সর্বশেষ

ফিচার

সবুজ ছায়ার কলম্বো:

এক টুকরো প্রশান্তির শহর

মাসুদুল হাসান রনি
মাসুদুল হাসান রনি

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
​কলম্বোর যে অংশে আমি অস্থায়ী নিবাস গেড়েছি, সে অঞ্চলটি খুবই অভিজাত ও বনেদি। এয়ারবিএনবি বুকিং করার সময় বিষয়টি আমার জানা ছিল না। বাট্টামুলার (Battaramulla) এই আবাসিক এলাকাটিতে বড় বড় শিল্পপতি, ব্যারিস্টার ও ব্যবসায়ীদের বিশাল সব বাড়ি রয়েছে।

বাড়িগুলোর এই বিশালতা যেমন তাদের আয়তনে, তেমনি স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্যও মুগ্ধ করেছে। আবাসিক এলাকাগুলোতে ঘুরে ঘুরে বাড়িঘরের নির্মাণশৈলী দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে, প্রতিটি বাড়ির সামনে ও পেছনের চত্বরে থাকা বড় বড় গাছ আর নানান বাহারি ফুলের বাগান পুরো পরিবেশটিকে এক অন্যরকম স্নিগ্ধতায় ভরে রেখেছে, যা চোখ ও মন দু'টোই জুড়িয়ে দেয়।

​পার্লামেন্ট ভবনের দিকে যাওয়ার সময় পার্লামেন্ট রোডের দু'পাশের বিশালাকৃতির গাছপালা আর শহরের মাঝখানের বনায়ন যে কারও দৃষ্টি কেড়ে নেবে। গত ক'দিন ধরে কলম্বো শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার দিকটি হলো এই শহরের সবুজায়ন। আমার ধারণা, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কলম্বো অন্যতম সবুজ একটি শহর। আধুনিক নগরায়নের সাথে সাথে প্রকৃতি এবং গাছপালাকে খুব সুন্দরভাবে ধরে রেখেছে। নিঃসন্দেহে কলম্বোকে একটি 'গ্রিন সিটি' বলা যায়।

​সবুজের পাশাপাশি এই শহরের আরেকটি দিক আমার গভীর নজর কেড়েছে—তা হলো নারীদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। পোশাক- আশাক কে কী পরছেন, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা বা ভ্রুক্ষেপ নেই। রাত-বিরাতে নারীরা এখানে সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে একা চলাফেরা করছেন। এরা সাইকেল ও স্কুটি চালাচ্ছেন, এমনকি ব্যক্তিগত কার ড্রাইভ করছেন নিয়মিত। বলা যায়, নারীদের একা চলাফেরা করা সাধারণত বেশ নিরাপদ, তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বড় শহরের মতো এখানেও কিছু সাধারণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কিন্ত কলম্বোতে মারাত্মক বা সহিংস অপরাধের হার খুবই কম, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে এখানে আতঙ্কিত হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই।

এখানকার মানুষজন কেমন, এ নিয়ে আগেও বলেছি। আবারও বলছি কলম্বোর মানুষ সাধারণত খুবই ভাল, সাহায্যকারী, ভদ্র এবং বন্ধুবৎসল। কোনো সমস্যায় পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বা দোকানদারদের কাছে সাহায্য চাইলে তারা আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসেন। সবচেয়ে বড় কথা সবাই ইংরেজি জানেন ও বুঝেন বলেই যোগাযোগটা সহজেই করা যায়।

​স্কুল ও অফিস চলাকালীন সময়ে এখানে ট্রাফিক জ্যাম থাকলেও তা আমাদের দেশের মতো অনিয়ন্ত্রিত নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে অলস বসে থাকতে হয় না। পথঘাটে গাড়ি চলাচল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। আরেকটি বিষয় আপনার নজর কাড়বেই, তা হলো এই শহরে যত্রতত্র নোংরা আবর্জনা খুব একটা চোখে পড়ে না। এখানকার মানুষ যেমন নিজেদের ভালোবাসেন, তেমনি ভালোবাসেন তাঁদের প্রিয় শহরটিকে। পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে তাঁদের সচেতনতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

