'মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে'
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সৌদি আরবে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবরে শোকে ভেঙে পড়েছেন বরগুনার তালতলী উপজেলার ছাহেরা বেগম। ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলে হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সামর্থ্য নেই পরিবারের। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই বেঁচে ছিলেন ছাহেরা। এখন ছেলের মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে চান তিনি। পরিবারের দাবি, সরকারি সহায়তায় দ্রুত হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
'মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে'—এমন আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন ছাহেরা বেগম। সৌদি আরবে একমাত্র সন্তান হানিফের মৃত্যুর পর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সামর্থ্য না থাকায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকায় এখন শোকের ছায়া।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে নিজ বাড়িতে বিলাপ করতে করতে ছাহেরা বেগম বলেন, ছোটবেলায় স্বামীকে হারিয়েছেন। তাঁর একমাত্র সন্তানই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই ছেলেকেও হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব। ছেলেকে শেষবারের মতো কাছে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা চান তিনি।
নিহত হানিফ (৩৬) নলবুনিয়া এলাকার প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে মো. জেনায়েদ ও ৫ বছর বয়সী মেয়ে মোসা. ছামিরা রয়েছে। হানিফের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাঁর বাবা সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এরপর ছাহেরা বেগম একাই ছেলেকে বড় করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় আড়াই বছর আগে ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান হানিফ। ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় দুই বছর ধরে অবৈধভাবে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি।
পরে ভিসা বৈধ করার আশায় পাঁচ মাস আগে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দালালদের দেন হানিফ। কিন্তু তাঁর সেই চেষ্টা সফল হয়েছে কি না, তা জানার আগেই গত ৩ অক্টোবর সৌদি আরবে তাঁর মৃত্যু হয়। ওই দিনই পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর খবর পান। তবে কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো জানতে পারেনি পরিবার।
হানিফের বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী, সন্তান ও মা এখন চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
হানিফের স্ত্রী কাজল আক্তার বলেন, স্বামীকে বিদেশে পাঠাতে প্রথমে ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পরে ভিসা বৈধ করার জন্য ছয়টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এখন স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, তা বুঝতে পারছেন না তিনি। এর মধ্যে ঋণের বোঝাও রয়েছে।
কাজল আক্তার আরও বলেন, তাঁর সন্তানেরা এখনো ছোট। তারা যেন অন্তত বাবার মরদেহ দেশে এনে দাফন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে বাবার কবর দেখতে পারে, সে জন্য সরকারের সহযোগিতা চান তিনি। স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
১৪৫ বার পড়া হয়েছে