গোপন প্রিয়া’র মতো কবিতাগুলোতে। ‘অভিশাপ’ কবিতার সেই অমোঘ লাইনগুলো কার না মনে পড়ে ‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে! / অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে / বুঝবে সেদিন বুঝবে!’ এই যে অভিমান, এই যে নিজেকে মুছে ফেলে প্রিয়জনকে এক চিরস্থায়ী শূন্যতার মাঝে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার আকুতি এ তো কোনো পাষাণ বিদ্রোহীর কথা নয়! এ এক চরম অভিমানী প্রেমিকের কথা, যে প্রেমের ভেতর কোনো পাওয়া নেই, আছে কেবল এক পবিত্র দহন। নজরুলের এই বিরহবোধ রোমান্টিক কবিদের মতো কেবল দীর্ঘশ্বাস নয়, এটি এক ধরনের আগুন যা আত্মাকে পুড়িয়ে খাঁটি করে। প্লেটোনিক প্রেমের কাছাকাছি গিয়েও তা আবার মাটির মানুষের রক্তমাংসের আকাঙ্ক্ষায় ভিজে ওঠে। আবার সুফিবাদের পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের যে ব্যাকুলতা, তা-ও তাঁর প্রেমের কবিতার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে।
প্রকৃতি নজরুলের কবিতায় কোনো শান্ত, সমাহিত ক্যানভাস হয়ে আসেনি। প্রকৃতি এসেছে তাঁর নিজেরই মনের ছায়া হয়ে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, কালবৈশাখীর প্রলয়নাচন, মরুভূমির রুক্ষতা সব কিছুই যেন কবির সেই অস্থির সত্তারই বহিঃপ্রকাশ। ‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ কবিতায় যখন তিনি লেখেন, ‘আজ হাসল আগুন, শ্বাসল ফাগুন, / মদন মারে খুন-মাখা তূণ,’ তখন প্রকৃতির রূপ আর তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল উন্মাদনা একাকার হয়ে যায়। রোমান্টিক কবিরা যেখানে প্রকৃতির নিভৃত ছায়ায় আশ্রয় খোঁজেন, নজরুল সেখানে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে চান। তিনি প্রলয়কে ভয় পাননি। ধ্বংসের স্তূপ থেকেই যে নতুন প্রাণের বীজ অঙ্কুরিত হয়, এই চরম সত্যটি তিনি বুঝেছিলেন। পুরাতনের বিনাশ ছাড়া যে নতুনের আগমন অসম্ভব, ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় তারই জয়গান গীত হয়েছে। ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!’ এটি তো কেবল ঝড় নয়, এটি স্থবির সমাজের বুকে এক প্রবল ঝাঁকুনি, যাতে মৃত পাতাগুলো ঝরে গিয়ে নতুন কুঁড়ির জায়গা করে দিতে পারে। ‘সঞ্চিতা’র পাতায় থাকা প্রকৃতি রুদ্র, অশান্ত এবং মানুষের মনের অবস্থার সাথে একাত্ম। ‘সিন্ধু’ কবিতায় সমুদ্র কেবল একটি জলের আধার নয়, এটি অনন্ত বিরহের এক জীবন্ত প্রতীক।
"হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর, হে চির-বিরহী,
হে অতৃপ্ত! রহি’ রহি’
কোন্ চেতনায়
উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?"
সাগরের এই গর্জন, এই আছড়ে পড়া ঢেউ সবই যেন কবির নিজের ভেতরের অস্থিরতা ও অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ। কালবৈশাখীর ঝড়, ঝরাপাতা, চৈতি হাওয়া এগুলো নজরুলের কবিতায় কেবল দৃশ্যপট নয়, বরং এরা এক একটি চরিত্র হয়ে ধরা দেয়। প্রকৃতি এখানে মানুষেরই যন্ত্রণায় সমব্যাথী, মানুষেরই বিদ্রোহের সাথী।
‘সঞ্চিতা’র পাতায় পাতায় আমরা খুঁজে পাই এক আশ্চর্য আধুনিকতাকে। তবে এই আধুনিকতা ইউরোপের অনুকরণে তৈরি হওয়া কোনো নৈরাশ্যবাদী আধুনিকতা নয়। ১৯২০-এর দশকে যখন সাহিত্যে একধরনের বিচ্ছিন্নতা আর হতাশার সুর ঢুকতে শুরু করেছে, নজরুল তখন আধুনিকতাকে নিয়ে গেলেন সাধারণ মানুষের ঘামের কাছে, ধুলোর কাছে। অভাব, অনাহার, কারাবরণ, মজুরের ঘাম, কৃষকের রোদে পোড়া পিঠ এসবই তাঁর কাব্যের বিষয় হয়ে উঠল। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি যখন প্রশ্ন করেন, ‘রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, / রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে, / বলো তো এসব কাহাদের দান?’ তখন তিনি মূলত আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার পেছনের অন্ধকার সত্যটাকে টেনে বের করে আনেন। তাঁর এই গণমুখী আধুনিকতা কেবল সাহিত্যের জন্য সাহিত্য ছিল না, তা ছিল জীবনের জন্য সাহিত্য।
