সর্বশেষ

সারাদেশ

হাসপাতালের বেড থেকে বিচারকের আসনে তাইজুল

নজরুল ইসলাম পলাশ, মাদারীপুর
নজরুল ইসলাম পলাশ, মাদারীপুর

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম। অভাবের সংসারে মা হাওয়া বেগমের সংগ্রাম, নিজের মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন স্বপ্নপূরণের পথে। কিন্তু দুই কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ায় থেমে যায় পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন। দীর্ঘ চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের কঠিন সময় পেরিয়ে সেই তাইজুলই ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান এস এম তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর তিন সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব পড়ে মা হাওয়া বেগমের ওপর।

অভাব ছিল তাঁদের সংসারের নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন হাওয়া বেগম। প্রয়োজনে নিজের ভাইদের কাছ থেকেও সহযোগিতা নিয়েছেন। কখনো না খেয়ে থেকেছেন, আবার কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।

এভাবে ৩১ বছর ধরে একাই সন্তানদের জন্য সংগ্রাম করেছেন হাওয়া বেগম। তাঁর স্বপ্ন ছিল ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন তিনি। ওই মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ+ পাওয়া শিক্ষার্থী। পরে ঢাকা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়ও এ+ অর্জন করেন।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তাইজুল। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি। তবে এর আগেই তাঁর জীবনে নেমে আসে কঠিন বিপর্যয়।

২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা দেখা দেয়। পরে ২০১৫ সালে কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।

শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার খরচ। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। এ জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু যে পরিবারের সংসার চালানোই কঠিন ছিল, সেই পরিবারের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তাইজুলের চিকিৎসার খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ান তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁকে সহযোগিতা করেন।

ছেলের চিকিৎসার বাকি অর্থ জোগাড় করতে নিজের জমিজমাসহ যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করেন মা হাওয়া বেগম। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে তাইজুলের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।

এরপর নিজের স্বপ্নের পথে ফিরে যান তাইজুল। অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন তিনি। এর মধ্য দিয়ে পূরণ হয় মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

এলাকাবাসী বলেন, তাইজুল আর বাঁচবেন—এমন আশা একসময় তাঁরা ছেড়েই দিয়েছিলেন। মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসা পেয়ে তিনি সুস্থ হয়েছেন। এখন তিনি জজ হয়েছেন—এটি তাঁর পরিবারের পাশাপাশি পুরো এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়।

মা হাওয়া বেগম বলেন, ছেলের এমন রোগ হয়েছিল যে একসময় মনে হয়েছিল, তাঁকে আর বাঁচাতে পারবেন না। তবে আল্লাহর রহমত ও মানুষের সহযোগিতায় ছেলে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। ছেলে জজ হওয়ায় তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

তাইজুল বলেন, দুই কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। তাঁদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচবেন না এবং মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারবেন না।

তাঁর ভাষায়, মা চেয়েছিলেন তিনি জজ হন। বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজনসহ অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের সহযোগিতা না পেলে হয়তো আজ তিনি এখানে পৌঁছাতে পারতেন না। আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছেন এবং জজ হতে পেরেছেন—এ জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞ তিনি।

১২০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০