ইরামের পা হারানোর ঘটনা তদন্তের দাবিতে সহপাঠীদের মানববন্ধন
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
যে বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, ফুটবল নিয়ে মাতার কথা, পড়াশোনা শেষে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার কথা—সেই বয়সেই একটি বাইক দুর্ঘটনার পর জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বগুড়া জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক জামান ইরাম। দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা নিতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার অভিযোগের মধ্যে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা তদন্তের দাবিতে মঙ্গলবার বগুড়া শহরের সাতমাথায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন ইরামের স্বজন, বন্ধু ও সহপাঠীরা।
ইরামের একটি পা হারানোর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভেঙে পড়েছেন তার সহপাঠী ও বন্ধুরা। দীর্ঘদিনের সহপাঠীকে এভাবে জীবনের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে দেখে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে কষ্ট, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন। মঙ্গলবার দুপুরে সেই ক্ষোভ ও বেদনা নিয়েই তাঁরা জড়ো হন বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায়।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ইরামের সহপাঠীরা জানান, বাইক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর ইরামকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা ও সেবা নিতে গিয়ে তাঁকে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। পরে ইরামের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
সহপাঠীদের প্রশ্ন, দুর্ঘটনার পর শুরুতেই যদি যথাযথ চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে, তাহলে ইরামের শারীরিক অবস্থা এতটা জটিল হলো কেন? চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা, বিলম্ব বা গাফিলতি ছিল কি না, সেটি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য দুর্ঘটনার পর ইরামের চিকিৎসা শুরু থেকে ঢাকায় স্থানান্তর পর্যন্ত পুরো বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত সব নথি পর্যালোচনা করে কোথাও কোনো গাফিলতি, সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব কিংবা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না, তা খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তাঁরা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ইরামের সহপাঠীরা বলেন, ইরাম তাঁদের কাছে শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, একজন প্রিয় বন্ধু ও দীর্ঘদিনের সহপাঠী। স্কুলজীবনের অসংখ্য স্মৃতি তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই বন্ধুই এখন হাসপাতালের বিছানায় একটি পা হারিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক সহপাঠী। তাঁরা বলেন, যে বয়সে ইরামের হাতে থাকার কথা বই-খাতা কিংবা ফুটবল, সেই বয়সে এখন তাঁকে কৃত্রিম পা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা একজন তরুণের জীবনের গতিপথ কতটা বদলে দিতে পারে, ইরামের ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভ ও মানববন্ধন থেকে ইরামের চিকিৎসার শুরু থেকে ঢাকায় স্থানান্তর পর্যন্ত পুরো ঘটনা তদন্তের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে কোনো ধরনের অবহেলা বা বিলম্ব হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে। তবে ইরাম যে একটি পা হারিয়েছে, সেটি এখন একটি বাস্তবতা। এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। তাঁর উন্নত চিকিৎসা, কৃত্রিম অঙ্গ, পুনর্বাসন, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সাতমাথার ব্যস্ত সড়কে মানববন্ধন চলার সময় পথচারীদের অনেকেই থমকে দাঁড়ান। সহপাঠীদের হাতে ছিল প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড। কারও কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, আবার কারও চোখে অশ্রু। বারবার উঠে আসছিল ইরামের নাম ও তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা।
ইরামের স্বজন ও বন্ধুরা জানতে চান, দুর্ঘটনার পর থেকে পা হারানো পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছিল। কোথাও চিকিৎসায় বিলম্ব হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত সময়মতো নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর চান তাঁরা।
তাঁদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ইরামের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। একই সঙ্গে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইরামের পাশে দাঁড়ানো।
একটি পা হারালেও ইরামের স্বপ্ন যেন হারিয়ে না যায়—এটাই মানববন্ধনে অংশ নেওয়া তাঁর সহপাঠী ও স্বজনদের সবচেয়ে বড় আকুতি। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে ইরাম যেন আবারও নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে, সেই প্রত্যাশাই জানিয়েছেন তাঁরা।
১১০ বার পড়া হয়েছে