নজরুল কেবল বাংলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বনাগরিক। তাঁর চেতনার পরিধি ছিল সীমানাহীন। ‘সঞ্চিতা’য় যখন আমরা ‘কামাল পাশা’ বা ‘চিরঞ্জীব জগলুল’-এর মতো কবিতা দেখি, তখন বুঝতে পারি বিশ্বের যেখানেই মানুষ শোষিত হয়েছে, পরাধীনতার শিকলে বন্দি হয়েছে, সেখানেই নজরুলের হৃদয় কেঁদেছে। তাঁর আন্তর্জাতিকতাবোধ আজকের এই গ্লোবালাইজেশনের মতো কোনো অর্থনৈতিক লেনদেনের ব্যাপার ছিল না; তা ছিল আত্মার আত্মীয়তা। এক দেশের মানুষের মুক্তির লড়াই যে অন্য দেশের মানুষের মুক্তির প্রেরণা হতে পারে, এই গভীর সত্যটি তিনি তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে গেঁথে দিয়েছেন।
আজকের এই ২০২৬ সালের পৃথিবীর দিকে তাকালে কখনো কখনো বড় অদ্ভুত লাগে। আমরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে কত দূর এগিয়ে গেছি। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই স্বাধীন হয়েছে? আজও তো ধর্মের নামে হানাহানি চলছে। আজও তো ক্ষমতার দম্ভে দুর্বলকে পিষে মারা হচ্ছে। সম্পদের পাহাড় জমছে একদল মানুষের কাছে, আর অন্যদল একবেলা খাবারের জন্য হাহাকার করছে। এই চকচকে, আধুনিক মোড়কে মোড়ানো পৃথিবীতে ‘সঞ্চিতা’ কি তবে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে? মোটেও না। বরং এই যান্ত্রিক শীতলতার যুগে ‘সঞ্চিতা’র ওই উত্তপ্ত, মানবিক শব্দগুলো যেন আরও বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, তাঁর সাম্যবাদী দর্শন এবং মানুষের প্রতি তাঁর সেই অগাধ বিশ্বাস এসব আজও আমাদের শেখায় কীভাবে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে হয়। ডিজিটাল যুগের এই ভয়াবহ একাকিত্ব আর বিচ্ছিন্নতার মাঝে ‘সঞ্চিতা’র পাতা ওল্টালে মনে হয়, কেউ একজন কাঁধে হাত রেখে বলছে, 'ভয় নেই, আমি আছি।'
‘সঞ্চিতা’র অন্তর্গত ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটির কথা একটু ভাবা যাক। ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে ক'রেছ মহান্। / তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান / কন্টক-মুকুট শোভা।’ অভাব আর কষ্টকে এমন মহিমান্বিত রূপ দেওয়ার সাহস ক'জন কবির আছে? নজরুল দারিদ্র্যকে কেবল এক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখেননি, তিনি একে দেখেছেন এক ধরনের আধ্যাত্মিক দহন হিসেবে, যা মানুষকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করে। তবে তিনি এই দারিদ্র্যের অবসানও চেয়েছেন তীব্রভাবে। কাব্যগ্রন্থটির ভেতরে ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’, ‘লিচু-চোর’ বা ‘খাঁদু-দাদু’র মতো শিশুতোষ কবিতাও স্থান পেয়েছে। যে কলম দিয়ে একটু আগেই আগুন ঝরছিল, সেই একই কলম দিয়ে তিনি কী অসীম মমতায় এঁকেছেন শিশুর সরল জগৎ! ‘কাঠবিড়ালি! কাঠবিড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও? / গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ?’ এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। এই বৈচিত্র্যই ‘সঞ্চিতা’কে করে তুলেছে এক অখণ্ড জীবনের রূপরেখা। এখানে যেমন প্রলয় আছে, তেমনি আছে খুকুকমনির অভিমান; যেমন আছে ফাঁসির মঞ্চের গান, তেমনি আছে ভোরের পাখির ডাক। নজরুল যেন পুরো মানবজীবনটাকে তাঁর এই ছোট একটি সংকলনের ভেতর পুরে ফেলতে চেয়েছিলেন।
আবার যদি ‘ছায়ানট’ বা ‘দোলন-চাঁপা’ পর্বের কবিতাগুলোর দিকে ফেরা যায়, সেখানে দেখা মেলে এক অন্য মাত্রার চিত্রকল্পের। ‘চৈতি হাওয়া’ কবিতায় যখন তিনি লেখেন, ‘হারিয়ে গেছ অন্ধকারে পাইনি খুঁজে আর, / আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!’ তখন সেই হারানো প্রেমের জন্য যে তীব্র হাহাকার ফুটে ওঠে, তা পাঠকের নিজের বুকের কোনো পুরোনো ক্ষতকে যেন আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। বিরহ যে কত গভীর আর কত নিঃসঙ্গ হতে পারে, তা নজরুলের এসব কবিতায় না গেলে হয়তো পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাঁর ছন্দের দোলায়, শব্দের বুননে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি হয়, যা পাঠককে এক ঘোরের ভেতর নিয়ে যায়।