এছাড়া আরও একটি চমৎকার বিষয় লক্ষ্য করলাম, পাবলিক প্লেস তো দূরের কথা, যেখানে-সেখানে যত্রতত্র ধূমপান করার প্রবণতাও এখানে দেখা যায় না বললেই চলে। বিষয়টি স্বাস্থ্য সচেতনতা বা সিগারেটের মূল্য আকাশচুম্বি বলে কিনা জানি না। তবে বিষয়টি অধুমপায়ীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।

​কলম্বোর জনপ্রিয় বাহন হলো 'টুকটুক', যা দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের সিএনজির মতো। এটি বেশ সহজলভ্য এবং যাতায়াতেও বেশ সাশ্রয়ী। ব্যক্তিগত ট্যাক্সির পাশাপাশি রাস্তায় প্রচুর কার ও ট্যাক্সি চোখে পড়ে। উবারের পাশাপাশি স্থানীয় অ্যাপ 'পিকমি' (PickMe) এখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। যাতায়াতের জন্য প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি রেন্ট বা ভাড়া করে থাকেন। কারন পিকমি অথবা Uber ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী। অ্যাপের মাধ্যমে যাতায়াত করলে ট্র্যাক করার সুবিধা থাকে এবং বাড়তি ভাড়া দাবি করার সুযোগ থাকে না। চালক ও যাত্রীর মধ্যে ভাড়া নিয়ে বচসা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

লোকাল বাস এবং ট্রেনে যাতায়াত করা যায়। পুরানো বাসের পাশাপাশি আধুনিক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাস চোখে পড়েছে। বাস বা ট্রেনে ভিড়ের সময় পকেটমার বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এড়াতে সতর্ক থাকা ভালো।

সাধারণত রাত ১০টার পর কলম্বোর রাস্তাঘাট দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায়। তাই গভীর রাতে রাস্তায় একাকী হাঁটা এড়িয়ে চলা ভাল। এবং নির্ভরযোগ্য অ্যাপের ক্যাব ব্যবহার করা উচিত।

গত ক'দিন ​স্থানীয় কাঁচাবাজারে কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। বাজারগুলো অনেকটাই আমাদের দেশের মতনই। কিন্ত মাছের বাজার প্যাঁক পানিতে মাখামাখি নেই। শাক সবজি, মাছ, মাংসের দাম তুলনামূলক কম। তবে বাজার করে সাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি সুপারশপগুলোতে। একেকটি সুপার শপ বিশাল আয়তনের। ফিক্সড এনড রিজেনবল প্রাইজ।

​আমরা যারা চা বা কফিতে আসক্ত তাদের জন্য এ শহর টু মাচ এক্সপেন্সিভ। এক কাপ দুধ চা দেড়শ রুপি এবং এক কাপ কফির দাম দুইশত হতে চারশ পঞ্চাশ রুপি। এতো দাম বিধায় পাড়া মহল্লা বা সব রেস্টুরেন্টে কিংবা যেখানে সেখানে চা- কফি পাওয়াও যায় না।

​দিনের আলো ফুরোতেই কলম্বো যেন এক অন্য রূপ ধারণ করে, যা এর নাইট লাইফে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। ঝলমলে আলোয় মোড়ানো অভিজাত ক্যাফে, রুফটপ রেস্তোরাঁ আর সমুদ্রঘেষা গলফেস গ্রিনের চত্বর তরুণ-তরুণী ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। জাঁকজমকপূর্ণ ক্যাসিনো, লাইভ মিউজিক বার এবং ক্লাবের পাশাপাশি সমুদ্রের শীতল হাওয়া মেখে রাতের বেলায় মেরিন ড্রাইভ ধরে দীর্ঘ সময় হেঁটে বেড়ানো এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। সব মিলিয়ে, রাতের কলম্বো তার আধুনিক আলোর রোশনাই আর নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে এক ভিন্ন জাদুকরী অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

১৯১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০