সর্বশেষ

সারাদেশ

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রে হচ্ছে দুটি সেতু, কমবে যানজট ও দূরত্ব

আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ 
আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ 

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:১২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দুটি সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। এর একটি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার সেতুর আদলে পিলারবিহীন স্টিল আর্চ সেতু, অন্যটি কংক্রিট ও স্টিল আর্চের সমন্বয়ে নির্মিত হচ্ছে। সেতু দুটি চালু হলে নগরীর যানজট কমার পাশাপাশি নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে কেওয়াটখালী সেতুর সংযোগ সড়ক ও ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে অভিযোগ ও মতবিরোধ রয়েছে।

ময়মনসিংহ নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন এবং যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতু। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাইপাস মোড় থেকে চায়না মোড় পর্যন্ত ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তৈরি হচ্ছে এই সেতু।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নির্মিতব্য মূল সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে ১ হাজার ১০০ মিটার। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হারবার সেতুর আদলে পিলারবিহীন স্টিল আর্চ নকশায় এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

প্রকল্পের কাজ শুরুর পর নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত জটিলতায় সময় লেগেছে। বিদ্যুতের খুঁটি, গ্যাসের লাইনসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগ স্থানান্তরেও বেশি সময় প্রয়োজন হয়েছে। এ কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ে পুরো কর্মস্থল বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে নির্মাণকাজের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, এসব জটিলতা মোকাবিলায় ঋণচুক্তির মেয়াদ ও প্রকল্পের সমাপ্তির সময় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। সময় বাড়ানোর ফলে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রকল্পটি শেষ করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করছেন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কেওয়াটখালী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. দিদারুল আলম জানান, সেতুর সঙ্গে ছয় লেনের যোগাযোগব্যবস্থা থাকবে। এর মধ্যে চারটি লেন ভারী যানবাহনের জন্য এবং দুটি লেন মোটরসাইকেল ও হালকা যানবাহনের জন্য রাখা হবে। প্রকল্পে ২৫০ মিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ওভারপাস, টোল প্লাজা, বিশ্রামাগার, ওয়াচ টাওয়ার ও দৃষ্টিনন্দন পার্কও থাকবে।

সেতুটি চালু হলে ময়মনসিংহ নগরীর ব্রিজের মোড় এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সহজ হবে। বিজয়পুর, নাকুগাঁও, হালুয়াঘাট ও ধানুয়া-কামালপুর স্থলবন্দরসহ সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে দিঘারকান্দা বাইপাস থেকে কেওয়াটখালী পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ জমির টাকা পেলেও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। আবার ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ তুলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের লোকজনকে শতকরা হারে টাকা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার পরও অনেকে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ পাচ্ছেন না।

এদিকে শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহ ও রাজধানীর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমাতে রহমতপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে আরেকটি ব্রহ্মপুত্র সেতু। কংক্রিট ও স্টিল আর্চের সমন্বয়ে নির্মিতব্য এই সেতুর দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪৭২ মিটার। এর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

শেরপুর (কানাসাখোলা)-ভীমগঞ্জ-নারায়ণখোলা-রামভদ্রপুর-পরানগঞ্জ-ময়মনসিংহ (রহমতপুর) সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শেরপুরের সঙ্গে ময়মনসিংহসহ রাজধানীর দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার কমবে। একইভাবে নাকুগাঁও স্থলবন্দর, কুড়িগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও দূরত্ব কমবে প্রায় ২০ কিলোমিটার। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পাট ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ৪ নম্বর প্যাকেজের আওতায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু ও রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। মূল সেতুতে ৩৩০ মিটার স্টিল নেটওয়ার্ক ট্রাসের তিনটি স্প্যান, ২৩টি পিসি গার্ডার এবং ৭৮৫ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক থাকবে। এর সঙ্গে আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল, স্ট্রিট লাইটিং, ফুটপাত, ড্রেন ও ইন্টারসেকশন নির্মাণ করা হবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খ. মো. শরীফুল আলম বলেন, রহমতপুর সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ২০২৭ সালের জুনে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা থাকলেও তা শেষ করা হয়েছে। সেতুটির কাজ শেষ হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি শহরের যানজটও কমবে।

দুটি সেতুর নির্মাণকাজে আশাবাদী চরাঞ্চলের মানুষও। তাঁদের ভাষ্য, সেতু না থাকায় নৌকার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অসুস্থ রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে পরীক্ষা ও ক্লাসে দেরি হয়।

ময়মনসিংহ জেলার বড় একটি অংশের কৃষিপণ্য চরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল থাকায় কৃষকেরা অনেক সময় কম দামে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেতু নির্মিত হলে কৃষকেরা নিজেরাই ফসল বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। পাশাপাশি সেতুকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা।

তবে কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতুর সংযোগ সড়কের নকশা ও সেতুর মুখ নামানো নিয়ে নাগরিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, স্টিল আর্চ সেতুর সংযোগ সড়ক চায়না মোড়ে গিয়ে মিশবে। এতে বর্তমানে ব্রিজের মোড়ে যে ধরনের যানজট হচ্ছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের যানজট চায়না মোড় ও শম্ভুগঞ্জে তৈরি হতে পারে।

ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন আরও বলেন, শুধু বড় প্রকল্পের মাধ্যমে সেতু নির্মাণ করলেই যানজট নিরসন হবে না। অবৈধ যানবাহন বন্ধে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাইসেন্স ও রং করার জন্য অর্থ আয়ের সুযোগ তৈরি করে শহরে যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণহীনতা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পেতে প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ময়মনসিংহবাসীর প্রত্যাশা, সময় ও বরাদ্দ না বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেওয়াটখালী স্টিল আর্চ সেতু ও রহমতপুর সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। সেতু দুটি চালু হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি যানজট কমবে এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আরও গতিশীল হবে।

১০৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০