‘সঞ্চিতা’র আরেকটি বড় দিক হলো এর সঙ্গীতময়তা। এই সংকলনের অনেক কবিতাই আসলে গান। গজল, শ্যামাসঙ্গীত, ভাটিয়ালি, বাউল নজরুল যেন সুরের এক বিশাল মহাসমুদ্রে অবগাহন করেছিলেন। ‘বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল’, কিংবা ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে’ পড়তে গেলেই তো মনে মনে সুর বেজে ওঠে। শব্দের ভেতর সুরকে এমনভাবে গেঁথে দেওয়ার ক্ষমতা নজরুলের এক ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা ছিল। এই কবিতাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, এগুলো শোনার জন্য, অনুভব করার জন্য।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ‘সঞ্চিতা’র মূল্য অপরিসীম। ১৯২০ থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তাল। একদিকে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে বিপ্লবী তরুণদের সশস্ত্র সংগ্রাম। ঠিক সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে নজরুল এই কবিতাগুলো লিখছেন। তিনি নিজে কারাবরণ করছেন, অনশন করছেন। তাঁর নিজের জীবনের রক্ত আর ঘাম মিশে আছে এই কবিতাগুলোর প্রতিটি অক্ষরে। তাই ‘সঞ্চিতা’ কেবল বসে বসে কল্পনা করে লেখা কোনো কাব্য নয়; এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। এই বইয়ের পাতা ওল্টানো মানে সেই উত্তাল বিশের দশকে এক চক্কর হেঁটে আসা।
সমালোচকদের অনেকেই হয়তো নজরুলের কবিতায় আবেগের আতিশয্য দেখেন। তাঁরা হয়তো বলবেন যে, নজরুলের অনেক কবিতাতেই শিল্পের সূক্ষ্ম কারুকাজের চেয়ে আবেগের উচ্ছ্বাসটাই বেশি। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বুঝতে পারা যায় যে, ওই সময়টার, ওই পরাধীনতার গ্লানির যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ছিল, সেখানে কোনো নিখুঁত, মেপে মেপে লেখা ধ্রুপদী শিল্পের হয়তো প্রয়োজন ছিল না। সেখানে প্রয়োজন ছিল এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের। নজরুল সেই বিস্ফোরণেরই কাজ করেছিলেন। তাঁর আবেগ অকৃত্রিম ছিল বলেই তা সরাসরি গিয়ে আঘাত করতে পেরেছিল ঘুমন্ত জাতির বুকে। আর এই অকৃত্রিমতাই তাঁকে চিরকালের জন্য সাধারণ মানুষের কবি করে রেখেছে।
আজ এই পড়ন্ত বিকেলে, জানালা দিয়ে আসা ম্লান আলোর দিকে তাকিয়ে যখন ‘সঞ্চিতা’ বইটি বন্ধ করা হয়, তখন বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, পৃথিবী কত বদলে গেছে, কিন্তু ওই মলাটের ভেতরের শব্দগুলো একটুও পুরোনো হয়নি। নজরুলের সেই বিদ্রোহ, সেই প্রেম, সেই অভিমান সব যেন আজও এক জীবন্ত সত্তা হয়ে শ্বাস নিচ্ছে। মহাকালের স্রোতে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, অনেক কীর্তিই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়, কিন্তু ‘সঞ্চিতা’ হয়তো তার আপন মহিমায় চিরকাল টিকে থাকবে। কারণ, যতদিন মানুষের বুকে দুঃখ থাকবে, যতদিন সমাজে বঞ্চনা থাকবে, যতদিন প্রেমে বিরহ থাকবে আর যতদিন মুক্তির জন্য মানুষের তৃষ্ণা থাকবে, ততদিন নজরুল প্রাসঙ্গিক।
হয়তো কোনো এক অজানা ভবিষ্যতে, যখন এই পৃথিবীর চেহারা আরও বদলে যাবে, যখন যন্ত্রের রাজত্বে মানুষ আরও বেশি একা হয়ে পড়বে, তখনও হয়তো কোনো এক নিঃসঙ্গ মানুষ রাতের অন্ধকারে গোপনে খুলে বসবে ‘সঞ্চিতা’। আর সেই জরাজীর্ণ পাতা থেকে একটি কণ্ঠ ফিসফিস করে বলে উঠবে, ‘বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’-চোখে স্বার্থ-ঠুলি, / নতুবা দেখিতে তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।’ সেই দিনও হয়তো ওই পাঠকের চোখ ভিজে উঠবে। কারণ, দিনশেষে মানুষ তো মানুষেরই কাছাকাছি যেতে চায়। ‘সঞ্চিতা’ হলো মানুষের সেই অনন্ত যাত্রার, সেই চিরন্তন মানবতাবোধের এক অবিনাশী গান। এই গান শেষ হওয়ার নয়। এই গানের রেশ বুকের খুব গভীরে কোথায় যেন এক অস্পষ্ট, অথচ তীব্র অনুরণন তুলে মিলিয়ে যায় না, কেবল বাজতেই থাকে... বাজতেই থাকে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২১ বার পড়া হয়েছে